সংক্রমণ কমলেও আছে উদ্বেগ

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual8 Ad Code

নিউজ ডেস্কঃ

প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের সংক্রমণ অনেকটাই কমে এসেছে। রোববার থেকে টানা তিন দিন ধরে নমুনা পরীক্ষার বিপরীতে শনাক্তের হার দেড় শতাংশের নিচে রয়েছে। কমেছে মৃত্যুও।
করোনার সংক্রমণ কমে আসায় প্রায় দেড় বছর পর গত সেপ্টেম্বর থেকে স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়া হয়েছে। খুলে দেওয়া হয়েছে মেডিকেল কলেজও।

টিকাদানেও গতি এসেছে। দেশের ২৫ শতাংশ মানুষ অন্তত এক ডোজ করে টিকা পেয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের টিকাকরণ শুরু হতে যাচ্ছে। ১২ থেকে ১৭ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের পরীক্ষামূলক টিকাদান শুরু হয়েছে।

ব্যবসা-বাণিজ্যিক কার্যক্রম অবশ্য পুরোদমে চালু হয়েছে আরও আগে। সব মিলিয়ে করোনা-ভীতি কাটিয়ে জনজীবন এখন অনেকটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এরপরও উদ্বেগ রয়ে গেছে।

কারণ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়াসহ ইউরোপের দেশগুলোতে নতুন করে সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে। কয়েকটি দেশের পরিস্থিতি উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে।

নতুন করে বাড়তে থাকা সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাশিয়ার সরকার নাগরিকদের এক সপ্তাহ বাসাবাড়িতে অবস্থান করতে নির্দেশনা দিয়েছে। ইউরোপের অনেক দেশেও বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও সংক্রমণ বাড়তে শুরু করেছে।

করোনার এ সংক্রমণ বাংলাদেশেও ছড়িয়ে পড়তে পারে বলে মনে করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের অভিমত, বিভিন্ন দেশে নতুন করে সংক্রমণ ও মৃত্যু বেড়ে যাওয়ার ঘটনা খুবই উদ্বেগের। কারণ এসব দেশের মধ্যে কয়েকটি দেশ শতভাগ টিকাদান সম্পন্ন করেছে; কয়েকটি দেশে টিকাকরণ ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ সম্পন্ন হয়েছে। এরপরও করোনার নতুন ধরন সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়াচ্ছে।

Manual7 Ad Code

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শঙ্কার অন্যতম কারণ হলো, নতুন সংক্রমণ ছড়ানো কয়েকটি দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। প্রতিদিনই মানুষ যাতায়াত করছে। সুতরাং বাংলাদেশেও নতুন করে সংক্রমণ বৃদ্ধির শঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

তাই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে থাকলেও মাস্ক পরা অব্যাহত রাখতে হবে। সামাজিক দূরত্ব ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে হবে। একই সঙ্গে টিকাকরণ অব্যাহত রাখতে হবে। দ্রুততম সময়ে অধিকসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে টিকার আওতায় আনার ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাহলে সংক্রমণ পরিস্থিতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতে পারে।

Manual6 Ad Code

‘পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক’ : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা অনুযায়ী, সংক্রামক রোগের ক্ষেত্রে শনাক্তের হার পাঁচ শতাংশের নিচে থাকলে সেটি অন্যান্য সাধারণ রোগের মতো গণ্য হবে। তবে নূ্যনতম ১৪ দিন এই হার বজায় থাকতে হবে। করোনার দ্বিতীয় ঢেউয়ের পিক টাইমে দৈনিক রোগী শনাক্তের হার চলতি বছরের জুলাইয়ে ৩০ শতাংশ ছাড়িয়েছিল। একই সঙ্গে দৈনিক রোগী শনাক্তের সংখ্যা ১৫ হাজার এবং মৃতের সংখ্যা ২৫০ ছাড়িয়ে যায়।

আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময় থেকে এই সংক্রমণ ও মৃত্যু কমতে থাকে। শনাক্তের হারও কমতে থাকে। গত ২১ সেপ্টেম্বর তা পাঁচ শতাংশের নিচে নেমে আসে। এরপর থেকে টানা ৪৫ দিন ধরে শনাক্তের হার পাঁচ শতাংশের নিচে রয়েছে।

৩ অক্টোবর থেকে শনাক্তের হার তিন শতাংশের নিচে নেমে আসে। গত শুক্রবার তা আরও কমে এক দশমিক ৩৬ শতাংশে নেমে আসে। পরদিন শনিবার শনাক্তের হার কিছুটা বাড়লেও তা দুই শতাংশ অতিক্রম করেনি। এরপর থেকে শনাক্তের হার দেড় শতাংশের নিচে রয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্দেশনা বিবেচনায় নিলে দেশে সংক্রমণ ছড়ানো করোনাভাইরাসকে অন্যান্য সাধারণ রোগের মতো একটি রোগ হিসেবে গণ্য করা যায়।

দেশে দেশে সংক্রমণ বাড়ছে : রাশিয়ায় করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ও মৃত্যু ব্যাপক হারে বৃদ্ধির কারণে সব কর্মস্থল আট দিনের জন্য বন্ধ হতে যাচ্ছে। আগামী ৩০ অক্টোবর থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভদ্মাদিমির পুতিনের সরকার এ প্রস্তাব অনুমোদন করেছেন। এই ছুটি আরও বাড়তে পারে।

গত ২৪ ঘণ্টায় রাশিয়ায় নতুন করে ৩৭ হাজার ৯৩০ জনের শরীরে করোনা সংক্রমণ শনাক্ত হয়েছে। একই সময় মারা গেছেন এক হাজার ৬৯ জন। দেশটিতে করোনার টিকাদান কার্যক্রম স্থগিত হওয়ার পর কয়েক সপ্তাহ ধরে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে বলে জানানো হয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপির এক প্রতিবেদনে।

রাশিয়ায় এ পর্যন্ত ৩৫ শতাংশ মানুষ টিকার পূর্ণ ডোজ পেয়েছেন। গত পাঁচ সপ্তাহে মস্কোতে আগের তুলনায় আক্রান্তের সংখ্যা ৩০ শতাংশ বেড়েছে।

রোমানিয়ার হাসপাতালগুলোতে নতুন রোগী ভর্তি করা কঠিন হয়ে পড়েছে। জার্মানিসহ ইউরোপের আরও কয়েকটি দেশেও সংক্রমণের হার বাড়ছে। অথচ করোনা টিকাদানের ক্ষেত্রে ইউরোপ উল্লেখযোগ্য মাইলফলক স্পর্শ করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, ইউরোপ মহাদেশে একশ’ কোটির বেশি ডোজ টিকা দেওয়া হয়েছে। গত তিন সপ্তাহ ধরে এ অঞ্চলের অর্ধেকেরও বেশি দেশে আক্রান্তের সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে, গত এক সপ্তাহ এই অঞ্চলে সংক্রমণ বৃদ্ধির হার ছিল সাত শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমণের হার ১১ শতাংশে নেমে আসার পর সংক্রমণ আবারও বাড়ছে সেখানে। যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকদিন ধরে গড়ে দৈনিক সংক্রমণ থাকছে ৭০ হাজার করে।

চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির পর এটিই সর্বোচ্চ সংক্রমণের ঘটনা। সেখানে করোনা পরিস্থিতির আরও অবনতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন দেশটির শীর্ষ সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ ড. অ্যান্থনি ফাউচি।

যুক্তরাজ্যেও করোনার সংক্রমণ দ্রুতগতিতে বাড়ছে। দেশটির বিশেষজ্ঞরা আবারও বিধিনিষেধ আরোপ করার পক্ষে মত দিয়েছেন। যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস) বলেছে, শীত মৌসুমে করোনার দাপট আরও বাড়বে।

তাই এখনই সংক্রমণ থেকে বাঁচতে আবারও কভিড বিধিনিষেধ চালু করতে হবে। মাস্ক ব্যবহারের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তারা। এই মুহূর্তে দেশটির পাঁচ শতাংশ মানুষ মাস্ক পরছেন। এমন প্রেক্ষাপটে ইউরোপে করোনা-সংক্রান্ত বিধিনিষেধ শিথিল করার বিষয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। ফ্রান্সের সংসদ জরুরি অবস্থার মেয়াদ আগামী বছরের জুলাই পর্যন্ত বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সুতরাং করোনা দ্রুতই বিশ্ব থেকে যে বিদায় নিচ্ছে না, সে বিষয়ে বিশেষজ্ঞরাও সহমত।

মাস্ক ও টিকায় গুরুত্বারোপ :করোনাভাইরাসের নতুন ধরন কোনো দেশে দেখা দিলে তা বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়বে বলে মনে করেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরোলজিস্ট অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম। তিনি সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, চীনের উহান থেকে উৎপত্তি হয়ে করোনাভাইরাস বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে।

এরপর এক-একটি দেশে নতুন নতুন ধরন শনাক্ত হয়েছে এবং তা ছড়িয়ে পড়েছে। সুতরাং বিশ্বের কোনো দেশে নতুন ধরন শনাক্ত হলে তা অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়বে। যুক্তরাজ্য ও রাশিয়ায় নতুন ভ্যারিয়েন্টে (ধরন) সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে। এটি বিশ্বের অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়বে। বাংলাদেশও এর বাইরে থাকবে না। সুতরাং সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। বিশেষ করে মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে টিকাকরণের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

Manual6 Ad Code

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. বে-নজির আহমেদ বলেন, করোনার ভ্যারিয়েন্ট (ধরন) পরিবর্তন হলে সংক্রমণ বাড়বে- এটি বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত। প্রাথমিকভাবে কয়েকটি দেশে এটি শনাক্ত হয়েছে এবং ওইসব দেশে সংক্রমণ ও মৃত্যু বাড়ছে। ধাপে ধাপে হয়তো এটি অন্যান্য দেশেও ছড়িয়ে পড়বে। সুতরাং স্বাস্থ্যবিধি মানতে অবহেলা করা যাবে না। বিশেষ করে মাস্ক পরা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দ্রুততম সময়ে অধিক সংখ্যক মানুষকে টিকার আওতায় আনতে হবে। তাহলে নতুন ধরন ছড়িয়ে পড়লেও করোনা পরিস্থিতি নাগালের বাইরে যাবে না বলে মনে করেন তিনি।

এক ডোজ করে টিকা পেয়েছেন এক-চতুর্থাংশ মানুষ : স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত রোববার পর্যন্ত দেশের ৪ কোটি ৬ লাখ ২৭ হাজার ৬৮৮ জন এক ডোজ করে টিকা পেয়েছেন। তাদের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছেন ২ কোটি ৮ লাখ ৬২ হাজার ৬৫ জন। এ হিসাবে দেশে মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ মানুষ এক ডোজ করে টিকা পেয়েছেন। আবার ১৩ শতাংশ মানুষ দুই ডোজ করে টিকা পেয়েছেন। সবচেয়ে বেশি প্রয়োগ হয়েছে চীনের টিকা সিনোফার্ম। এই টিকার প্রথম ডোজ পেয়েছেন ২ কোটি ৯১ লাখ ৩১ হাজার ৯৬২ জন।

Manual4 Ad Code

তাদের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ নিয়েছেন ১ কোটি ২৮ লাখ ২৪ হাজার ৩৬৩ জন। এরপর অক্সফোর্ডের টিকার প্রথম ডোজ পেয়েছেন ৮২ লাখ ৮২ হাজার ১২১৩ জন। তাদের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছেন ৫৪ লাখ ৪১ হাজার ৭ জন। মডার্নার টিকার প্রথম ডোজ পেয়েছেন ২৬ লাখ ৯৮ হাজার ১৯২ জন। তাদের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছেন ২৫ লাখ ৫ হাজার ৯১৯ জন। ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকার প্রথম ডোজ পেয়েছেন ৫ লাখ ১৫ হাজার ৪১১ জন। তাদের মধ্যে দ্বিতীয় ডোজ পেয়েছেন ৯০ হাজার ৭৭৬ জন।

স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেন, কোভ্যাক্সের আশ্বাস ও টিকা কেনার যে রোডম্যাপ করা হয়েছে, তাতে আগামী ডিসেম্বর ও জানুয়ারির মধ্যে ৫০ শতাংশ এবং মার্চ-এপ্রিলের মধ্যে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ মানুষ টিকার আওতায় চলে আসবে। এই লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী টিকাকরণ করা গেলে করোনার নতুন ধরন ছড়ালেও তা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে। সংক্রমণ কমে আসায় অনেকের মধ্যে মাস্ক ব্যবহারে অনীহা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এটি করা যাবে না। মাস্ক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন ধরনের মাধ্যমে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে রাখার পাশাপাশি চিকিৎসা সেবার উন্নয়নে আরও একগুচ্ছ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। তবে সবার প্রতি আহ্বান থাকবে, মাস্ক ব্যবহার ও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলুন। নিজেকে ও পরিবারের সবাইকে সুরক্ষিত রাখুন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual6 Ad Code