ভারতে শরণার্থী ক্যাম্পের নিহতদের তালিকা জরুরি

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৪ years ago

Manual7 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট: মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রায় এক কোটি শরণার্থী বাংলাদেশ থেকে প্রতিবেশী দেশ ভারতে আশ্রয় নিয়েছিল। এ-ও জানি, মহামারি ও অপুষ্টিতে ভুগে সেখানে মৃত্যুবরণ করে অসংখ্য শরণার্থী। পাকিস্তানি বাহিনীর আক্রমণে যেমন লাখ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে দেশের ভেতরে, তেমনি দেশের বাইরে শরণার্থীদের এই মৃত্যু অনিবার্যভাবে মুক্তিযুদ্ধেরই পরিণতি। কিন্তু শরণার্থীশিবিরে ঠিক কতজন মৃত্যুবরণ করেছিল, সেই সংখ্যা নির্দিষ্ট করে পাওয়া যায় না কোথাও। মুক্তিযুদ্ধের চিকিৎসা ইতিহাস বিষয়ে গবেষণার অংশ হিসেবে আমরা এ বিষয়টির ওপর আলোকপাত করার চেষ্টা করেছি।

উল্লেখ্য, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় প্রায় দুই কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছিল বিভিন্ন দেশ থেকে। কিন্তু বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ঘটনার মতো কোনো একটি দেশ থেকে এককভাবে এক কোটি লোক বাস্তুচ্যুত হওয়া বা কোনো একটি দেশ এককভাবে এক কোটি শরণার্থীদের আশ্রয় দেওয়ার ঘটনা কখনো ঘটেনি।

Manual3 Ad Code

১৯৭১–এর এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শরণার্থীর স্রোত বাড়তে শুরু করলে ভারতীয় সংবাদপত্রে মাসওয়ারি ও রাজ্যওয়ারি শরণার্থীর হিসাব প্রচার করে ভারত সরকার এবং জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা। একাত্তরের ডিসেম্বরের প্রথম ভাগে তৈরি সারণিতে (সারণি–১) দেখা যায়, সে সংখ্যা প্রায় কোটির কাছে পৌঁছেছে।

পশ্চিমবঙ্গ ও ত্রিপুরায় সর্বাধিক শরণার্থী আশ্রয় নিলেও এই সারণি থেকে রাজ্যওয়ারি শরণার্থী পরিস্থিতির পুরোটা বোঝা যায় না। যেমন ধরা যাক, ১৯৭১ সালে মেঘালয় রাজ্যের জনসংখ্যা ছিল মাত্র ১০ লাখ কিন্তু সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল প্রায় ৭ লাখ বাংলাদেশি শরণার্থী। রাজ্যের ছোট্ট একটি শহর বালাট। বালাটের জনসংখ্যা ছিল মাত্র ৪ হাজার, কিন্তু সেখানে আশ্রয় নিয়েছিল প্রায় ৫০ হাজার শরণার্থী। পশ্চিমবঙ্গের জনসংখ্যা ছিল ৪ কোটি ৪০ লাখ। আর বাংলাদেশি শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল ৭২ লাখ ৩৫ হাজার। অন্যদিকে পশ্চিম দিনাজপুর জেলার পাহাড়ি এলাকার জনসংখ্যা ছিল ৬১ হাজার; আর সেখানে শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছিল ২ লাখ ১১ হাজার। বিভিন্ন শহরে বিদ্যমান জনসংখ্যার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি শরণার্থীর আসার কারণে সেখানকার বাজারঘাট থেকে শুরু করে সুপেয় পানি এবং যত্রতত্র মলমূত্রের চাপ, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, খাদ্যাভাব—সব মিলিয়ে এসব অঞ্চলে এক অসহনীয় পরিস্থিতি তৈরি হয়। পরিবেশের ভারসাম্যে ব্যাপক বিরূপ পরিবর্তনের ফলে সংক্রামক রোগব্যাধির দ্রুত বিস্তার ঘটে।

Manual1 Ad Code

যেকোনো দুর্যোগে এবং ব্যাপক সংখ্যায় বাস্তুচ্যুতির ক্ষেত্রে সংক্রামক রোগব্যাধির নিয়ন্ত্রণে প্রথমেই স্যানিটেশন, হাইজিন এবং সুপেয় পানির সরবরাহের প্রতি বিশেষ নজর দেওয়া হয়। কিন্তু সে সময়কার ভারতের এই রাজ্যগুলোতে স্যানিটেশনের বিশেষ প্রচলন ছিল না। কলকাতা শহরের উপকণ্ঠে যেসব জায়গায় শরণার্থীশিবির স্থাপন করা হয়, তার বেশির ভাগই ছিল বিরান নিম্ন জলাভূমি। সেগুলোকে তখন মাটি ভরাট করে মাত্র বসবাসের উপযোগী করে তোলার চেষ্টা করা হচ্ছিল, যা পরবর্তীকালে অভিজাত সল্টলেক এলাকা হিসেবে পরিচিত হয়। আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থার কর্মীরা সেখানে ল্যাট্রিন বানানোর চেষ্টা করতে গিয়ে বিপদে পড়েন। নিম্ন জলাভূমিতে ল্যাট্রিন তৈরি করা প্রযুক্তিগত দিক থেকে অত্যন্ত কঠিন। কারণ মাটি খুঁড়লেই সেখানে জমে ওঠে পানি। ফলে একেকটি শিবিরে দুই থেকে তিন লাখ করে শরণার্থী পায়খানা করার জন্য বেছে নেয় জলাধারের কাছাকাছি নিম্নাঞ্চল। এসব জলাধার ছিল একসঙ্গে স্নানাহার, মলত্যাগ, শৌচকাজ এবং খাওয়ার পানির উৎস। মে মাসের দিকে বৃষ্টি শুরু হলে বৃষ্টিতে সয়লাব হয়ে যাওয়া শরণার্থীশিবিরের পানি–কাদার সঙ্গে শরণার্থীদের মলমূত্র মিলে এক ভয়ংকর অস্বাস্থ্যকর পরিবেশের জন্ম হয়।
কলেরার টিকা এবং স্যালাইনের মজুত শেষের দিকে এলে জুন মাসের ৩ তারিখে পশ্চিমবঙ্গের স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক রেডক্রসের কাছে কলেরা মহামারি মোকাবিলার জন্য জরুরি সাহায্যের আবেদন করেন।

Manual8 Ad Code

এ আহ্বানের পরের দিনই, অর্থাৎ জুন মাসের ৪ তারিখেই ইউনিসেফ এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা যৌথভাবে কোপেনহেগেন থেকে আড়াই টন চিকিৎসা সামগ্রী, ৩০ টন যন্ত্রপাতি এবং ওষুধ পাঠায়। পাশাপাশি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার জেনেভা সদর দপ্তর থেকে ২৫ লাখ ডোজ টিকা এবং ২ লাখ লিটার কলেরার স্যালাইন ৫ জুন সকালে এসে পৌঁছায়। প্যারিসের পাস্তুর ইনস্টিটিউটও বিনামূল্যে টিকা সরবরাহ করে। কানাডা, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও সুইজারল্যান্ড কলেরা মহামারি নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় ৩৩০ টন সামগ্রী প্লেনে করে পাঠায়। এ ছাড়া অক্সফাম এক লাখ কলেরার টিকা এবং বিপুল পরিমাণ কলেরা আইভি স্যালাইন জরুরি ভিত্তিতে সরবরাহ করে।

Manual7 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code