

ডেস্ক রিপোর্ট : শরিয়তের পরিভাষায় কপাল, নাক, দুই হাত, দুই হাঁটু এবং দুই পায়ের আঙুল মাটিতে ঠেকিয়ে মহান আল্লাহর সামনে চরম আত্মনিবেদন করাকে সেজদা বলে। এটি দুই প্রকার:
সেজদা-এ-ইবাদত
সেজদা-এ-তাজিম (সম্মানসূচক সেজদা)
কদমবুসি ও সালাম: কদমবুসি বা পায়ে চুমু খাওয়া মূলত সম্মানের একটি বহিঃপ্রকাশ। বড়দের হাত বা পায়ে চুমু খাওয়া জায়েজ। সাহাবিরাও রাসুল (সা:) হাত ও পা মোবারকে চুমু খেতেন কদমবুসি করতেন।
সেজদা কেবল একটি শারীরিক ভঙ্গি নয়, বরং একে ‘নফস’ বা অহংকারের রিপুর মৃত্যু । মূল কথা হলো ‘ফানা’ বা নিজেকে আল্লাহর মাঝে বিলীন করা। সেজদা হলো সেই মুহূর্ত যখন বান্দা তার শরীরের সর্বোচ্চ অঙ্গ (মাথা) সর্বনিম্ন স্থানে (মাটি) নামিয়ে আনে। এটি প্রমাণ করে যে, আল্লাহর সামনে বান্দার নিজস্ব কোনো অস্তিত্ব নেই।
“আল-ইন্সানু সিররি ওয়া আনা সিররুহু” (মানুষ আমার রহস্য, আর আমি মানুষের রহস্য)। যখন একজন মুরিদ তার কামেল মুর্শিদের কদমবুসি করে, তখন সে মূলত তার নিজের ‘অহং’ বা ‘আনাফিয়াত’কে বিসর্জন দেয়। মাথা নিচু হওয়াটা এখানে শারীরিক কোনো ক্রিয়া নয়, বরং মনের বিনয়। পীর মোর্শেদের প্রতি ভালোবাসা থেকে কদমবুসি করা হয়। এটি অহংকার চূর্ণ করার একটি মাধ্যম।
আল্লাহ প্রেরিত মহামানব যাদের ভিতরে আল্লাহর নূর বা আধ্যাত্মিক শক্তি থাকে, তাঁদের সম্মান করা মূলত স্রষ্টাকেই সম্মান করা।
ফেরেশতাদের যখন আদম (আ.)-কে সেজদা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, তখন আদম (আ.) উপাস্য ছিলেন না। বরং আদমের ভেতরে আল্লাহর ফুঁকে দেওয়া ‘রূহ’ বা নূরের প্রতি সেটি ছিল সম্মান। যে মানে নাই সে শয়তান হয়ে গেছে।
পবিত্র কোরআনের প্রমণ সম্মানসূচক সেজদা (ইউসুফ আ.-এর ঘটনা)
কোরআন মজিদে সম্মান প্রদর্শনের জন্য মাথা নত করা বা সেজদা করার দৃষ্টান্ত রয়েছে। হযরত ইউসুফ (আ.)-এর ভাইরা যখন তাঁর সামনে উপস্থিত হলেন নবী (আ:)বাবা ও মা সহ তারা সবাই তিনাকে সেজদা করেছিলেন..
“আর সে তার পিতামাতাকে উচ্চাসনে বসালো এবং তারা সবাই তার সামনে সেজদায় লুটিয়ে পড়ল…”
(সূরা ইউসুফ, আয়াত: ১০০)
এখানে ইউসুফ (আ.)-এর বাবা মা ও ভাইয়েরা তাঁকে ইবাদত করেননি, বরং সম্মান প্রদর্শন করেছিলেন। সম্মানের জন্য নিচু হওয়া এবং ইবাদতের নিয়তে নিচু হওয়া এক বিষয় নয়। কদমবুসি মূলত সেই সম্মানেরই একটি শাখা।
“বান্দা যখন সেজদায় থাকে, তখন সে তার রবের সবচেয়ে কাছে থাকে।”
আধ্যাত্মিক বিচারে সেজদা হলো একটি সংযোগ। সেজদা মানে হলো নিজের ‘আমি’কে বিসর্জন দেওয়া। ‘সম্মান’ এবং ‘ইবাদত’ এর মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য রয়েছে। সম্মান হলো সৃষ্টিকে তার মর্যাদানুযায়ী ভালোবাসা, আর ইবাদত হলো স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা। কদমবুসি যদি কেবল ভক্তি ও বিনয়ের জন্য হয় এবং সেখানে সেজদার নিয়ত না থাকে, তবে তা আধ্যাত্মিক আদব হিসেবে গণ্য হয়।
সাহাবায়ে কেরাম কদমবুসি করতেন। সাহাবীগণ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি অগাধ ভালোবাসা থেকে তাঁর হাত ও পা মোবারক চুম্বন করতেন।
হযরত জারে’ (রা.) বলেন,
“যখন আমরা মদিনায় পৌঁছালাম, তখন আমরা আমাদের সওয়ারি থেকে দ্রুত নেমে পড়লাম এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর হাত ও পা মোবারক চুম্বন করলাম।”
(আল-আদাবুল মুফরাদ, হাদিস নং ৯৭৫)
সুনানে আবু দাউদ ও তিরমিজিতে বর্ণিত আছে:
এক ইহুদি ব্যক্তি অন্যকে বলল, “চলো এই নবীর কাছে যাই।” তারা এসে রাসূল (সা.)-কে কিছু প্রশ্ন করলেন এবং উত্তর পেয়ে তাঁর হাত ও পা মোবারক চুম্বন করে বললেন, “আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি আপনি অবশ্যই নবী।”
(আবু দাউদ: ৫২২৩, তিরমিজি: ২৭৩৩)
সাহাবীগণ রাসূল (সা.)-এর সামনে মাথা নিচু করে পা চুম্বন করেছেন। যদি মাথা নিচু করলেই তা ‘সেজদা’ হয়ে যেত, তবে নবীজি (সা.) অবশ্যই তাদের শিরক বা হারামের গুনাহ থেকে সতর্ক করতেন। তিনি চুপ থাকা মানেই এটি জায়েজ।
তাবেই ও ইসলামের শ্রেষ্ঠ ইমামগণও বড়দের কদমবুসিকে আদব হিসেবে দেখতেন। ইমাম মুসলিম (রহ.) যখন তাঁর উস্তাদ ইমাম বুখারী (রহ.)-এর সাথে সাক্ষাৎ করতেন, তিনি বলতেন:
“হে উস্তাদদের উস্তাদ! আমাকে অনুমতি দিন আমি যেন আপনার পা মোবারক চুম্বন করতে পারি।”
(সিয়ারু আলামিন নুবালা)
তিনারা সহ প্রত্যেকটা মাজহাবের ইমাম ও আল্লাহর অলির দরবারে কদমবুসি অত্যন্ত প্রচলিত উত্তম কাজ।ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিমের মতো মহান ইমামগণও তাঁদের উস্তাদদের পা চুম্বন করার অনুমতি চাইতেন।
পীর বা মুর্শিদের কদমবুসি করা মানে তাঁর মাটির শরীরের পূজা করা নয়, বরং তাঁর অন্তরে থাকা ‘নূরে ইলাহী’ বা আল্লাহর মহব্বতের প্রতি সম্মান জানানো।
মা-বাবার প্রতি বিনয় ও কদমবুসি শুধু জায়েজ নয় আল্লাহর বিধান। আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে মা-বাবার প্রতি সর্বোচ্চ বিনয় প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছেন। এর অন্যতম বহিঃপ্রকাশ হলো শারীরিকভাবে তাঁদের সামনে নত হওয়া।
“আর তাদের উভয়ের সামনে দয়াবশে বিনয়ের ডানা অবনমিত করো…” (সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত: ২৪)
এই আয়াতে ‘ডানা অবনমিত করা’ বা নিজেকে ছোট করে বিলিয়ে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কদমবুসি বা পা চুম্বন করা এই বিনয় ও বিলীন হওয়ারই একটি বাস্তব রূপ। এটি কোনো পূজা নয়, বরং আল্লাহর দেওয়া নির্দেশ অনুযায়ী মা-বাবার সামনে নিজেকে তুচ্ছ প্রমাণ করা।
মাথা নত করে সালাম বা কদমবুসি করলেই তা কারিগরিভাবে ‘সেজদা’ হয়ে যায় না, যদি না সেখানে সেজদার পূর্ণ শর্ত এবং ইবাদতের নিয়ত থাকে। সেজদার জন্য সাতটি অঙ্গ মাটিতে ঠেকানো ও নিয়ত করা শর্ত। সেজদার নিয়ত থাকে ইবাদত বা উপাসনা। আর কদমবুসির নিয়ত হলো শ্রদ্ধা ও দোয়া। ইসলামে বড়দের সামনে সামান্য ঝুঁকে সালাম দেওয়া বা পা ছোঁয়া একটি শিষ্টাচার, যা নবী, সাহাবি, তাবেই, মাজহাবের ইমামগনদের ভ্রাতৃবৃন্দের আমল দ্বারাও প্রমাণিত।
পরিশেষে বলা যায়, কদমবুসি বা মাথা নত করে সম্মান প্রদর্শন করা কেবল একটি শারীরিক ভঙ্গি নয়, বরং এটি হৃদয়ের অহংকার বিসর্জন দিয়ে বিনয়ের সাগরে নিজেকে বিলীন করার একটি মাধ্যম। শরিয়তের মাপকাঠিতে সিজদাহ কেবল আল্লাহর জন্য নির্ধারিত একটি ইবাদত, যেখানে কপাল ও নাক মাটিতে ঠেকিয়ে স্রষ্টার সার্বভৌমত্ব স্বীকার করা হয়। অন্যদিকে, কদমবুসি হলো সৃষ্টির ভেতর স্রষ্টার নূরের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন। ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনা, সাহাবায়ে কেরামের আমল এবং ইমামগণের আদর্শ প্রমাণ করে যে ভক্তি ও বিনয়ের জন্য নত হওয়া আর উপাসনার জন্য নত হওয়া এক বিষয় নয়। সুতরাং, যদি কারো নিয়ত কেবল আদব ও দোয়া লাভ হয় এবং সেখানে সিজদাহর পূর্ণ শর্ত বিদ্যমান না থাকে, তবে তা অবশ্যই জায়েজ এবং আধ্যাত্মিকতার একটি অনন্য সোপান। যারা পীর-মুর্শিদ, পিতা-মাতা বা বুজুর্গদের কদমবুসি করেন, তারা মূলত নফসের গর্দান জবেহ করে প্রকৃত মুমিন হওয়ার পথে এক ধাপ এগিয়ে যান। নিয়ত যেখানে বিনয়, সেখানে শিরকের কোনো স্থান নেই।