

জালাল উদ্দিন, রংপুর ॥
অগ্রহায়ণ থেকে আশ্বিন-কার্তিক মাস। এই সময়টাকে বলা হয়ে থাকে শুটকির মৌসুম। ভরা মৌসুমেও রংপুরের বৃহত্তর দর্শনা ঘাঘট পাড়ার শুঁটকি হাটে ক্রেতাদের ভিড় আগের মত দেখা যায় না। শুঁটকিহাটে কেনা বেচা নেই বললেই চলে। আগের মত ক্রেতারা আসছেনা সেখানে শুঁটকি কিনতে। আগে এই শুঁটকির হাটে দিনে ২০ লাখ টাকার শুঁটকি কেনা বেচা হলেও বর্তমানে এর পরিমাণ দাড়িয়েছে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকায়।
পাইকারী শুঁটকি ব্যবসায়ীরা খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বাকিতে শুঁটকি মাছ বিক্রি করায় সময় মতো টাকা উত্তোলন করতে না পেরে অনেক ব্যবসায়ী এখন ঋণগ্রস্ত হয়েছেন। এতে করে তারা তাদের বাপ দাদার পেশা বদলাতে বাধ্য হচ্ছেন। শুটকি ব্যবসায়ীদের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য গঠিত কমিটির কার্যক্রম না থাকায় প্রতিনিয়ত সাধারণ শুঁটকি ব্যবসায়ীরা ভোগান্তিতে পড়ছে। ফলে দর্শনার মোড়ে ২৮ বছর আগে গড়ে ওঠা সম্ভাবনাময়ী শুঁটকির আড়ত এলাকায় ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে।
আড়ত সূত্রে জানা গেছে, ১৯৮০ সালে প্রায় দেড় একর জমিতে শুঁটকি মাছের আড়তটি গড়ে ওঠে। শুরুর দিকে আড়তে প্রায় ৫০ জন ব্যবসায়ী থাকলেও এখন ব্যবসায়ী রয়েছে মাত্র ২২ জন। বাকিতে শুঁটকি মাছ বিক্রির টাকা তুলতে না পারায় পুঁজি হারিয়ে অনেক ব্যবসায়ী পথে বসেছেন। অনেক ব্যবসায়ী ব্যাংকের ঋণ নিয়ে পরিশোধ করতে না পারায় তারা ব্যবসা গুটিয়ে সটকে পড়েছেন বলে এখানকার ব্যবসায়ীরা জানান।
আড়ত ঘুরে দেখা গেছে, বর্তমানে দেশি মাছের শুঁটকির মৌসুম থাকায় আড়তে সামুদ্রিক শুঁটকি মাছে ভরে গেছে। এখানে দেশি মাছের শুঁটকি খুব একটা দেখা য়ায় না। শুটকি ব্যবসায়ী মোঃ আজিজ, আব্দুল হাকিম, আজগার আলীসহ এখানকার একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, বছরের সব সময় শুঁটকি মাছের চাহিদা থাকে। তবে বৈশাখ থেকে জ্যৈষ্ঠ মাস পর্যন্ত শুঁটকির চাহিদা সবচাইতে বেশি। সামুদ্রিক শুঁটকির বৃহৎ অংশ আসে চট্টগ্রাম, খুলনা, পটুয়াখালী, বরিশাল ও রাজশাহীর চলন বিলসহ দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে। ভারতীয় (এলসি) শুঁটকি মাছ সরাসরি না এলেও নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর শুঁটকি আড়ত হয়ে রংপুরের আড়তে প্রবেশ করে।
আড়তে সামুদ্রিক শুঁটকি মাছের মধ্যে ফেসা, কইড়া, লটকি, বালিয়া, মিতি চকলেট, কাচকি, পাতা, চেলা অন্যতম। মাছের আকার এবং সংরক্ষণের প্রকারভেদে একই শুঁটকির দামের মধ্যে বেশ তারতম্য দেখা যায়। চেলার কেজি ২৫০ থেকে ৩৮০ টাকা, কাচকি ১৬০ থেকে ২২০ টাকা, ফেসা ১০০ থেকে ৩০০ টাকা, ধঞ্চা ৪০ থেকে ১০০ টাকা, লটকি ১৬০ থেকে ৩০০ টাকা, মিতি চকলেট ১০০ থেকে ১৩০ টাকা ও বালিয়া ৯০ থেকে ১২০ টাকা। তবে এলসি শুঁটকি মাছ দেশি সামুদ্রিক মাছের চেয়ে সব সময় কেজিতে ৫০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত কমে বিক্রি হচ্ছে। শুঁটকি ব্যবসায়ী আনসারুল হক ট্রেডার্সের মালিক রেজাউল করিম বলেন, প্রতিদিন রংপুর বিভাগের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে ব্যবসায়ীরা আড়তে এসে শুঁকটি মাছ কিনে নিয়ে গিয়ে তারা বিক্রি করে থাকেন।
সুনীল দাস বলেন, তিনি দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে শুঁটকি মাছের ব্যবসার সাথে জড়িত আছেন। তিনি বলেন, মৌসুমের সময় তিনি প্রতিদিন ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকার শুঁটকি মাছ বিক্রি করেন। ব্যবসায়ী সুভাষ দাশ বলেন, বর্তমানে শুঁটকি মাছের ভরা মৌসুম হওয়ায় প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকার শুঁটকি মাছ বিক্রি হচ্ছে। তিনি বলেন, ব্যাংকগুলো সহজ শর্তে ঋণ দেওয়ার ব্যবস্থা করলে আড়তে ব্যবসায়ীর সংখ্যার বৃদ্ধির পাশাপাশি ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। বর্তমানে প্রত্যেক ব্যবসায়ীর অধিনে ৩ থেকে ৫ জন শ্রমিক কাজ করছে। তাদের প্রত্যেকের মজুরি ৩০০ টাকা করে।
রাসায়নিক দ্রব্য শুঁটকি মাছে ব্যবহার করা হয়নি না জানতে চাইলে কার্তিক দাস বলেন, এটা আমদানীকারকরাই ভালো বলতে পারবেন। তিনি বলেন, দেশীয় শুঁটকিতে কোন রাসায়নিক দেয়া হয় না।