ইসলামিক ডেস্কঃ হালাল উপার্জন ও সুদমুক্ত লভ্যাংশের কথায় শরিয়ত সম্মতভাবে ব্যবসায়-বাণিজ্যে যেকোনো ধর্মপ্রাণ মানুষই বিনিয়োগে আগ্রহী হন। স্বাভাবিকভাবেই তখন বিনিয়োগকারী অন্যদেরও এক্ষেত্রে উৎসাহ দেন।
সম্প্রতি সুদমুক্ত শরিয়তসম্মত ব্যবসার নামে জনৈক ব্যক্তি কয়েক হাজার কোটি টাকা লোপাট করেছেন মর্মে খবর গণমাধ্যমে খবর এসেছে। এরও আগে এভাবে বেশ কিছু কোম্পানি মানুষের টাকা হাতিয়ে উধাও হয়ে গেছে। যা ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। এ প্রসঙ্গে কিছু কথা বলতে চাই খুব সংক্ষেপে।
ব্যবসা মৌলিকভাবে একটি হালাল কাজ, সৎ ব্যবসায়ীকে কিয়ামতের দিন বিশেষভাব সম্মানিত করার কথা হাদিসে এসেছে (তিরমিজি : ১২০৯)। রিবা (সুদ) হারাম ঘোষণার আয়াতে আল্লাহতায়ালা ক্রয়-বিক্রয় তথা ব্যবসাকে হালাল হিসেবে উল্লেখ করেছেন (সুরা আল বাকারা : ২৭৫)। কাজেই রিবা থেকে সত্যিই বাঁচতে চাইলে নিজে বা অন্যের সঙ্গে বিনিয়োগ/শেয়ারে ব্যবসার কোনো বিকল্প নেই।
প্রতিটি ব্যবসা ঝুঁকিযুক্ত। ঝুঁকি গ্রহণই মূলত লাভের অধিকার দেয়। ঝুঁকি সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া যায় না, তবে কমানো যায়। বিনিয়োগ বা ব্যবসা থেকে ঝুঁকিকে পুরোপুরি বাদ দিলে সেটা রিবায় পরিণত হয়। কোনো ব্যবসায় হয়তো ঝুঁকি কম হতে পারে বা বেশি হতে পারে। ব্যবসার পরিচালকের দক্ষতার স্বাক্ষর হবে ব্যবসায় ঝুঁকিকে সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা।
হালালভাবে ব্যবসার জন্য দুটো গুণ সমানভাবে প্রয়োজন, বরং যেকোনো দায়িত্বের জন্যই এ গুণ দুটো অপরিহার্য। কুওয়াহ-শারীরিক, মানসিক ও জ্ঞানগতভাবে ব্যবসায়িক কার্যসম্পাদনে সক্ষম হওয়া, হালাল-হারামের জ্ঞান থাকা; এবং আমানাহ-প্রতিষ্ঠানের ব্যক্তি, সম্পদ ও যাবতীয় দায়িত্বের প্রতি বিশ্বস্ততার স্বাক্ষর দেওয়া। আল্লাহর নবী হজরত মুসা (আ.) যখন মাদইয়ানে যান, হজরত শোয়াইব (আ.)-এর এক কন্যা তার বাবার কাছে প্রস্তাব দেন যেন হজরত মুসাকে (আ.) কাজে রাখা হয়, কারণ তিনি শারীরিকভাবে সক্ষম এবং বিশ্বস্ত (সুরা কাসাস : ২৬)। ওদিকে হজরত ইউসুফ (আ.) নিজেকে যখন মিসরের খাদ্য ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রাখার আবেদনে নিজের যোগ্যতা হিসেবে তুলে ধরেন এই বলে, তিনি হাফিজ (যোগ্য তত্ত্বাবধায়ক, সংরক্ষণকারী) ও আলিম (যথাযথ জ্ঞানী) (সুরা ইউসুফ : ৫৫)। হাফিজ ও আলিম তথা সংরক্ষণকারী ও জ্ঞানী, এ দুটো গুণ পূর্বোক্ত দুটো গুণের ভেতরই আছে।
Manual4 Ad Code
শুধু কুওয়াহ থাকলে হয়তো ব্যবসা ভালো হবে, তবে তার বিনিয়োগকারী এবং অন্যান্য স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে প্রতারণা করতে পারেন। আবার শুধু আমানতদার হলে তিনি সবার সঙ্গে সত্য বলবেন বটে, তবে ব্যবসার জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা না থাকায় বড় রকম ক্ষতি হতে পারে। কাজেই ব্যবসার অভিজ্ঞতা-যোগ্যতা এবং একই সঙ্গে আমানতদারিতা ও সততা-দুটোই সমানভাবে অপরিহার্য।
Manual1 Ad Code
উল্লেখ্য, আমাদের দেশে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানে যোগ্য লোকবল নিয়োগ দেওয়ার পরিবর্তে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতির মাধ্যমে অযোগ্য লোকদের নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি, অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, স্বামী-স্ত্রী ও নিজেদের আত্মীয়-স্বজনদের নিয়ে কোম্পানি গড়ে তোলেন, কেউ চেয়ারম্যান, কেউবা এমডি। ফলে প্রয়োজনীয় ব্যবসায়িক যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার অভাবে একটি প্রতিষ্ঠান বিনা কারণে মুখ থুবড়ে পড়তে বাধ্য হয়।
মুয়ামালা বা লেনদেনের ক্ষেত্রে সবাইকে অপরিচিতের ন্যায় মনে করতে হবে। এখানে আবেগের আসলে খুব জায়গা নেই। আবেগ আসবে আচরণ ও ব্যবহারের ক্ষেত্রে, মানুষের সঙ্গে আমাদের ব্যবহার হবে নিজ আত্মীয়ের মতো। কাজেই, প্রতিটি লেনদেনের আগে সে সম্পর্কে জানা যাচাই-বাছাই করা-এগুলো খুব মৌলিক ব্যাপার। একজন খুব সুন্দর বক্তব্য দিয়ে বা ভালো পরিচয় নিয়ে কোনো লেনদেনে আহ্বান জানালো, আর আমি যাচাই বাছাই না করেই জড়িয়ে গেলাম-এটা একজন সচেতন মুমিনের গুণ নয়।
একজন মুমিন শুধু বিশ্বাসেই শক্তিশালী হবেন এমনটি নয়, লেনদেনে বাছবিচারের ক্ষেত্রেও তিনি সজাগ হবেন। হাদিসে এসেছে, হজরত রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, একজন মুমিন একই গর্তে দুবার দংশিত হয় না (সহিহ্ বোখারি : ৬১৩৩)।
একজন মুসলিমকে ব্যবসা অবশ্যই হালালভাবে, শরিয়ত সম্মতভাবে করতে হবে। তবে শরিয়তসম্মত হলেই সে ব্যবসা লাভজনক হবে এমনটা জরুরি নয়। আবার শরিয়তসম্মত না হলেই সে ব্যবসা অলাভজনক হবে বিষয়টা সে রকমও নয়। কাজেই লাভজনক ব্যবসা শুনেই যেমন আমরা এটাকে হালাল ধরে নেব না, একইভাবে হালাল বা শরিয়তসম্মত শুনেই আমরা সেটা লাভজনক ব্যবসা বলে মনে করব না।
ব্যবসা শরিয়ত সম্মতভাবে হওয়ার জন্য কিছু গভর্নেন্স বা সুশাসন নীতি রয়েছে, আমরা যাকে শরিয়া গভর্নেন্স বলে জানি। শরিয়া গভর্নেন্সের একটি মৌলিক শর্ত হলো ব্যবসার শরিয়া নিশ্চিত করার জন্য শরিয়া বোর্ড থাকা। শরিয়া বোর্ড অভ্যন্তরীণ হতে পারে, কিংবা প্রতিষ্ঠান যদি ছোট হয় সেক্ষেত্রে বাহিরের কোনো শরিয়া পরামর্শক ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হতে পারে।
শরিয়া বোর্ড যোগ্য ও স্বাধীন হবে, নির্মোহভাবে মতামত প্রকাশ করবে। শরিয়া বোর্ড প্রতিষ্ঠানে কর্মরত, পরিচালক বা শেয়ারহোল্ডার হবেন না, কিংবা প্রতিষ্ঠানের প্রচারণায় কোনোরূপ অংশ নেবেন না। শরিয়া বোর্ডের দায়িত্ব হলো প্রতিষ্ঠান শরিয়া পরিপালনে কোনপর্যায়ে আছে তা শেয়ারহোল্ডারদের জানানো, শরিয়ার আলোকে বিভিন্ন সমস্যার সমাধান দেওয়া। তবে শরিয়া অনুযায়ী ব্যবসা পরিচালনা করা কিংবা শরিয়া বোর্ডের বক্তব্য বাস্তবায়ন করা এটা প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিষদ, ম্যানেজমেন্ট এবং বোর্ড অফ ডাইরেক্টরের দায়িত্ব।
প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিষদ, ম্যানেজমেন্টের বিভিন্ন স্তরের ব্যক্তিবর্গ প্রতিষ্ঠান সুন্দরভাবে পরিচালনা করছেন কি না- সে জন্য রয়েছে করপোরেট গভর্নেন্স বা করপোরেট শাসন নীতি। এ নীতিমালার আলোকে ব্যবস্থাপনা পরিষদ কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারবে আর কোন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে শেয়ারহোল্ডারদের অনুমতির প্রয়োজন হবে, কিংবা বোর্ডের অনুমোদনের প্রয়োজন হবে, এই বিষয়গুলো উল্লেখযোগ্য।
Manual4 Ad Code
শেয়ারহোল্ডারদের নিয়মিত রিপোর্ট দেওয়া, ব্যবসার বাস্তব পরিস্থিতি জানানো, বছর শেষ হলেই অ্যাকাউন্টসকে অডিটের জন্য সাবমিট করা এসব বিষয় ভালো করপোরেট গভর্নেন্সের উদাহরণ। একটি হালাল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান একই সঙ্গে শক্তিশালী করপোরেট গভর্নেন্স এবং শরিয়া গভর্নেন্স মেনে চলবে।
কোথাও বিনিয়োগ করার আগে প্রতিষ্ঠানের বিগত কয়েক বছরের আর্থিক বিবরণী দেখুন, তাদের বর্তমান শেয়ারহোল্ডারদের সঙ্গে তাদের কার্যাবলি কেমন তা দেখুন, ব্যবসাটি সম্পর্কে একটি স্বাভাবিক ধারণা নিন। চুক্তি ভালোভাবে পড়–ন এবং সবসময় লিখিত চুক্তি করুন। চুক্তির প্রতিটি ধারা, বিশেষ করে প্রতিষ্ঠান কোনো অবহেলা বা প্রতারণা করলে সে ক্ষেত্রে কীভাবে সুরাহা করা হবে এই বিষয়গুলো পরিষ্কার করে নিন। চুক্তি লিখিত হওয়া ছাড়া কোনো বিনিয়োগ কখনো করবেন না।
প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠান পরিচালকদের ব্যাকগ্রাউন্ড দেখুন। তাদের অতীতে সফল ও ব্যর্থ ব্যবসাগুলো কী, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা আছে কি না, আমানতদারি আছে কি না এ বিষয়গুলো দেখুন। সর্বোপরি যে ব্যবসায় বিনিয়োগ করছেন এ ব্যবসায় ন্যূনতম কিছু ধারণা গ্রহণ করার চেষ্টা করুন। যেহেতু ঝুঁকিমুক্ত কোনো ব্যবসা নেই কাজেই যতটুকু ঝুঁকি গ্রহণ করা সম্ভব ততটুকুই বিনিয়োগ করুন। একই জায়গায় নিজের সব পুঁজি দেবেন না, ব্যক্তি যেই হোক না কেন। এক কথায় কিছু হোমওয়ার্ক করুন এরপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করুন।
শরিয়ত সম্মতভাবে ব্যবসার প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি দেশীয় আইন অনুযায়ী বিনিয়োগকারীদের অধিকার সুনিশ্চিত কি না এ বিষয়টিও দেখুন। কারণ দেশীয় আইনে বিনিয়োগকারীদের যদি কোনো অধিকার প্রতিষ্ঠিত না থাকে, সে ক্ষেত্রে একজন প্রতারকের জন্য প্রতারণা করাটা অনেক সহজ হয়ে যায়। কাজেই কোন ভিত্তিতে বিনিয়োগ করা হচ্ছে, তার আদৌ আইনি কোনো অবকাঠামো রয়েছে কি-না-এ বিষয়টি খেয়াল করুন।