

ডেস্ক রিপোর্ট: হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে নতুন পরিকল্পনা নিয়ে ওয়াশিংটনের আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় থাকা ইরান মঙ্গলবার মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অবকাঠামোয় নতুন হামলার হুমকি দিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটি এ বিষয়ে তাদের বক্তব্য আরও কঠোর করেছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইতোমধ্যে তেহরানের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছেন। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সোমবার বলেছেন, তিনি মার্কিন কর্মকর্তাদের কাছ থেকে এক দিনের মধ্যে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক জবাব পাওয়ার আশা করছেন।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে যুদ্ধের তীব্রতা কমে এলেও তেহরান হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল লক্ষ্য করে হামলা অব্যাহত রেখেছে। অন্যদিকে ওয়াশিংটন নতুন করে সামরিক পদক্ষেপের পরিবর্তে অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের পথে এগোচ্ছে।
ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কালিবাফ মঙ্গলবার নতুন হামলার হুমকি দিয়ে বলেছেন, ইরানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হলে এ অঞ্চলের কোনো অবকাঠামোই নিরাপদ থাকবে না।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রচারিত এক ভিডিওতে ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকারও কালিবাফ বলেন, ‘যে অঞ্চলে আমরা তেল বিক্রি করতে পারব না, সেখানে অন্য কেউও তেল বিক্রি করতে পারবে না; অথবা আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে কোনো অবকাঠামোই নিরাপদ থাকবে না।’
ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে অবরোধ বজায় রেখেছে ইরান।
যুদ্ধ শুরুর আগে বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হতো।ইরানকে তেল রপ্তানি থেকে বিরত রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী দেশটির বন্দরগুলোতে পাল্টা অবরোধ বজায় রেখেছে।
হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সোমবার রাতে বলেন, কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা ‘কিছু প্রস্তাব উপস্থাপন করেছে এবং আমরা সেগুলো নিয়ে আলোচনা করেছি; তারা বিষয়টি আবারও আমেরিকান পক্ষের সঙ্গে আলোচনা করবে। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের চূড়ান্ত জবাব আমাদের জানানো হবে।’
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে নিউইয়র্কে থাকা আরাকচি বলেন, ‘কাতারিরা আশা করছে, আগামীকালের মধ্যে এটি করা সম্ভব হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বর্তমানে আমাদের পুরো মনোযোগ শুধু হরমুজ প্রণালির ওপর এবং প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া কিছু শর্ত পূরণের ওপর নির্ভর করছে, যেসব শর্ত আমরা অপর পক্ষকে জানিয়েছি।’গত সপ্তাহে নিউইয়র্কে আরাকচি ও মার্কিন প্রতিনিধিদলের সদস্য স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনারের মধ্যে আলোচনা হয়।
মঙ্গলবার কাতারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি বলেন, ‘বেশ কয়েকটি বৈঠক হয়েছে এবং কিছু বার্তাও আদান-প্রদান হয়েছে, যার মধ্যে নিউইয়র্কে এবং এর আগেও কিছু বার্তা বিনিময় হয়েছে।’তিনি বলেন, ‘বর্তমান প্রচেষ্টার লক্ষ্য হচ্ছে পক্ষগুলোর মধ্যে অভিন্ন ভিত্তি তৈরি করা।’
অবরোধ প্রত্যাহারের শর্ত হিসেবে ইরান মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে সাত দিনের যুদ্ধবিরতির দাবি জানিয়েছে। এর মধ্যে লেবাননও রয়েছে, যেখানে ইরানের মিত্র হিজবুল্লাহর ওপর ইসরাইল নিয়মিত হামলা চালিয়ে আসছে।
এ ছাড়া ইরান বিদেশে থাকা দেশটির জব্দ সম্পদ ছাড়, তেল খাতের ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং দেশটির বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ বন্ধের দাবি জানিয়েছে।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিয়ে উভয় পক্ষই নিজেদের নিয়ন্ত্রণের দাবি করছে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন চলছে। অন্যদিকে তেহরানের দাবি, নৌপথটি বন্ধ রয়েছে।
মঙ্গলবার ইরানের সামরিক বাহিনীর আদর্শিক শাখা ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ডস (আইআরজিসি) বলেছে, ‘প্রণালিটি খোলা রয়েছে—যুক্তরাষ্ট্রের এই দাবি মিথ্যা।’
আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি বলেন, ‘অন্ধকারের আড়ালে ট্রান্সপন্ডার বন্ধ করে বিপুল ব্যয়ে কয়েক শ ব্যারেল তেল পাচার করা মানেই প্রণালিটি খোলা থাকা নয়।’
তিনি বলেন, ‘প্রকৃত অর্থে একটি খোলা প্রণালি হলো এমন একটি নৌপথ, যেখানে আগের মতো প্রতিদিন অন্তত ১২৫টি জাহাজ চলাচল করবে এবং ন্যূনতম ২ কোটি ব্যারেল তেল ও পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য পরিবহন করবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘যে কোনো জাহাজ প্রণালিটি দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলে ক্ষতির মুখে পড়বে- হয় আমরা সেটিতে হামলা করব, নয়তো সেটি মাইনে ধাক্কা খাবে।’ হরমুজ প্রণালিতে তেহরানের কঠোর নিয়ন্ত্রণ উপসাগরীয় দেশগুলোর ওপর ব্যাপক চাপ সৃষ্টি করেছে। এসব দেশও ইরানের হামলার শিকার হয়েছে।
কাতারের মুখপাত্র আল-আনসারি মঙ্গলবার বলেন, ইরানি কর্তৃপক্ষের ‘আমাদের দেশগুলোকে এই যুদ্ধ থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং প্রতিবেশীদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন না চালানোর বিষয়ে খুব স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া প্রয়োজন’।