

বিশেষ প্রতিবেদন: দেশে প্রথমবারের মতো মেট্রোরেলের যাত্রা শুরু হয়েছে। বুধবার (২৮ ডিসেম্বর) সকালে প্রধানমন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার হাত ধরে যোগাযোগের নতুন পর্বে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। মেট্রোরেলের প্রারম্ভিক এই যাত্রাকে যানবাহন ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন মনে করছেন দেশের বিরোধী দলের রাজনীতিকরাও। তবে তারা অভিযোগ করেছেন, মেট্রোর নির্মাণব্যয় ও ভাড়া নির্ধারণে সাধারণ মানুষের সঙ্গতির বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।
বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মেট্রোরেলের নির্মাণ ব্যয় ও ভাড়া নির্ধারণে প্রতিবেশী ভারতের কলকাতা বা পাকিস্তানের লাহোরের চেয়ে কয়েকগুণ ভাড়া বেশি ঠিক করা হয়েছে। দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান জানিয়েছেন, মেট্রোরেল আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘন করে মেট্রোরেলের ভাড়া সর্বনিম্ন ২০ টাকা এবং উত্তরা থেকে মতিঝিল এই ২০ কিলোমিটারের ভাড়া ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘ঢাকায় মেট্রোরেলের এই ভাড়ার পরিমাণ শুধু দেশের বেসরকারি বাসভাড়ার দ্বিগুণ নয়, ভারত ও পাকিস্তানের বিভিন্ন নগরীর মেট্রোরেলের ভাড়ার চেয়ে দুই থেকে পাঁচগুণ বেশি। ঢাকা মেট্রোরেলের সর্বনিম্ন ভাড়া দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই ও লাহোরের ভাড়ার প্রায় দ্বিগুণ এবং কলকাতার তিনগুণ। ঢাকার ২০ কিলোমিটারের ভাড়া কলকাতার চারগুণ, নয়াদিল্লি, মুম্বাই ও চেন্নাইয়ের তিনগুণ এবং লাহোরের ভাড়ার চেয়ে সাড়ে পাঁচগুণ বেশি।’
বিএনপির নেতারা মেট্রোরেল প্রকল্পের নির্মাণ সময় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। কোনও কোনও নেতার দাবি, নির্মাণে দুর্নীতি করা হয়েছে। পাশাপাশি বিএনপি-জোট সরকারের সময়ে মেট্রোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়, বলেও জানান বিএনপির একাধিক নেতা।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু বলেন, ‘আমাদের সময়ে মেট্রোরেলের পরিকল্পনা করা হয়েছিল। সার্ভে করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল স্বল্প ভাড়ায় মানুষ যেন গন্তব্যে যেতে পারে। কিন্তু আওয়ামী লীগ এসে নির্মাণ ব্যয় এমন একপর্যায়ে নিয়ে গেছে যে দিল্লি মেট্রো থেকেও ব্যয় অন্তত চার-পাঁচগুণ বেড়েছে। এমনকি চীন থেকেও বেশি খরচ পড়েছে ঢাকায়। এরমধ্যে দুর্নীতি আছে। ফলে, মেট্রোরেলের কারণে যে সুফল আসার কথা ছিল তা কিন্তু আসেনি। ভাড়া রাখা হয়েছে কয়েকগুণ বেশি।’
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০০৫ সালে বিএনপি-জোট সরকারের সময়ে পরিকল্পনা নেওয়া হলেও ওই সরকারের আমলেই কোনও অগ্রগতি ছিল না মেট্রোরেল সংক্রান্ত পরিকল্পনায় (কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা)।
গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম নেতা, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকের মূল্যায়ন, ‘এটা তো আমাদের গণপরিবহনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। এতে কোনও সন্দেহ নেই। ভবিষ্যতে ঢাকাসহ আমাদের গুরুত্বপূর্ণ নগরীগুলোতে মেট্রোর ব্যবস্থাপনা লাগবে।’
তবে সাইফুল হকের প্রশ্ন ঢাকার মেট্রোরেলের রুট ও ভাড়া নিয়ে। তিনি উল্লেখ করেন, ‘যে রুট ঠিক করা হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। আর যে ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে তা নিতান্ত সাধারণ মানুষের সক্ষমতার বাইরে। নাগরিকদের মধ্যে খুব স্বল্প সংখ্যক মানুষের জন্য ইতিবাচক হলেও ব্যাপকভাবে কোনও কাজে লাগবে না।’ সাইফুল হকের দাবি, মেট্রোরেল চালু হওয়ায় বিদ্যমান যানজটে কোনও প্রভাব পড়বে না।
গণতন্ত্র মঞ্চের অন্যতম উদ্যোক্তা, গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়কারী জোনায়েদ সাকি বলেন, ‘শহরে মেট্রোরেলের প্রয়োজন আছে। কিন্তু জনগণের অর্থে নির্মিত এই প্রকল্পের স্বচ্ছতা নেই, আর্থিক হিসাবও পরিষ্কার নয়। বিপুল খরচে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। চার বছরের প্রকল্প আট বছরেও শেষ হয়নি।’
মেট্রোরেলের ভাড়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন জোনায়েদ সাকি। তিনি বলেন, ‘ভাড়া অত্যধিক বেশি। সাধারণ মানুষের ব্যয়ক্ষমতার আওতায় মেট্রোরেলের ভাড়া না রাখা পরিষ্কারভাবে সমস্যায় জর্জরিত।’