দ্রব্যমূল্য বদলে দিয়েছে পুরান ঢাকার শিক্ষার্থীদের খাদ্যাভ্যাস

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৩ years ago

Manual5 Ad Code

নিউজ ডেস্ক: পুরান ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী জনি; থাকেন কলেজের পাশের একটি মেসে। ঢাকায় তাঁর যাবতীয় ব্যয় নির্বাহ হয় টিউশন থেকে আসা টাকায়। দুই বছর আগে ঢাকায় আসার পর টিউশনের টাকায় তাঁর বেশ ভালোই চলছিল। কিন্তু ইদানীং আর সেই টাকায় চলছে না। কারণ, খাবারসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সবকিছুর দাম বেড়ে গেছে। আর তাই বাধ্য হয়ে তাঁকে যেমন খাবারের মেনু পাল্টাতে হচ্ছে, তেমনি আগের চেয়ে কম খেতে হচ্ছে।

এখন প্রায় সব খাদ্যদ্রব্যের দাম নিম্ন আয়ের মানুষের নাগালের বাইরে চলে গেছে। মাছ থেকে শুরু করে কোনো এক ধরনের আমিষ খাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের আমিষের চাহিদা পূরণের সবচেয়ে সহজ ও সস্তা উৎস ডিমের দাম এক বছরে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ৫০ টাকা ছাড়িয়েছে।

সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজের স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রুহুল আমিন জানান, পড়াশোনার খরচ জোগাতে বাড়ি থেকে তিনি কোনো টাকা আনেন না। তিনটি টিউশনি থেকে প্রতি মাসে আসে ৬ হাজার টাকা। তা দিয়েই সারা মাসের খরচ বহন করতে হয়।

রুহুল আমিন আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আমি খরচ বাঁচানোর জন্য সকালের খাবারটা একটু দেরি করে খাই, যাতে দুপুরে দ্রুত ক্ষুধা না লাগে। আবার বুয়া বিকেলে রাতের খাবার রান্না করে দিয়ে যাওয়ার পর তা একটু আগেভাগেই খেয়ে নিই। খরচের কারণে বাধ্য হয়ে আমি ৩ বেলার পরিবর্তে ২ বেলা খাবার খাই।’

সোহরাওয়ার্দী কলেজের শিক্ষার্থী জনি জানান, আগে তার মেসে এক মাসে খাবারে খরচ হতো ৩ হাজার টাকা। এখন আগের চেয়ে নিম্ন মানের ও পরিমাণে কম খেয়ে ৭০০-৮০০ টাকা বাড়তি খরচ হচ্ছে।

Manual3 Ad Code

জনি আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘আগে মেসের খাবার ভালো না লাগলে বাইরের খাবার এনে খেতাম বা ডিম কিনে সেদ্ধ করে খেতাম। কিন্তু খরচ বেড়ে যাওয়ায় এখন আর সেটিও সম্ভব হচ্ছে না। এখন অনেকটা বাধ্য হয়েই তুলনামূলক কম খরচে বেশির ভাগ দিন শাক-সবজি খেয়ে পার করতে হচ্ছে। অনেক সময় বাধ্য হয়েই আধপেটা থাকতে হয়। এভাবে চলতে গিয়ে কয়েকবার অসুস্থ হয়ে পড়ছিলাম।’

সোহরাওয়ার্দী কলেজের পাশেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী গণি মিয়া বলেন, ‘হল না থাকার কারণে পুরান ঢাকায় তুলনামূলক বেশি বাসা ভাড়া দিয়ে থাকতে হয়। স্বাভাবিকভাবে খরচ এমনিতেই বেড়ে যায়। আবার দ্রব্যমূল্য বেড়ে যাওয়ার কারণে খাবারের জন্যও খুব বেশি টাকা ব্যয় করা সম্ভব হয় না। বাসা ভাড়া আর খাবারের ব্যয়ের সমন্বয় করা যাচ্ছে না বলে চাইলেও শরীরের যত্ন নেওয়া হয়ে উঠছে না।’

ঢাকায় গণি মিয়ার আয়ের অন্যতম উৎস টিউশনি। তিনি বাড়ি থেকে খুব বেশি টাকা আনেন না। ফলে টিউশনির আয় দিয়ে তাঁর পক্ষে বাসা ভাড়া মিটিয়ে ভালো-মন্দ খাবার কেনার জন্য অতিরিক্ত ব্যয় করা সম্ভব হয় না। তিনি বলেন, ‘টিউশনি থেকে যা আয় করি, তা দিয়ে মাসের খরচ হতে চায় না। এ কারণে বাধ্য হয়েই কম খাবার খাই এবং অনেক সময় মাছ-মাংস বাদ দিয়ে শাক-সবজি খেয়ে থাকি।’

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ছাত্রী হল বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের আবাসিক শিক্ষার্থী কণা জানান, মাস কয়েক আগেও পছন্দ অনুযায়ী মাছ-মাংস খেতে পারতেন। এখন আর তা সম্ভব হচ্ছে না।

এই হলের খাবারের মূল্যের বিষয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হল ক্যান্টিনে প্রতি প্লেট ভাতের দাম ১০ টাকা, ডাল ২ টাকা, শাক ১০ টাকা। বিভিন্ন মাছ যেমন—রুই, কাতলা, সরপুঁটি, পাঙাশ, তেলাপিয়া ও কইমাছ প্রতি পিস ৩৫ টাকা। ছোট মাছ ও চিংড়ির দাম রাখা হয় ৩৫ টাকা। দেশি মুরগির তরকারি প্রতি বাটি ৩৫ টাকা, ব্রয়লার ৩৫ টাকা। এ ছাড়া অন্যান্য খাবারের মধ্যে মুরগির খিচুড়ি ৫০ টাকা, তেহারি ৭০ টাকা।

হিসাব করে দেখা গেছে, এই দামে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর এক বেলা খাবারের জন্য ব্যয় হয় ৫০ টাকা করে। দৈনিক হিসাবে যা দাঁড়ায় ১৫০ টাকা অর্থাৎ মাসে একজন শিক্ষার্থীকে কমবেশি প্রায় সাড়ে ৪ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয় কেবল খাবারের পেছনে।

কণা আজকের পত্রিকাকে বলেন, ‘এত দাম আমাদের মতো সাধারণ পরিবারের একজন শিক্ষার্থীর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। ফলে বাধ্য হয়েই বেশির ভাগ সময় শুধু শাক আর ডাল দিয়ে খাবার শেষ করতে হয়।’

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, আগস্টে খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেড়ে ১২ দশমিক ৫৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, যা ১২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। অর্থাৎ গত বছর যে খাবার কিনতে ১০০ টাকা লাগত, সেই খাবার কিনতে এ বছর লাগছে ১১২ টাকা ৫৪ পয়সা। তবে নভেম্বরে এসে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে। পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুসারে, নভেম্বরে মূল্যস্ফীতি ছিল ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং আগের মাস অক্টোবরে এই হার ছিল ৯ দশমিক ৯৩ শতাংশ। ফলে খুব বেশি হেরফের হয়নি বলা চলে।

Manual2 Ad Code

খাবারের বেশি দামের বিষয়টি স্বীকার করেন হলের প্রাধ্যক্ষ দীপিকা রানি সরকার। তিনি বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে ভর্তুকি দিয়ে খাবারের মূল্য কমিয়ে আনার কথা ভাবছে প্রশাসন।’

Manual3 Ad Code

দ্রব্যমূল্যের কারণে খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন শিক্ষার্থীদের শরীর ও মনের ওপর কী প্রভাব ফেলছে তা জানতে চাইলে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি চিফ মেডিকেল অফিসার ডা. মিতা শবনম বলেন, ‘এতে শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছে। ঠিকমতো পড়াশোনার পর্যাপ্ত দৈহিক ও মানসিক শক্তি তাঁদের থাকছে না। এমনটা দীর্ঘদিন চলতে থাকলে শিক্ষার্থীরা ‘ডিপ্রেশনেও’ চলে যেতে পারে।’

কিন্তু এমন পরিস্থিতির মধ্যেও সকালের নাশতা যাতে কোনোভাবেই বাদ না পড়ে, পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সার্বিক খাবারের বিষয়ে সচেতন থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

Manual5 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code