

বাংলাদেশ পৃথিবীর মধ্যে অন্যতম একটি দেশ যার আছে স্বাধীনতা অর্জনের সুদীর্ঘ ইতিহাস। আর সে ইতিহাসের সাথে মিশে আছে ভাষার জন্য দেশের মানুষের জীবনদানের ঘটনা। ১৯৫২ সালে ঢাকার রাজপথ রক্তাক্ত হয়েছিল কেবল মায়ের ভাষা বাংলায় কথা বলার স্বাধীনতার জন্য। ১৯৫২ থেকে ২০২৩ সাল, ভাষা আন্দোলন থেকে ‘শহিদ দিবস’, তারপর আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মর্যাদা অর্জন। বাংলা ভাষার সঙ্গে বাংলাদেশের মর্যাদাকে নতুন করে সমুন্নত করেছে এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতি।
ফেব্রুয়ারি মাস এলেই আমাদের হৃদয়ে মাতৃভাষার জন্য দরদ যেন জোয়ারেরমত আসে এবং নতুন করে দেশপ্রেমের ভাব জেগে ওঠে। ২১ফেব্রুয়ারী স্মরণ করিয়ে দেয় আমাদের গৌরবোজ্জ্বল আত্মত্যাগ ও সংগ্রামের কথা। ভাষার টানে আমরা প্রভাতে শহীদ মিনারে যাই, ফুল দেই আর মুখে থাকে অমর একুশের ‘আমার ভাইয়ের……..’ গানটি। এই শোকহত দিনটিতে বুকে রক্ত ক্ষরণ হয় আর মনে থাকে অনেক প্রশ্ন। প্রতি বছর ২১ফেব্রুয়ারী আমাদের এক নির্মম সত্যের মুখোমুখি করে। বুকের তাজা রক্ত দিয়ে মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষায় যে দৃঢ়প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়েছিল, তার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হয়েছে কি?
১৯৫২ সালে মাতৃভাষা বাংলার প্রতি আমাদের যে গভীর মমত্ববোধ আর ভালোবাসা ছিল, কালের পরিক্রমায় তা যেন নিচক আনুষ্ঠানিকতায় রুপ নিয়েছে, অনেকের কাছে। আজ আমরা ভাষা দিবসে বর্ণমালার জামা পড়ি, ফুল দেয়ার সাথে সাথে ‘সেলফি’ আর ‘ফটোসেশনে’ আমাদের ব্যস্থতা চোখে পড়ে। সামাজিক মাধ্যমগুলো হয়ে যায় আমাদের সকল প্রেম প্রকাশের মাধ্যম। যেন প্রতিযোগিতা চলে প্রমাণ করার, কে কার চেয়ে কতটা ভাষা-প্রেমি। দুর্ভাগ্য যে, সামাজিক মাধ্যমে যারা বিভিন্ন অনুভূতি প্রকাশ করেন, সেখানে থাকে ইংরেজির মিশ্রণ বা ভুল বাংলা বানানের ব্যবহার।
শহীদ মিনারে আসা কিশোর-তরুণ-তরুণীর অনেকেই হয়ত সঠিক ইতিহাস জানে না। এখন অনেকের কাছে ইতিহাস জানার চেয়ে আনুষ্ঠানিকতাই মূখ্য। মনে পড়ে বিদ্যালয় জীবনের কথা। এ দিবসের জন্য আমাদের কত রকম প্রস্তুতি থাকত। রাত জেগে শহীদ মিনার তৈরী করা, আলপনা আঁকা, ভোর বেলায় শীতের মধ্যে বিদ্যালয়ে হাজির হওয়া। খুব সকালে খালি পায়ে প্রভাত ফেরি, শহীদ মিনারে ফুল দেয়া এবং দিনভর থাকত আলোচনা সভা। সে আলোচনা শুনে আমাদের হৃদয়ে যে আবেগ তৈরী হত, তা কি বর্তমানের শিক্ষার্থীরা অনুভব করতে পারে? বছর কয়েক আগে একটি বিদ্যালয়ে ভাষা দিবসে গান বাজাতে গিয়ে এক শিক্ষার্থী মোবাইল থেকে হিন্দি গান বাজানো শুরু করেছিল। এ থেকে বুঝা যায় তাদের অনেকের কাছে এ দিবস কেবল একটি দিন মাত্র। এভাবে চললে একসময় ইতিহাস জানা প্রজন্ম হারিয়ে যেতে পারে। এক্ষেত্রে তাদের উদাসীনতার চেয়ে আমাদের ব্যর্থ্তাই বেশী বলা যায়।
মাতৃভাষা দিবসসহ অন্যান্য দিবসকে অনেকেই কেবল একটি দিবস হিসেবে নিচ্ছেন বলে ইতিহাসের দিকে তাদের আগ্রহ কম। পাঠ্য বইয়ে আমাদের ইতিহাস নিয়ে অধ্যায় থাকলেও তা অনেকটা পরীক্ষা পাশের জন্য অধ্যয়ন হচ্ছে, ইতিহাস জানার জন্য নয়। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, ইতিহাস নিয়ে উদাসীনতা চোখে পড়ারমত। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ ইতিহাস অধ্যয়ন করে গাইড বই থেকে, চাকুরী পাওয়ার জন্য। তাই তাদের মধ্যে সে আবেগ তৈরী হয়না, যে আবেগের উপর ভিত্তি করে হয়েছিল ২১ফেব্রুয়ারী।
এটা দেখতে খুব ভাল লাগে যে অনেক বাবা-মা কোলে-কাঁধে করে নিজের শিশু সন্তানটিকে নিয়ে যান শহীদ মিনারে। গণমাধ্যমেও বিষয়টি ফলাও করে প্রচার করা হয়। কিন্তু একবারও ভাবা হয়না, ঐ শিশুটিকে বাবা-মা’রা বাংলা শিখাচ্ছেন কি-না। তাদের অনেকে শিক্ষা জীবন শুরু করে ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়ে। ইংরেজি শিখা জরুরী, কিন্তু নিজের মাতৃভাষা না জেনে তা গ্রহণযোগ্য নয়। ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া অনেক শিক্ষার্থী বাংলা পড়তেই পাড়ে না। অথচ তাদের একাংশ হয়ত একদিন দেশের সেবায় আসবে। তখন তাদের দিয়ে ২১শের আবেগ তৈরী হওয়া সম্ভব কি? তাই কবিগুরু যথার্থই বলেছিলেন, “ইংরেজি আমাদের পক্ষে কাজের ভাষা, ভাবের ভাষা নহে”। কিন্তু আমরা কাজের ভাষার জন্য যত আগ্রহী, ভাবের ভাষার জন্য ততটা নই।
দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে শিক্ষা, কর্মস্থল, ব্যবসাসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই বাংলার চেয়ে ইংরেজি ভাষাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকি। বিশ্ববিদ্যালয় ও ভাষা ইনিস্টিটিউটে অনেকেই বিদেশি ভাষা শিখেন কিন্তু নিজের মাতৃভাষাকে শুদ্ধভাবে শিখার চেষ্টা ক’জন করেন। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও একই চিত্র, বাংলা ভাষা ও বিষয় অন্যান্য বিষয়ের তুলনায় কম গুরুত্ব পায়। শিক্ষার্থীরা অনেক বিষয়ে কোচিং বা প্রাইভেট পড়লেও বাংলা বিষয়ে নয়। মাতৃভাষা বলে আমরা হয়ত বাংলা বিষয়ে উদাসীন থাকি। এ উদাসীনতা আমাদের দৈন্যতা, মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ বলা যায়। এভাবে ছোট কাল থেকেই আমরা নিজের ভাষার প্রতি অবহেলা করতে শিখি, যা পরবর্তী জীবনেও অব্যাহত থাকে।
ভাষার বিবর্তন হবে এটা স্বাভাবিক। ভাষা এক বহতা নদীর মতো, এতে বিভিন্ন ভাষার শব্দের সম্মিলন ঘটবে, তাতে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যা হচ্ছে মাতৃভাষা বাংলাকে ‘বাংলিশ’, ‘বাংরেজি’ বানিয়ে ফেলায়। তথ্যপ্রযুক্তির অবাধ প্রবাহ আর বিশ্বায়নের উন্মুক্ত স্রোতধারায় কোনটি গ্রহণ করব আর কোনটি বর্জন করব, তা আমাদের ভাষা, শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিবেচনায় ঠিক করতে হবে। নতুন কিছু শিখতে গিয়ে, নতুন কিছু গ্রহণ করতে গিয়ে নিজেদের অস্তিত্বকে শঙ্কার মধ্যে ঠেলে দিলে তা সময়ের স্রোতে আমাদের ভিন্ন ভাষা ও সংস্কৃতির বলয়ে নিয়ে যাবে।
ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ বলেছিলেন, “মাতা, মাতৃভূমি ও মাতৃভাষার প্রতি যারা অনুরাগহীন, তারা পশু বিশেষ। বিদেশী ভাষার মাধ্যমে শিক্ষায় তোতা পাখির মতো মুখস্থ শক্তি যেমন বাড়ে, সে পরিমাণে মস্তিষ্কের শক্তি বাড়ে না।” কিন্তু আমরা অনেকটা বিপরীত দিকেই যাচ্ছি। আমাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে দাপ্তরিক কাজ, সব ক্ষেত্রেই বাংলার সমান্তরালে ইংরেজি ভাষার প্রতি দুর্বলতা চোখে পড়ারমত। বরং অনেক ক্ষেত্রে বিদেশি ভাষার ব্যবহার বেশী। ফলে কোন ভাষাই শুদ্ধভাবে শিখা হচ্ছে না। এর জন্য আমাদের নীতি-নির্ধারকদের দায়ও কম নয়। স্বাধীনতার এত বছর পরও আমরা আমাদের সরকারি-বেসরকারি কাজে বাংলার ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারিনি। বিশেষকরে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইংরেজির ব্যবহার অনেক বেশী। ব্যাংকে গেলে দেখা যায়, প্রায় সব কিছুই ইংরেজিতে, মানুষ তা বুঝুক বা নাই বুঝুক। একই অবস্থা আমাদের পুলিশ, আদালত ও অন্যান্য ক্ষেত্রে। আমরা কি সুদীর্ঘ ৫০ বছরে তা পরিবর্তন করতে পারতাম না?
ভুল বানান, উচ্চারণ ও ইংরেজি ঢঙে বাংলা লেখা ও বলাটা এখন নতুন প্রজন্মের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। বেসরকারি বেতার, বিজ্ঞাপণ, ও আরো কিছু মাধ্যম ইংরেজি-বাংলা মেশানো উদ্ভট উচ্চারণ আমাদের নতুন প্রজন্মকে প্রভাবিত করছে। আমরা ‘সুপ্রভাত’, ‘শুভ সকাল’, ইত্যাদি শব্দ বলার চেয়ে বিদেশি ভাষায় সম্ভাষণ করতেই বেশী সম্মানবোধ করি। ইংরেজি বলতে সমস্যা নেই কিন্তু সেটা স্থান, কালভেদে সঠিকভাবে প্রয়োগ করা নিয়ে আমাদের যত অনীহা। আমরা ‘চাচা’ বলতে হয়ত লজ্জা পাই, কিন্তু অনায়াসে ‘আঙ্কেল’ বলতে গর্ববোধ করি। বাচ্চাদেরও একইভাবে আমরা ছোট কাল থেকেই অভ্যস্থ করছি। তাই তাদের অনুভতিও সেভাবে তৈরী হচ্ছে। এ বিষয়গুলো চিন্তা করেই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী সবাইকে, বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে বাংলা শব্দের বানান ও উচ্চারণ সম্পর্কে আরও সতর্ক হওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন বহুদিন আগেই।
প্রমথ চৌধুরী বলেছিলেন. ”ভাষা মানুষের মুখ হতে কলমের মুখে আসে, কলমের মুখ হতে মানুষের মুখে নয়। উল্টোটা চেষ্টা করতে গেলে মুখে শুধু কালি পড়ে।” আজ বিপরীতমূখী প্রবণতা প্রবলভাবে লক্ষ করা যাচ্ছে। এর অন্যতম কারন হচ্ছে আমাদের ঔপনিবেশিক মানসিকতা। আমরা ভাষার জন্য প্রাণ দিলেও সে আবেগ ধরে রাখতে পারিনি। আমাদের নীতি-নির্ধারকরাও ভাষার ব্যবহার ও প্রয়োগের জন্য উপযুক্ত নীতি প্রণয়ন না করায় আজ এ দশা।
ভাষা দিবসসহ অন্যান্য দিবস এখন কিছু আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যাচ্ছে। ভাষার জন্য জীবন দেয়া একমাত্র জাতি আমরা, অথচ আমাদের নতুন প্রজন্ম সে অনুভূতি ধারন ও লালন করতে পারছে না। বাংলা ভাষা যে আমাদের প্রাণস্পন্দন, আমাদের স্বাধীনতা ও স্বকীয়তার উৎসমূল, তা যেন আমরা ভুলতে বসেছি বা অবহেলায় যেনতেনভাবে সময় পার করছি। বাস্তবতা হলো, এ ব্যাপারে কোনো সুদূরপ্রসারী কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হয়নি, যে কারণে সর্বস্তরে বাংলা ভাষা চালুর বিষয়টি এখনো পুরোপুরি সম্ভব হয়ে ওঠেনি। উদ্যোগ নেয়া হয়নি বলা যাবে না, কিন্তু তা সময়ের দাবী অনুযায়ী যথেষ্ট নয় বলেই আজ এমন অবস্থা।
বাংলা বানান আর বাংলা ভাষার উৎকর্ষ সাধন এবং পেশাগত জীবনে এর ব্যাপক প্রচলনে সবার সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। উদ্যোগটা নিতে হবে সরকারকেই। বাংলা একাডেমি বাংলা ভাষাবিদ বা গবেষকদের নিয়ে একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা করতে পারে। মাতৃভাষার প্রতি আমাদের দরদ যেন একটি মাস বা দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। সারা বছর যেন গভীর মমত্ববোধ দিয়ে বাংলাকে ভালোবাসি এবং বাংলার চর্চা করি। কেবল তাহলেই প্রাণের বাংলা ভাষা নিজস্ব স্বকীয়তায় এগিয়ে যাবে এবং ভাষা শহিদদের আত্মত্যাগ সার্থক হবে।
আবুল কাশেম উজ্জ্বল
শিক্ষক
সমাজকর্ম বিভাগ
শাবিপ্রবি, সিলেট.