বাড়ছে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে লেনদেন, বাড়ছে প্রতারণাও

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual5 Ad Code

বেসরকারি ব্যাংকের একজন কর্মকর্তা ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছেন। বাসে ওঠার কিছুক্ষণ পরই তার মোবাইলে একটি ফোন আসে। মোবাইলের স্কিনে জিপি লেখা দেখে তিনি ফোনটি ধরেন। অপর প্রান্ত থেকে তাকে বলা হয়, গ্রামীণফোনের সার্ভারে কাজ চলছে, আধা ঘণ্টার জন্য ফোনটি বন্ধ না রাখলে তার হ্যান্ডসেটটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। পরামর্শ শুনে তিনি মোবাইল সেটটি বন্ধ করে দেন। এর মধ্যে প্রতারক চক্র তার স্ত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করে জানায়, তিনি অ্যাক্সিডেন্ট করেছেন। হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। দ্রুত অপারেশন করতে হবে। এই মুহূর্তে ২০ হাজার টাকা দরকার। পরিবারের লোকজন তার মোবাইলে বারবার চেষ্টা করেও বন্ধ পান। বাধ্য হয়ে দুটি নম্বরে ২০ হাজার টাকা বিকাশ করে দেন। আধা ঘণ্টা পর ওই কর্মকর্তা ফোনটি চালু করার পর দেখেন মিসকল অ্যালার্টে প্রচুর ফোন এসেছে। দ্রুত তিনি পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিষয়টি জানতে পারেন। পরে ওই বিকাশ নম্বর বন্ধ পান। এটা একটা প্রতারণা, এমন হাজারো -প্রতারণা হচ্ছে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে। সাধারণ মানুষ প্রতারণার ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হচ্ছে। ফলে অর্থ লেনদের জনপ্রিয় এই মাধ্যম চরম আস্থার সংকটে পড়ছে।

 

Manual6 Ad Code

জিপি লেখা থেকে কীভাবে ফোন করা সম্ভব? জানতে চাইলে বিকাশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, ‘নম্বর মাস্কিং করে যে কোনো লেখা, বা নম্বর থেকে ফোন করা সম্ভব। এক্ষেত্রে এমনটাই হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে তিনি ফোনটি বন্ধ করার আগে যদি পরিবারের সঙ্গে কথা বলে নিতেন তাহলে হয়তো এই ধরনের সংকটে পড়তেন না। আসলে এই প্রতারণা থেকে বাঁচার একটাই পথ সচেতনতা।’

গত বছরের মে মাসের শেষে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ছিল বিশ্বে দশম। আর এখন সপ্তম। তখন ৭ কোটি নম্বরে এই ধরনের সার্ভিস চালু ছিল। সচল ছিল ৩ কোটি। বর্তমানে ৯ কোটি ২৯ লাখ ৩৭ হাজার নম্বরে এই ধরনের সার্ভিস চালু রয়েছে। এর মধ্যে ৫ কোটি উপরে সচল আছে। তখন দৈনিক ৯০০ কোটি টাকার বেশি লেনদেন হতো। এখন দৈনিক গড়ে দেড় হাজার কোটি টাকার মতো লেনদেন হয়। গত আগস্ট মাসে লেনদেনের পরিমাণ ছিল ৪১ হাজার ৪০৩ কোটি টাকা। বর্তমানে ১৫টি ব্যাংকসহ ১৬টি প্রতিষ্ঠান সেই সেবার সঙ্গে যুক্ত।

 

গোয়েন্দা পুলিশ মোবাইল ব্যাংকিং নিয়ে প্রতারণার ঘটনাগুলোর তদন্ত করে। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উপ-কমিশনার ওয়ালিদ হোসেন বলেন, ‘মোবাইল ব্যাংকিংয়ে হাজার রকম প্রতারণা হচ্ছে। প্রতারকরা নতুন নতুন কৌশল বের করছেন। এই চক্রের সঙ্গে শুধু দেশের প্রতারকরাই নয়, বিদেশি প্রতারকদের সন্ধান মিলেছে।’

গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহার করে যে ধরনের অপরাধ হচ্ছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো—পকেটমার, গাড়ি গাড়ি গ্রুপ চুরির পর এই মাধ্যমে টাকা নিচ্ছে, হ্যালো পার্টি নামে প্রতারক গ্রুপ, জিনের বাদশা পরিচয় দিয়ে ফোন, জিম্মি করে চাঁদা আদায়, অপহরণের পর চাঁদা দাবি, সন্ত্রাসীদের নামে চাঁদা, ভুয়া ফ্লেক্সি লোডের নামে টাকা ফেরত, জঙ্গি কার্যক্রমে টাকা লেনদেন, অশ্লীল ছবি সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হুমকি দিয়ে টাকা আদায়, ফেসবুক হ্যাক করে টাকা আদায়সহ বহুমাত্রিক প্রতারণা। এসব অপরাধের টাকা মূলত মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন হচ্ছে।

সর্বশেষ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম বিভাগের সোশ্যাল মিডিয়া ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন টিম শনিবার এই চক্রের ৯ জনকে গ্রেফতার করেছে। ওয়ালিদ হোসেন বলেন, বিকাশ প্রতারক চক্রের সদস্যরা প্রধানত চারটি গ্রুপে বিভক্ত হয়ে প্রতারণা কর্মকাণ্ড সম্পন্ন করে থাকে। প্রথম গ্রুপ মাঠ পর্যায়ে বিভিন্ন বিকাশের দোকানে টাকা বিকাশ করার কথা বলে অবস্থান নেয়। একপর্যায়ে লেনদেনকৃত বিকাশ খাতার ছবি তুলে হোয়াটসঅ্যাপে দ্বিতীয় গ্রুপের কাছে এলাকা উল্লেখ করে পাঠিয়ে দেয়। এভাবে খুব কৌশলে তারা প্রতারণা করে থাকে। এভাবে হাতিয়ে নেওয়া টাকা বিভিন্ন হাত বদল করে ক্যাশ আউট করে, ফলে প্রতারকদের অবস্থান শনাক্ত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বিকাশের একজন মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তা ইত্তেফাককে বলেন, সবচেয়ে বেশি যে অভিযোগ আসছে, সেটা হল বিকাশ কর্তৃপক্ষের সহায়তার জন্য ব্যবহূত ১৬২৪৭ নম্বরের অনুকরণে ফোন নম্বরে +১৬২৪৭ (পার্থক্য শুধু + চিহ্ন) নম্বরে ফোন আসে। বিকাশ কর্তৃপক্ষের পরিচয় দিয়ে সমস্যার কথা বলে এবং সমাধানের জন্য পিন নম্বর চায়। মানুষ নম্বর দেখে মনে করে বিকাশ থেকেই এসেছে। আসলে সেটা মাস্কিং নম্বর।

তবে ডাক বিভাগের মোবাইল ব্যাংকিং নগদের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, তাদের প্রযুক্তি এতটাই উন্নত যে কোনো গ্রাহক যদি নিজের পিন নম্বর কারো সঙ্গে শেয়ার না করেন, তাহলে তাদের প্রযুক্তি ভেঙে প্রতারণা করা সম্ভব নয়।

Manual7 Ad Code

ঢাকার শেওড়াপাড়ার বাসিন্দা আকবর হোসেন। পেশায় ব্যবসায়ী আকবরের মোবাইলে একদিন সন্ধ্যায় তার এক গ্রাহক বগুড়া থেকে ২৫ হাজার টাকা পাঠান। এর কিছুক্ষণ পর তার মোবাইলে একটি অচেনা নম্বর থেকে ফোন আসে। ভুলে কিছু টাকা তার মোবাইলে চলে গেছে জানিয়ে ঐ ব্যক্তি টাকাগুলো ফেরত চান। কিন্তু তিনি কোনো এসএমএস না পাওয়ার কথা জানালে ঐ ব্যক্তি বলেন, নেটওয়ার্কের সমস্যার কারণে হয়তো এসএমএস যায়নি, ব্যালেন্স চেক করলেই আপনি টাকা দেখতে পাবেন। এরপর তিনি ব্যালেন্স চেক করে একাউন্টে ৩৫ হাজার টাকা দেখতে পান এবং কিছুক্ষণ পর এসএমএসও পান। এরপর ঐ ব্যক্তির কথামতো তাকে ১০ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন। টাকা পাঠানোর পর তিনি দেখতে পান তার বিকাশ একাউন্ট থেকে ১০ হাজার টাকা কাটার পরিবর্তে কেটে নেওয়া হয়েছে ২০ হাজার টাকা, যার ফলশ্রুতিতে তার একাউন্টে টাকার পরিমাণ অবশিষ্ট থাকে ১৪ হাজারের কিছু বেশি। বিষয়টা বুঝতে পারলেন না তিনি।

Manual3 Ad Code

রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইলের বাসিন্দা মাসুদ রানা একজন বেসরকারি চাকরিজীবী। একদিন সকালে শনির আখড়ার একটি দোকান থেকে তার গ্রামীণফোন নম্বরের বিকাশ অ্যাকাউন্টে ৭ হাজার টাকা ক্যাশ ইন করেন। কিছুক্ষণ পর একটি নম্বর থেকে ফোনে কল পান মাসুদ। মহাখালীর বিকাশের প্রধান কার্যালয়ের কর্মকর্তা জাহিদ হাসান পরিচয় দিয়ে ফোনে ঐ ব্যক্তি বলেন, আপনার অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ, আপনার এনআইডি দিয়ে আরো চারটি বিকাশ অ্যাকাউন্ট চালানো হচ্ছে। আপনি তিনটি তথ্য দিলে আপনার অ্যাকাউন্ট আবার আমরা চালু করে দেব। না হলে এটি বন্ধ থাকবে। এনআইডি কাডে নাম, নম্বর ও পিন নম্বর জানতে চান ঐ ব্যক্তি। মাসুদ তথ্য দিতে অস্বীকার করলে তিনি বলেন, তথ্য না দিলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ থাকবে। এ পর্যায়ে প্রতারকেরা বিকাশের হেল্পলাইনের নম্বর ১৬২৪৭ স্পুফিং করে কয়েকবার কল দেন। ঐ কল রিসিভ করেননি মাসুদ রানা। এরপরই তিনি বিকাশ অ্যাকাউন্টে প্রবেশ করে দেখেন পিন নম্বর নিচ্ছে না। পিন নম্বর দিলে লেখা উঠছে ‘দ্য অ্যাকসেস চ্যানেল ইজ ডিজ্যাবল ফর দ্য ইউজার’। পরে বিকাশের হেল্পলাইনে ফোন করলে সেখান থেকে জানানো হয়, অ্যাকাউন্টে পিন নম্বর পরপর তিনবার ভুল দেওয়ায় অ্যাকাউন্ট ব্লক হয়ে গেছে। এ ঘটনায় যাত্রাবাড়ী থানায় একটি জিডি করেন তিনি।

Manual8 Ad Code

 

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code