বিধিনিষেধে বাংলাদেশের রপ্তানিতে তেমন প্রভাব দেখছেন না ভারতীয় ব্যবসায়ীরা

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ১১ মাস আগে

Manual7 Ad Code

অনলাইন ডেস্ক:

ভারত স্থলবন্দর হয়ে দেশটিতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ বেশ কিছু পণ্য রপ্তানি নিষিদ্ধ করেছে। তৈরি পোশাকের চালান নিয়ে যাওয়া কিছু ট্রাক ভারতে ঢুকতে না পেরে ফিরে আসতে শুরু করেছে। তবে ভারতের শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই নিষেধাজ্ঞার ফলে ভারতে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে খুব বেশি প্রভাব পড়বে না।

সাধারণত প্রতিদিন সীমান্তে প্রচুর ট্রাকের ভিড় থাকে। শীতকালে এই সংখ্যা দৈনিক ২০০ ছাড়িয়ে যায়। এর একটি বড় অংশ নেপাল ও ভুটানে শীতের পোশাক বহনকারী ট্রাক। ভারত স্থলবন্দর দিয়ে পোশাক বাণিজ্য বন্ধ করলেও নেপাল ও ভুটানে চালান পাঠানো যাবে।

বাংলাদেশ স্থলবন্দর দিয়ে ভারতীয় সুতা আমদানি বন্ধ করার পর ভারতও পাল্টা ব্যবস্থা নেয়। হিলি ও বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে বাংলাদেশে চাল রপ্তানি বন্ধ করে দেয় ভারত। বাংলাদেশের উচ্চ ট্রানজিট চার্জও দুই দেশের মধ্যে অসন্তোষের কারণ। এর ফলে ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো তাদের উৎপাদিত পণ্য বিক্রি এবং কাঁচামাল সংগ্রহে সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।

তবে সব মিলিয়ে পোশাক খাতে এই বন্দর নিষেধাজ্ঞার প্রভাব স্বল্পমেয়াদী হবে। কারণ, বাংলাদেশ এখনও শুল্কমুক্ত সুবিধায় ভারতে পোশাক রপ্তানি করতে পারে, যেখানে অন্যান্য দেশকে প্রায় ২০ শতাংশ শুল্ক দিতে হয়। ভারতে বাংলাদেশের নির্দিষ্ট কিছু পণ্যের ওপর আমদানি নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও, ভারতীয় ফাস্ট মুভিং কনজ্যুমার গুডস বা এফএমসিজি (যা খুব দ্রুত ও কম দামে বিক্রি হয়) কোম্পানিগুলো জানিয়েছে, তাদের ব্যবসা আগের ‘মতোই’ রয়ে গেছে। এমনকি, যাদের বাংলাদেশে দেশে বিনিয়োগ আছে, তাদের ক্ষেত্রেও।

গ্লোবাল ট্রেড রিসার্চ ইনিশিয়েটিভের প্রতিষ্ঠাতা অজয় শ্রীবাস্তব বলেন, ‘এইচঅ্যান্ডএম, জারা, প্রাইমার্ক, ইউনিক্লো এবং ওয়ালমার্টের মতো শীর্ষস্থানীয় আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলো বাংলাদেশ থেকে পোশাক সংগ্রহ করে, যার কিছু অংশ ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রবেশ করে। ভারতীয় উৎপাদনকারীরা দীর্ঘদিন ধরে অসম প্রতিযোগিতার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। তারা স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত কাপড়ের উপর ৫ শতাংশ জিএসটি (এক ধরনের শুল্ক) দেন, যেখানে বাংলাদেশি সংস্থাগুলো চীন থেকে শুল্কমুক্ত কাপড় আমদানি করে এবং ভারতে বিক্রির জন্য রপ্তানি প্রণোদনা পায়—এতে তারা আনুমানিক ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্য কম ধরার সুবিধা পায়।’

ভারতের অ্যাপারেল এক্সপোর্ট প্রোমোশন কাউন্সিলের মহাসচিব মিথিলেশ্বর ঠাকুর বলেন, ‘তবে আসল সমস্যা হল বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়া মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চলের (সাফটার) অধীনে ভারতে শুল্কমুক্ত সুবিধা এবং স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) হিসেবে কম মজুরি ও ভর্তুকি ব্যবস্থার কারণে কম উৎপাদন খরচের সুবিধা পাচ্ছে।’

Manual5 Ad Code

তবে বাংলাদেশের ওপর এই নিষেধাজ্ঞার কারণে ভারতের তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারকরা, বিশেষ করে ক্ষুদ্র, ছোট এবং মাঝারি উদ্যোগগুলো আসলে লাভবান হতে পারে। ১৭ মে ভারত আরোপিত নিষেধাজ্ঞার আওতায় বাংলাদেশ মুম্বাইয়ের নক সেবা এবং কলকাতার (কিদারপুর ও হলদিয়া) বন্দর ছাড়া আর কোনো স্থল বা সমুদ্রবন্দর দিয়ে তৈরি পোশাক রপ্তানি করতে পারবে না। ফলে বাংলাদেশকে যদি পোশাক সমুদ্রপথে পাঠাতে হয় তাহলে পরিবহন খরচ বাড়বে এবং ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা কমতে পারে। সমুদ্রপথে পরিবহন স্থলপথের চেয়ে ধীরগতির হওয়ায় পণ্য পৌঁছাতে বেশি সময় লাগবে।

এই বিষয়ে মিথিলেশ্বর ঠাকুর বলেন, ‘এর ফলে লিড টাইম বাড়তে পারে এবং ভারতীয় খুচরা বিক্রেতা ও ভোক্তাদের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের সক্ষমতা নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে।’

একই বিষয়ে ক্লথিং ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশন অব ইন্ডিয়ার সভাপতি সন্তোষ কাটারিয়া বলেন, পোশাক আমদানিতে বন্দর নিষেধাজ্ঞাকে আমরা স্বাগত জানাই। কারণ, এটি ‘এখানে (ভারতে) কম দামি পোশাকের অনিয়ন্ত্রিত প্রবাহ নিয়ে শিল্পের দীর্ঘদিনের উদ্বেগ দূর করবে।’ তিনি এই সিদ্ধান্তকে ‘সময়োপযোগী’ আখ্যা দিয়ে বলেন, এটি ‘ভারতের পোশাক উৎপাদনে আত্মনির্ভরশীলতা বাড়াবে।’

ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য: বন্দরে বিধিনিষেধে কার লাভ, কার ক্ষতিভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্য: বন্দরে বিধিনিষেধে কার লাভ, কার ক্ষতি
বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানি মূলত কিছু নির্দিষ্ট ক্যাটাগরিতে হয়ে থাকে। যেমন—পুরুষদের কটন ট্রাউজার এবং সিন্থেটিক ফাইবারের জ্যাকেট/ব্লেজার। এগুলো স্থানীয়ভাবে স্টাইল ইউনিয়ন এবং মার্কস অ্যান্ড স্পেন্সার ও জারার মতো অনেক খুচরা চেইন ও ব্র্যান্ডের জন্য আমদানি করা হয়।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতে বাংলাদেশ থেকে মোট পোশাক রপ্তানি করেছে ৬৭৭ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরের ৫৯৫ দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলারের চেয়ে ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। মিথিলেশ্বরঠাকুর বলেন, ‘এর মধ্যে শুধু পেট্রাপোল স্থলবন্দর দিয়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ৫১৫ দশমিক ৩ মিলিয়ন ডলার, যা বাংলাদেশ থেকে ভারতে মোট পোশাক আমদানির প্রায় ৭৬ শতাংশ।’

ফলে স্থলবন্দরের নিষেধাজ্ঞার কারণে ভারতীয় বাজারে বাংলাদেশের পোশাকের প্রবেশাধিকার সীমিত হতে পারে। বিশেষ করে, এর কারণে বাংলাদেশের মাঝারি আকারের পোশাক কারখানাগুলো প্রভাবিত হতে পারে। এই কারখানাগুলো রপ্তানির জন্য স্থলপথের উপর নির্ভরশীল। কারণ, এই পথ পরিবহনের জন্য সস্তা এবং কার্যকর, বিশেষ করে ছোট চালানের জন্য।

তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, যেহেতু কলকাতা এবং নব সেবা সমুদ্রবন্দর দিয়ে পোশাক আমদানি এখনও অনুমোদিত, তাই দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব মূলত নির্ভর করবে স্থলবন্দর থেকে তৈরি পোশাক আমদানি কত দ্রুত এবং কী পরিমাণে সমুদ্রবন্দরে স্থানান্তরিত হয় তার উপর।

তবে ভারতের এফএমসিজি কোম্পানিগুলো আমদানি নিষেধাজ্ঞার তাৎক্ষণিক কোনো প্রভাব দেখছে না। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একটি এফএমসিজি কোম্পানির এক ঊর্ধ্বতন নির্বাহী দ্য হিন্দু বিজনেসলাইনকে বলেছেন, ‘দেশের (ভারতের) বেশিরভাগ এফএমসিজি কোম্পানি যারা বিনিয়োগ করেছে, তারা স্থানীয় বাজারের জন্যই উৎপাদন করে। তাই, আমদানি নিষেধাজ্ঞার তাদের কার্যক্রমে প্রভাব ফেলার সম্ভাবনা কম।’

Manual5 Ad Code

এদিকে, ভারতের নিষেধাজ্ঞার কারণে বাংলাদেশের প্রকল্প/সহযোগিতায় জড়িত ভারতীয় রেলওয়ে সংস্থাগুলো নির্মাণ ও কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার কারণে বিলম্বের সম্মুখীন হতে পারে। রেলওয়ে প্রকল্পের জন্য পণ্য ও উপকরণ চলাচলের সঙ্গে সম্পর্কিত সমস্যা বাড়তে পারে, যা প্রকল্পের সময়সীমাকে প্রভাবিত করতে পারে।

ভারতীয় রেলওয়ের রপ্তানি শাখা রাইটসের ২০২৫ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত ১ হাজার ৩৬০ কোটি রুপির ক্রয়াদেশ ছিল। এর মধ্যে প্রধান আন্তর্জাতিক অর্ডারগুলো হলো—বাংলাদেশের জন্য ৯০০ কোটি রুপির ২০০টি যাত্রীবাহী কোচ, মোজাম্বিকের জন্য ৩০০ কোটি রুপির ১০টি লোকোমোটিভ এবং দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে তিনটি অর্ডার (প্রতিটি ৩টি লোকোমোটিভের জন্য) প্রায় ১৫০ কোটি রুপি।

Manual3 Ad Code

এই বিষয়ে অবগত এক ব্যক্তি বলেছেন, ‘লোকোমোটিভ ও কোচ উভয় সরবরাহের প্রাথমিক কাজ এরই মধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। উপরন্তু, আন্তঃদেশীয় প্রতিনিধি দলের সফর এবং চলমান দ্বিপাক্ষিক আলোচনা প্রকল্প সমন্বয় ও বাস্তবায়নকে আরও শক্তিশালী করছে।’

Manual6 Ad Code

২০২৫ অর্থবছরে, বাংলাদেশে ভারতীয় ইস্পাত রপ্তানি—মূলত অবকাঠামো প্রকল্পের জন্য—৪২৫ কোটি টাকা বা ৫ লাখ ৬ হাজার টন ছিল। এর মধ্যে ৩ লাখ ৬৩ হাজার টন স্পঞ্জ আয়রন অন্তর্ভুক্ত ছিল। এক ব্যবসায়ী বলেছেন, ‘স্পঞ্জ আয়রন বা বিলেটের নির্বাচিত সরবরাহ ব্যতীত বাংলাদেশ থেকে সাধারণত খুব বেশি ফিনিশড স্টিলের অর্ডার আসে না।’ তবে নিষেধাজ্ঞার কারণে, এই রপ্তানিও প্রভাবিত হতে পারে বলে অনুমান তাঁর।

ডেস্ক: এস

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code