

সম্পাদকীয়: আজ পূর্ণ হলো ২০১৭ সালে শুরু হওয়া রোহিঙ্গা সংকটের চার বছর। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট এ সংকট চূড়ান্ত আকার ধারণ করলেও ২০১৬ সালের শুরু থেকে মিয়ানমারের সামরিক ও আধা-সামরিক বাহিনীর (নাসাকা) নিপীড়ন থেকে বাঁচতে বিভিন্ন ধাপে সীমান্ত পাড়ি দিয়ে রোহিঙ্গারা কক্সবাজারের টেকনাফে ঢুকতে শুরু করে।
বাংলাদেশ মানবিক কারণে তাদের আশ্রয় দেয়। দেশে এই অনাহূত সমস্যার এটাই প্রথম অভিজ্ঞতা নয়, ১৯৭৮ ও ১৯৯১-৯২ সালে যথাক্রমে ২ লাখ ও ২ লাখ ৬৫ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করে।
এর মধ্যে ১৯৭৮ সালে আগত শরণার্থীরা দুবছরের মধ্যে প্রত্যাবাসিত হয়। কিন্তু ১৯৯১-৯২ সালে আগত শরণার্থীদের অধিকাংশ দুবছরের মধ্যে প্রত্যাবাসিত হলেও নানা জটিলতায় প্রায় ৩০ হাজার শরণার্থী কুতুপালং ও নয়াপাড়া ক্যাম্পে এখনো রয়ে গেছে। উল্লেখ্য, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সে সংখ্যা আজ অনেক বেড়েছে। পুরোনো সেসব শরণার্থীসহ এখন রোহিঙ্গার সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১০ লক্ষাধিক, যারা ৩৪টি ক্যাম্পে অবস্থান করছে।
২০১৭ সালে এ সংকটের শুরুতে স্থানীয় অধিবাসীরা রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়াকে স্বাগত জানালেও এবং তাদের নানাভাবে সহায়তা করলেও স্থানীয় জনসংখ্যার দ্বিগুণেরও বেশি এই রোহিঙ্গারা এখন তাদের গলার কাঁটা হয়ে উঠেছে।
উল্লেখ্য, সেসময় শুধু কক্সবাজারবাসী নন, সারা দেশ থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও সংগঠন এসব অসহায় মানুষের সাহায্যে ছুটে আসেন কক্সবাজারে। এদিকে স্বল্প সময়ের ব্যবধানেই বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন বিষয়ে সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হলেও মিয়ানমার সরকার তা বাস্তবায়নে অদ্যাবধি কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বরং প্রত্যাবাসনের বিষয়টি যেন আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।
বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে ক্রমাগতভাবে বিষয়টি উত্থাপন করছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী ২০১৭ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭২তম অধিবেশনে রোহিঙ্গা বিষয়ে পাঁচটি সুপারিশ রাখেন-১. অবিলম্বে সহিংসতা ও জাতিগত নিধন বন্ধ করা,
২. অবিলম্বে মিয়ানমারে জাতিসংঘ মহাসচিবের একটি অনুসন্ধানী দল প্রেরণ করা, ৩. জাতিধর্মনির্বিশেষে সব নাগরিকের নিরাপত্তা বিধান ও সে লক্ষ্যে মিয়ানমারের অভ্যন্তরে জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে সুরক্ষাবলয় গড়ে তোলা, ৪. জোরপূর্বক বিতাড়িত সব রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে তাদের নিজ ঘরবাড়িতে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করা এবং ৫. কফি আনান কমিশনের সুপারিশমালার পূর্ণাঙ্গ ও দ্রুত বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
২০১৯ সালে জাতিসংঘের ৭৪তম অধিবেশনে তিনি রোহিঙ্গা বিষয়ে আবারও চারটি সুপারিশ রাখেন-১. রোহিঙ্গাদের টেকসই প্রত্যাবাসন ও অন্তর্ভুক্তিকরণে মিয়ানমারকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের রাজনৈতিক সদিচ্ছাপূর্ণ প্রতিফলন দেখাতে হবে,
২. বৈষম্যমূলক আইন ও রীতি বিলোপ করে মিয়ানমার সরকারের প্রতি রোহিঙ্গাদের আস্থা তৈরি করতে হবে এবং রোহিঙ্গা প্রতিনিধিদের রাখাইন সফরের আয়োজন করতে হবে, ৩. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় কর্তৃক নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষক প্রেরণের মাধ্যমে মিয়ানমার কর্তৃক রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষার নিশ্চয়তা প্রদান করতে হবে এবং ৪. আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় অবশ্যই রোহিঙ্গা সমস্যার মূল কারণগুলো বিবেচনায় আনবে এবং মানবাধিকার লঙ্ঘন ও অন্যান্য নৃশংসতার দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করবে। এদিকে বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা কক্সবাজারে অবস্থানের ফলে সেখানে যে আর্থসামাজিক ও পরিবেশগত ক্ষতি হয়েছে এবং হচ্ছে, তা অপূরণীয়। আমার বিবেচনায় প্রথম যে ক্ষতি হয়েছে তা হলো বনভূমি উজাড় করা। কারণ, সংকটের শুরুতে জ্বালানি চাহিদা মেটাতে রোহিঙ্গারা অবাধে গাছ কেটে পাহাড় আর সমতলের বন উজাড় করতে শুরু করে। পরে তাদের রান্নাবান্নার জন্য এলপিজি বিতরণ করা হলেও ততদিনে ১০ হাজার হেক্টরেরও বেশি বন সাবাড় হয়ে যায়।
নতুন করে বনায়নের মাধ্যমে এ ক্ষতি কত দিনে পূরণ হবে, তা বলার সময় এখনো আসেনি। এরপর যে ক্ষতিটা হয়েছে এবং এখনো প্রতিনিয়ত হচ্ছে তা হলো পরিবেশ দূষণ। দুই লক্ষাধিক পরিবারের (১০ লাখ মানুষ) গৃহস্থালি সামগ্রী, ময়লা-আবর্জনা, ব্যবহৃত দূষিত পানি আর এত মানুষের প্রতিদিনকার পয়ঃবর্জ্য সেখানকার পরিবেশ অসহনীয় করে তুলেছে। সরকার ও সাহায্য সংস্থার শত উদ্যোগের পরও এ সমস্যা নিয়ন্ত্রণ করা দুরূহ হয়ে উঠছে।
এলাকার নর্দমা, খালি জায়গা, কৃষিজমি, খালবিল আজ ময়লা-আবর্জনা ও দূষিত পানির ভাগাড় হয়ে আছে। কিন্তু সবচেয়ে যে সমস্যাটি নীরবে বিস্তৃত হয়ে উঠেছে তা হলো ভূগর্ভস্থ পানির উপর অতি নির্ভরতাহেতু অপরিকল্পিভাবে গভীর-অগভীর নলকূপ খনন। ফলে এখনই পানির স্তর ৭০০-৭৫০ ফুট নেমে গেছে। এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে এ সমস্যা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা অচিন্তনীয়।