

ধর্ম ডেস্ক
পবিত্র আল কুরআনুর মাজীদে মুনাফিকদের চরিত্র, আচরণ ও অভ্যাস সম্পর্কে বহু স্থানে বলা হয়েছে। বিশেষ করে সুরা আল-বাকারাহ, সুরা আন-নিসা এবং সুরা আত-তাওবায় মুনাফিকদের গুণাবলী, কাজ সম্পর্কে বলা রয়েছে আলহামদুলিল্লাহ। নিচে পবিত্র আল কুরআনুর কারীমের আলোকে মুনাফিকদের কিছু প্রধান বৈশিষ্ট্য:
মিথ্যাবাদী হওয়া:
“মানুষের মধ্যে কিছু লোক বলে, ‘আমরা আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান এনেছি’, অথচ তারা মুমিন নয়। তারা আল্লাহকে ও ঈমানদারদের ধোঁকা দিতে চায়, অথচ তারা নিজেদেরই ধোঁকা দিচ্ছে, তা তারা উপলব্ধি করে না।”
(সুরা আল-বাকারা: ৮-৯)
মুখে এক কথা, মনে আরেক কথা:
“তারা মুখে যা বলে তা তাদের অন্তরে নেই।”
(সুরা আল-মুনাফিকুন: ১)
নামাজে অলসতা:
“নামাজে তারা অলসতার সাথে দাঁড়ায় এবং লোকদের দেখানোর জন্য কাজ করে। তারা আল্লাহকে খুব কমই স্মরণ করে।”
(সুরা আন-নিসা: ১৪২)
সততার অভাব ও চুক্তি ভঙ্গ করা:
“তারা প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে এবং আল্লাহর পথে বাধা সৃষ্টি করে।”
(সুরা আল-তাওবা: ৭৭)
অসৎ কাজের প্রচার ও সৎ কাজে বাধা:
“তারা মন্দ কাজের আদেশ দেয় এবং ভালো কাজ থেকে নিষেধ করে।”
(সুরা আত-তাওবা: ৬৭)
ভীরুতা ও দ্বিমুখী আচরণ:
“তারা দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থায় থাকে, কখনও মুমিনদের সাথে, আবার কখনও কাফিরদের সাথে।”
(সুরা আন-নিসা: ১৪৩)
আল্লাহর নির্দেশনা নিয়ে ঠাট্টা করা:
“যদি আপনি তাদের জিজ্ঞাসা করেন, তারা বলবে, ‘আমরা তো শুধু মজা ও খেলা করছিলাম।’ বলুন, ‘তোমরা কি আল্লাহ, তাঁর আয়াত এবং তাঁর রাসুল নিয়ে ঠাট্টা করছ?’”
(সুরা আত-তাওবা: ৬৫)
পরস্পর বিভেদ সৃষ্টিকারী
“তারা যখন বলে, ‘তোমরা কি আমাদের মতো নির্বোধদের মতো ঈমান আনবে?’ জেনে রাখ, তারাই নির্বোধ, কিন্তু তারা তা বোঝে না।”
(সুরা আল-বাকারা: ১৩)
দুনিয়ার লোভে অন্ধ হওয়া
“তাদের সম্পদ ও সন্তানসন্ততি তোমাকে মুগ্ধ করুক না। এগুলোর মাধ্যমে আল্লাহ চান তাদের দুনিয়াতে শাস্তি দিতে এবং তাদের প্রাণ এ অবস্থায় বের করে নিতে যে তারা কাফির।”
(সুরা আত-তাওবা: ৫৫)
অহংকার ও আত্মগরিমা প্রদর্শন
“যখন তাদের বলা হয়, ‘তোমরা পৃথিবীতে ফাসাদ সৃষ্টি করো না’, তখন তারা বলে, ‘আমরাই তো সংস্কারক।’ জেনে রাখ, তারাই ফাসাদ সৃষ্টি করে, কিন্তু তারা তা বোঝে না।”
(সুরা আল-বাকারা: ১১-১২)
আল্লাহর ওপর ভরসা না রাখা
“তারা ঈমানদারদের বলে, ‘তোমরা কি তাদের মতো ঈমান আনবে যারা নির্বোধ?’ অথচ তারাই নির্বোধ, কিন্তু তারা তা বোঝে না।”
(সুরা আল-বাকারা: ১৪)
কষ্টের সময়ে পিছু হটা
“যখন বিপদ আসে, তখন তারা বলে, ‘আমরা তো তোমাদের সঙ্গে ছিলাম।’ কিন্তু যখন বিজয় হয়, তখন তারা বলে, ‘আমরা কি তোমাদের সাহায্য করিনি?’”
(সুরা আন-নিসা: ১৪১)
গোপন ষড়যন্ত্র করা
“তারা তোমাদের জন্য বিপদ কামনা করে। যখনই কোনো ভালো কিছু তোমাদের কাছে আসে, তারা তা পছন্দ করে না। আর যখন তোমাদের ক্ষতি হয়, তখন তারা আনন্দিত হয়।”
(সুরা আলে-ইমরান: ১২০)
আল্লাহর পথে ব্যয় করতে অনীহা
“তারা কৃপণ এবং লোকদেরও কৃপণ হতে বলে।”
(সুরা আন-নিসা: ৩৭)
তারা নিজ অবস্থানে স্থির নয়
“তারা ঈমান আর কুফরের মাঝে দোদুল্যমান। তারা না মুমিনদের পক্ষে, না কাফিরদের পক্ষে।”
(সুরা আন-নিসা: ১৪৩)
আল্লাহর আযাব সম্পর্কে অজ্ঞ
“নিশ্চয়ই মুনাফিকরা দোজখের নিম্নতম স্তরে থাকবে, এবং তুমি তাদের কোনো সাহায্যকারী পাবে না।”
(সুরা আন-নিসা: ১৪৫)
কয়েকটি পয়েন্ট:
১) মুনাফিকরা ঈমানদারদের মাঝে সন্দেহ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করার চেষ্টা করে।
২) মুনাফিকরা নিজেদের ভালো বলে প্রচার করে, অথচ তারা সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে।
৩) মুনাফিকরা দুনিয়ার সম্পদ ও ক্ষমতার প্রতি অত্যধিক আসক্ত।
৪) মুনাফিকরা সংকটের সময় পিছু হটে, কিন্তু স্বার্থের সময় নিজেরা সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে।
৫) মুনাফিকরা নিজেদের চতুর মনে করে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে তারা মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা ও তার হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিধানের প্রতি অজ্ঞ।
৬) মুনাফিকরা মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা ও তার হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পথে দান করতে কৃপণতা করে এবং অন্যদেরও এ কাজে বাধা দেয়।
৭) মুনাফিকরা মুসলমানদের ক্ষতির জন্য ষড়যন্ত্র করে এবং তাদের দুঃখে আনন্দিত হয়।
৮) মুনাফিকরা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগে, ফলে তাদের চিন্তা ও অবস্থান পরিষ্কার নয়।
১০) মুনাফিকরা সবসময় ইনিয়ে বিনিয়ে মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা ও তার হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আম্বিয়ায়ে কেরাম, আহলে বাইত, ফেরাস্তাগন, সাহাবিগন, তাবেঈগন, তাবে তাবেঈগন, ইমামগন, ওয়ালি আওলিয়াগন এর শানে গুস্তাখি করে থাকে।
১১) মুনাফিকরা বিভিন্ন সমল আমলি বিষয় এ মুসলমানদের মধ্যে বিভ্রান্ত করে।
১২) মুনাফিকরা মুসলমানদেরকে বিদআত শিরকের নামে বিভিন্ন আমল করা থেকে বাধা দেয়।
মুনাফিকদের চরিত্র আচরণ তাদের মিথ্যাচার, ঈমানহীনতা, কৃপণতা, বিশ্বাসঘাতকতা, আত্মপ্রবঞ্চনা, সমাজে বিভেদ সৃষ্টি, মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা ও তার হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পথে বাধা দেওয়া এবং দুনিয়ার প্রতি অতিরিক্ত আসক্তির মাধ্যমে প্রকাশ পায়। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা ও তার হাবিব সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নির্দেশ অমান্য করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। তারা মুখে ইসলাম প্রদর্শন করলেও তাদের অন্তরে ঈমান নেই। মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়াতাআ’লা তাদের সম্পর্কে ঈমানদারদের সতর্ক থাকতে বলেছেন। পবিত্র আল কুরআনুর কারীম আমাদের মুনাফিকদের আচরণ থেকে সাবধান থাকার শিক্ষা দিয়েছে। মুনাফিকদের সাথে সম্পর্ক রাখার সময় মুসলমানদের সর্বদা সচেতন থাকা উচিত।