

একাত্তরের বিদেশি সাংবাদিক
ডেস্ক নিউজ: যুক্তরাজ্য মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের বন্ধুর ভূমিকা পালন করে। তাছাড়া ভারত, নেপাল, রাশিয়া মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের পাশে দাঁড়িয়েছিল। ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সদস্যরা জোরালোভাবে বাঙালির স্বাধীনতার লড়াইকে সমর্থন জানান। শরণার্থীদের জন্য অর্থ ও ত্রাণসহায়তা দেয়। একাত্তরের গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাক্রম সম্পর্কে বিশ্ববাসীকে জানাতে যুক্তরাজ্যের গণমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। প্রবাসী বাঙালিদের বড় একটি অংশ যুক্তরাজ্যে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে।
১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পূর্ব বাংলায় সংঘটিত ঘটনার পর ব্রিটেন সরকার, গণমাধ্যম ও সে দেশের জনগণ চুপচাপ ছিল না। পাকিস্তান কমনওয়েলথভুক্ত দেশ হওয়ায় এ ঘটনায় ব্রিটেন সরকার আরও উৎকণ্ঠা দেখায়।
২৫ মার্চ রাতে তৎকালীন পূর্ব বাংলায় সংঘটিত গণহত্যার কয়েক দিনের মধ্যেই হাউস অব কমন্স সভায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়। ২৯ মার্চ হাউস অব কমন্স সভায় ব্রিটিশ পররাষ্ট্র ও কমনওয়েলথ-বিষয়ক সচিব স্যার অ্যালেস ডগলাস হিউম পূর্ব বাংলায় বাঙালিদের ওপর হত্যাযজ্ঞ চালানোয় দুঃখ প্রকাশ করেন এবং পাকিস্তানকে তাদের সামরিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করার আহ্বান জানান। ডগলাস হিউম আলোচনাটি উত্থাপন করেন এভাবে, ‘আমি আশা করব, কমনওয়েলথের একটি সদস্যদেশ পাকিস্তানে প্রাণহানিতে পুরো হাউসই আমার সঙ্গে শোক প্রকাশে যোগ দেবে’ (সূত্র: হাউস অব কমন্স সভার কার্যবিবরণী, ২৯ মার্চ ১৯৭১)। এ ছাড়া ওই দিন হাউস অব কমন্স সভার আলোচনায় তিনি পূর্ব বাংলায় বসবাসকারী ব্রিটিশ নাগরিকদের নিরাপত্তার কথাও উত্থাপন করেছিলেন। ২৫ মার্চ রাতে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী আক্রমণ চালিয়েছিল, তখন বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত ব্রিটিশ কাউন্সিলও হামলার শিকার হয়। তবে হতাহতের কোনো ঘটনা ঘটেনি। সেদিন পুরো হাউসই ডগলাস হিউমের সঙ্গে শোক প্রকাশ করেছিল। এ ছাড়া হাউস অব কমন্স সভায় এপ্রিল, মে, জুন, সেপ্টেম্বর, নভেম্বর ও ডিসেম্বর মাসজুড়ে পূর্ব বাংলায় সংঘটিত এবং চলমান ঘটনা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। হয় তর্ক-বিতর্ক।
৫ এপ্রিল ১৯৭১ হাউস অব কমন্স সভার আলোচনায় ডগলাস হিউম ও অন্য সদস্যরা পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক শক্তি প্রয়োগের তীব্র সমালোচনা করেন। হাউস অব কমন্স সভার সদস্যরা পাকিস্তানের ঘটনাকে তাদের অভ্যন্তরীণ ঘটনা বলে আখ্যায়িত করলেও এবং পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ঘটনায় যুক্ত না হওয়ার কথা বললেও পাকিস্তান সরকারকে উদ্ভূত পরিস্থিতি মীমাংসায় রাজনৈতিক সমঝোতাকে বেছে নিতে অনুরোধ করে। ৫ এপ্রিল হাউস অব কমন্স সভায় ডগলাস হিউম বলেন, ‘[পূর্ব পাকিস্তানে] কী ঘটেছে, সে সম্পর্কে আমাদের কাছে সম্পূর্ণ তথ্য না থাকলেও এটা সন্দেহাতীত যে সেখানে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। আমি আশা করছি, এই সংঘাত বন্ধ করতে, পুরো হাউস ও দেশই আমার সঙ্গে পাকিস্তান সরকারকে আহ্বান জানাবে’ (সূত্র: হাউস অব কমন্স সভার কার্যবিবরণী, ৫ এপ্রিল ১৯৭১)।
পূর্ব বাংলায় সংঘটিত হত্যাযজ্ঞ ও মানবেতর অবস্থার সংবাদ পেয়ে ব্রিটিশ কিছু এমপি তাঁদের নিজেদের উদ্যোগে পশ্চিম বাংলায় শরণার্থী শিবির ও পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাদেশ সরকারনিয়ন্ত্রিত এলাকায় ভ্রমণ করেছিলেন। ভ্রমণকারী এমপিদের একজন, ব্রুস ডগলাস, ১৯৭১ সালের ১৪ মে হাউস অব কমন্স সভার একটি আলোচনায় তাঁর অভিজ্ঞতা বিনিময় করেছিলেন। ব্রুস ডগলাস তাঁর বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘[পূর্ব বাংলায়] কী ঘটছে এবং কেন ঘটেছে, তা সবাই কমবেশি ভালো জানেন। পাকিস্তান সরকারের তথ্য অনুযায়ী নিহত হওয়া মানুষের সংখ্য ১৫,০০০ কিন্তু স্বাধীন হিসাব অনুসারে নিহত হওয়া মানুষের সংখ্যা সর্বনিম্ন হলেও ১,০০,০০০। অনেকে ধারণা করেন, নিহত মানুষের সংখ্যা এক মিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। মৃতের সংখ্যা যা-ই হোক না কেন, দেশের [পূর্ব বাংলার] দুই মিলিয়ন মানুষ মনে করছে তাদের দেশে যে অবস্থা বিরাজ করছে তা খুবই আতঙ্কজনক। এ কারণেই তারা দেশ ছেড়ে ভারতে শরণার্থী শিবিরে মানবেতর অবস্থায় জীবনযাপন করছে’ (সূত্র: হাউস অব কমন্স সভার কার্যবিবরণী, ১৪ মে ১৯৭১)। এরপর হাউস অব কমন্স সভার সদস্যদের কাছে ডগলাস হিউম পশ্চিম বাংলায় শরণার্থী শিবিরের দুর্দশার কথা আরও বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
বাংলাদেশের প্রতি সহমর্মী ও সমব্যথী ব্রিটিশ পার্লামেন্টের এমপিদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছিলেন রাসেল জন স্টোনহাউস। হাউস অব কমন্স সভার বিভিন্ন বৈঠকে তিনি বাংলাদেশের পক্ষে জোরালো বক্তব্য তুলে ধরেছিলেন। হাউস অব কমন্স সভায় তিনি তার বক্তব্যে বলেন, ‘আমার মনে হয়, ভবিষ্যতে বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করবেই। স্বাধীনতা লাভ করতে তাদের অনেক মাস লাগতে পারে অথবা কয়েক বছর লাগতে পারে, কিন্তু আমার কাছে এটা অসম্ভব মনে হয় যে এক হাজার মাইল দূরের ৭৫ মিলিয়ন মানুষের একটি দেশে পাকিস্তান শাসন ধরে রাখতে পারবে, বিশেষ করে সেখানকার মানুষ যখন তা চাইছে না। পরিস্থিতি এমন যে বাঙালিরা স্বাধীনতা লাভ করবেই। আমি মনে করি, বাংলাদেশের জন্ম হবেই এবং বাংলাদেশের জন্ম হবে মানুষের স্বার্থে এবং বিশ্ব শান্তির স্বার্থে। তাই আমি মনে করি, বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার এ লড়াইয়ে তাদের আমাদের সমর্থন দিতে হবে’ (সূত্র: হাউস অব কমন্স সভার কার্যবিবরণী, ১৪ মে ১৯৭১)। এ ছাড়া ব্যক্তিগতভাবেও স্টোনহাউস বিভিন্ন সময়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে বিবৃতি দিয়েছিলেন। পূর্ব বাংলায় পাকিস্তান সামরিক বাহিনী কর্তৃক পরিচালিত অপারেশন সার্চ লাইটের কয়েক দিন পর, ৩১ মার্চ স্টোনহাউস তার বিবৃতিতে নিরস্ত্র বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানিদের হামলাকে বর্বরোচিত বলে আখ্যায়িত করেন। স্টোনহাউস তাঁর বিবৃতিতে বলেন, পাকিস্তানে সংঘটিত নিষ্ঠুরতা ও বর্বরতাকে পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ ব্যাপার বলে ব্রিটেন যদি এ ব্যপারে কোনো পদক্ষেপ না নেয়, তাহলে তা হবে ভুল। স্টোনহাউসের এ বক্তব্য এবং কর্মকাণ্ড ব্রিটেনে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন তৈরিতে বড় ভূমিকা রেখেছিল।
ব্রিটিশ সরকার মুক্তিযুদ্ধের সময় শরণার্থী শিবিরে দুর্গত বাঙালিদের ত্রাণ দিয়ে সহায়তা করেছিল। ১৯৭১ সালের ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত শরণার্থীদের জন্য ব্রিটিশ সরকারের সহায়তার পরিমাণ ছিল এক কোটি ৪৭ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড। এ ছাড়া পূর্ব পাকিস্তানেও ব্রিটিশ সরকার দুই মিলিয়ন পাউন্ড অর্থের ত্রাণ সহযোগিতা পাঠিয়েছিল।