

ডেস্ক নিউজ: প্রেমের নবি মুহাম্মাদ (সা.)। নুরের নবি তিনি। তিনি সুরের নবি। জাহিলিয়াতের ঘোর অমানিশায় তিনি আলোর ফুল হয়ে ফুটে ছিলেন। এসেছিলেন সত্য, সুন্দর ও শান্তির বার্তা নিয়ে। সাম্য, সম্প্রীতি, সহিষ্ণুতা, ভ্রাতৃত্ববোধ সর্বোপরি মানবাধিকারের কালজয়ী যে সবক তিনি জগৎবাসীকে দিয়েছেন তাতে রয়েছে- সব মানুষের কল্যাণ ও মুক্তি। তার জীবনাদর্শের নানা দিক নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন-তোফায়েল গাজালি
বংশ পরিচয়
বাবার নাম আব্দুল্লাহ, দাদা আব্দুল মুত্তালিব। প্রপিতামহ হাশেম। হাশেমের দিকে সম্পর্কযুক্ত করে নবিজির বংশ হাশেমি বংশ হিসাবে পরিচিত যা আদনান হয়ে সর্বসম্মিতক্রমে হজরত ইসমাইল (আ.) পর্যন্ত পৌঁছে। এতে সন্দেহ নেই যে, রাসূল (সা.) হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর বংশধর।
জন্ম ও শৈশব
হজরত মুহাম্মাদ (সা.) ৫৭০ খ্রিষ্টাব্দে, আরবের মক্কা নগরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্মের ৬ মাস আগে বাবা আব্দুল্লাহ মদিনায় মৃত্যুবরণ করেন। আরবের প্রচলন অনুযায়ী রাসূল (সা.) কে শহরের বাইরে বনি সাদ গোত্রে দুধপান ও লালন পালনের জন্য পাঠানো হয়। পাঁচ বছর পর্যন্ত তিনি সেখানে হালিমা সাদিয়া (রা.) স্নেহ মমতায় বেড়ে ওঠেন।
মা আমেনার ইন্তেকাল
শিশু মুহাম্মাদ-এর বয়স ছয় বছর হলে মা আমেনা ছোট্ট মুহাম্মাদকে সঙ্গে নিয়ে স্বামী আব্দুল্লাহর কবর জিয়ারতের উদ্দেশ্যে মদিনায় যান। মদিনা থেকে ফেরার পথে মক্কা ও মদিনার মাঝে অবস্থিত আবহাওয়া নামক স্থানে তিনি ইন্তেকাল করেন।
দাদা ও চাচার তত্ত্বাবধান
বাবা-মার মৃত্যুর পর দাদা আব্দুল মুত্তালিব তার লালন পালনের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। আট বছর বয়সে দাদার মৃত্যুর পর চাচা আবু তালিব তার দায়িত্ব নেন। তিনি চাচার বকরি দেখাশোনা ও ব্যবসার কাজে সহযোগিতা করতেন।
বিয়ে
পঁচিশ বছর বয়সে খাদিজা (রা.) কে বিয়ে করেন। বনু হাশেম ও কুরাইশের গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গের উপস্থিতিতে বিশটি উট মহর ধার্য করে তাদের বিয়ে হয়। খাদিজাই নবিজির প্রথম স্ত্রী। তার জীবদ্দশায় নবিজি অন্য কাউকে বিয়ে করেননি।
সন্তানসন্ততি
একমাত্র ইবরাহিম ছাড়া নবিজির সব সন্তান খাদিজা (রা.)-এর গর্ভে জন্ম নিয়েছেন। কাসেম প্রথম সন্তান। পরে যয়নব, রুকাইয়া, উম্মে কুলসুম, ফাতেমা ও আব্দুল্লাহ (রা.)-এর জন্ম হয়। তার ছেলেরা শৈশবে মারা যান। ফাতেমা (রা.) ছাড়া সবাই নবিজির জীবদ্দশায় মারা যান। নবিজির ইন্তেকালের ছয় মাস পর ফাতেমা (রা.) মৃত্যুবরণ করেন।
খোদায়ী প্রত্যাদেশ
হেরা গুহায় সাধনার তৃতীয় বছর রমজান মাসে যখন তার বয়স চল্লিশ পেরিয়ে একচল্লিশ চলছিল-তিনি গুহার ভেতরে আল্লাহর ধ্যানে নিমগ্ন ছিলেন। জিবরাইল (আ.) আল্লাহর পক্ষ থেকে এসে তাকে নবুওয়াতের মর্যাদায় অভিষিক্ত করেন। প্রথম সূরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত তার প্রতি নাজিল হয়। জিবারাইল (আ.) এসে বলেন-পড়ো। তিনি জবাব দেন-আমি পড়তে জানি না।
গোপনে ইসলাম প্রচার
খোদায়ী প্রত্যাদেশ তথা ওহি নাজিল হওয়ার পর রাসূল (সা.) গোপনে ইসলাম প্রচার শুরু করেন। প্রথম আপন পরিবারের লোকদের ইসলামের দাওয়াত দেন। প্রথম খাদিজা (রা.) তার দাওয়াতে ইসলাম গ্রহণ করেন। পুরুষদের মধ্যে প্রথম আবু বকর (রা.), ছোটদের মধ্যে আলী ইবনে (রা.) এবং ক্রীতদাসদের মধ্যে যায়েদ ইবনে হারেসা (রা.) ইসলাম গ্রহণ করেন।
প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচার
আল্লাহ প্রকাশ্যে ইসলাম প্রচারের আদেশ দিলে নবিজি (সা.) তাঁর পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়স্বজনকে সাফা পাহাড়ের পাদদেশে একত্রিত করেন। এরপর তাদের মূর্তিপূজা পরিত্যাগ করে এক আল্লাহর ইবাদত করতে আহ্বান করেন। এ কথা শুনে তার চাচা আব– লাহাব বলে-‘তোমার ধ্বংস হোক, এ জন্যই কি আমাদের একত্রিত করেছ?’ এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহতায়ালা সূরা লাহাব অবতীর্ণ করেন-‘আবু লাহাবের দুহাত ধ্বংস হোক এবং ধ্বংস হোক সে নিজে। কোনো কাজে আসেনি তার ধনসম্পদ ও যা সে উপার্জন করেছে। সত্বরই সে প্রবেশ করবে লেলিহান অগ্নিতে এবং তার স্ত্রীও, যে ইন্ধন বহন করে, তার গলদেশে খর্জুরের রশি নিয়ে।’ (সূরা লাহাব : ১-৫)।
আবিসিনিয়ায় হিজরত
কালেমার দাওয়াতের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ইমানদার সাহাবিদের প্রতি অবিশ্বাসীদের নির্যাতন ও নিষ্পেষণ ক্রমেই বেড়ে চলছে। এমতাবস্থায় রাসূল (সা.) সাহাবিদের আবিসিনিয়ায় হিজরত করার নির্দেশ দেন। আবিসিনিয়ার বাদশা নাজ্জাশী ন্যায়পরায়ণ ও দয়ালু ছিলেন। এ জন্য আবিসিনিয়াকে হিজরতের জন্য মনোনীত করা হয়। বাদশা নাজ্জাশী ঈসা (আ.)-এর অনুসারী ছিলেন। নবুওয়াতের পঞ্চম বছর প্রথম হিজরতকারী মুসলমানদের কাফেলার সদস্য ছিলেন দশজন পুরুষ ও চারজন মহিলা। কিছুদিন পর আরও একটি দল তাদের সঙ্গে মিলিত হয়। তারা নারী, পুরুষ ও শিশুসহ মোট ছিলেন প্রায় একশজন। আবিসিনিয়ায় বাদশা নাজ্জাশী তাদের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করেন এবং নিরাপদে বসবাসের অনুমতি দেন।