

নাছির উদ্দিন, মীরসরাই :
বাড়ি-ঘর, অফিস কিংবা অন্যান্য স্থাপনার নিত্য দিনের অন্যতম সঙ্গী পাহাড়ী ঝাড়–ফুল। যা ব্যবহার করে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন রাখা হয় ঘরদোর। আর সে ঝাড়ু ফুল বিক্রির জন্য বাজারের বিভিন্ন অলি গলিতে সারি সারি দাঁড়িয়ে আছে বিক্রেতারা। চট্টগ্রামের পাহাড়ী এলাকার বসবাসকারী অনেক পাহাড়ি-বাঙালিরা জীবিকা নির্বাহ করছে তা দিয়ে। মৌসুমী এই পাহাড়ী ফুলে ভাগ্য পরিবর্তন হচ্ছে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর। চট্টগ্রামের মীরসরাই, সীতাকুন্ড, সাতকানিয়া, লোহাগাড়া, চন্দনাইশ, দোহাজারী, আনোয়ারা, কর্ণফুলী ও বাঁশখালীসহ বিভিন্ন উপজেলার হাট-বাজারে এসব ঝাড়–ফুল বিক্রি হচ্ছে।
পার্বত্য বনাঞ্চলের উঁচু-নিচু পাহাড়ে প্রাকৃতিকভাবে প্রতি বছর প্রচুর পরিমাণে ঝাড়–ফুল (স্থানীয়দের ভাষায় উলু ফুল নামে পরিচিত) জন্মায়। দেশের অভ্যন্তরের সমতলে এই ঝাড়– ফুলের প্রচুর চাহিদা থাকায় পাইকারি ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর ফুল কিনে নিয়ে যায়। স্থানীয় পাহাড়ি-বাঙালি ছেলে মেয়েরা পাহাড় থেকে এই ফুল সংগ্রহ করে স্থানীয় বাজারের পাইকারদের কাছে বিক্রি করে। পার্বত্যঞ্চলে বসবাসরত হত-দরিদ্র পাহাড়ি-বাঙালি পরিবারগুলো পাহাড় থেকে এই উলুফুল সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করে থাকে।
এদিকে এই পাহাড়ী ঝাড়–ফুল স্থানীয়দের চাহিদা মিটিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। বাণিজ্যিকভাবে চাষাবাদ না হলেও পাহাড়ের জঙ্গলে প্রাকৃতিকভাবেই জন্ম নেয় এই ঝাড়–ফুল। এগুলোর রয়েছে বাণিজ্যিক সম্ভাবনা। সমতলে এই ঝাড়–ফুলের ব্যাপক চাহিদা থাকায় ব্যবসায়ীরা লাভের মুখ দেখছেন। বিশেষ করে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা ১৮-২০টি ঝাড়–ফুল দিয়ে একটি আঁটি বাঁধেন । আর এক আঁটি ঝাড়– ১০/১৫ টাকা ক্রয় করে ব্যবসায়ীরা। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা স্থানীয় ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে প্রতি আঁটি ২০/২৫ টাকা ধরে ক্রয় করে সমতলে বিভিন্ন জেলায় নিয়ে যায়।
গুণগত মানভেদে কাটা হয় ও আঁটি হিসেবে এসব ঝাড়–ফুল বিক্রি করা হয়। তবে এগুলো কাটা এখন আর আগের মতো সহজলভ্য নয়। কয়েক বছর আগেও পাহাড়ি এলাকায় রাস্তার ধারে ফুল পাওয়া যেত। এখন অনেক ঝুঁকি নিয়ে দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে ঝাড়–ফুল কাটতে হয়। ফলে এখন দামও একটু বেশি। প্রতি বছর ডিসেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারি মাস পর্যন্ত ঝাড়–ফুল সংগ্রহ করা যায়। লোকজন ওই সময়েই সারা বছরের জন্য ঝাড়–ফুল কিনে নেয়। একেক জায়গায় একেক জাতের ফুল বেশি উৎপাদন হয়। তবে বিনি জাতের ফুল সবচেয়ে বেশি উৎপাদিত হয় এবং এর চাহিদাও রয়েছে বেশি। ফলে বিনি জাতের ফুলের চাহিদা ও মূল্য অনেকটা বেশি। সবচেয়ে সুবিধা হলো ঝাড়–ফুল চাষের জন্য আলাদা জায়গার দরকার পড়ে না। অন্যান্য গাছের বাগানেও খুব সহজে এগুলোর আবাদ করা সম্ভব। আর রোপণ করার প্রথম বছর থেকেই কাঠি সংগ্রহ করা যায়। তবে নির্বিচারে বন নিধনের ফলে দিন দিন কমে যাচ্ছে সম্ভাবনাময় ঝাড়–ফুল বাণিজ্য।
মীরসরাইয়ের বারইয়ারহাটে ঝাড়–ফুল বিক্রি করতে আসা কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা বলেন, ‘আমরা বন থেকে ঝাড়– ফুল সংগ্রহ করে প্রথমে ভালোভাবে রোদে শুকিয়ে নিই। পরে তা বাজারের দিনে বিক্রি করতে নিয়ে আসি। এই ফুলগুলো চাষ করতে হয় না, বনে প্রাকৃকিতভাবে হয়ে থাকে।’ তবে বর্তমানে একশ্রেণির প্রভাবশালীদের নির্বিচারে পাহাড় কাটার ফলে ঝাড়–ফুল বিক্রেতারা হতাশ হয়েছেন। এদিকে পরিকল্পিতভাবে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ঝাড়–ফুলের আবাদ করা হলে প্রচুর পরিমাণে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের সম্ভাবনা রয়েছে বলে অনেকেই মনে করছেন।