সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয় : বিভুরঞ্জন সরকারের জীবন, মৃত্যু ও সাংবাদিক সমাজের দীর্ঘশ্বাস

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ১ বছর আগে

Manual8 Ad Code

সংগ্রাম দত্ত

Manual6 Ad Code

বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৫৪ বছর পার হলেও সাংবাদিকতার স্বাধীনতা আজও সীমিত। স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখানো দেশটির সাংবাদিক সমাজ আজও অসংখ্য চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রবীণ সাংবাদিক বিভুরঞ্জন সরকার–এর মৃত্যু এই চ্যালেঞ্জগুলোর অতি স্পষ্ট প্রতিফলন। তার শেষ খোলা চিঠি শুধু একজন মানুষের ব্যক্তিগত বেদনা নয়, বরং পুরো সাংবাদিক সমাজের দীর্ঘশ্বাস।

জীবনের শেষ লেখা ও মৃত্যু-

২১ আগস্ট ২০২৫ তারিখে সকাল ৯টার দিকে বিভুরঞ্জন সরকার একটি খোলা চিঠি ই-মেইলে পাঠান। ফুটনোটে লেখেন—“জীবনের শেষ লেখা হিসেবে এটা ছাপতে পারেন।” সকাল ১০টার দিকে অফিসে যাওয়ার কথা বলে তিনি বাসা থেকে বের হন, কিন্তু আর ফিরে আসেননি।

পরের দিন, ২২ আগস্ট বিকেল পৌনে চারটায় মুন্সিগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার মেঘনা নদী থেকে ভাসমান অবস্থায় তার লাশ উদ্ধার করা হয়। ছেলে ঋত সরকার ও ভাই চিররঞ্জন সরকার লাশ শনাক্ত করেন।

এই ঘটনায় আমরা কেবল একজন সাংবাদিকের মৃত্যু দেখছি না; এটি একজন নির্ভীক সাংবাদিকের শেষ প্রতিবাদ, যে জীবন জুড়ে সত্য লিখে বেঁচে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে গেছেন।

সংগ্রামী সাংবাদিকতা ও পেশাগত ইতিহাস-

বিভুরঞ্জন সরকার তার সাংবাদিকতা জীবন শুরু করেছিলেন স্কুলজীবনেই। প্রথমে দৈনিক আজাদ–এর মফস্বল সাংবাদিক হিসেবে কাজ শুরু, পরে দৈনিক সংবাদ, দৈনিক রূপালী, সাপ্তাহিক একতা, ‘চলতিপত্র’, ‘মৃদুভাষণ’, ‘দৈনিক মাতৃভূমি’—অনেক গণমাধ্যমে দায়িত্ব পালন করেছেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নিয়েছিলেন। এরশাদের আমল, নানা রাজনৈতিক আন্দোলন—সবক্ষেত্রেই সাহস ছাড়া লেখা সম্ভব ছিল না। ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করা থেকে শুরু করে জাতীয় দৈনিকের সম্পাদকীয় দায়িত্ব—সবকিছুই সততা ও দায়বোধের সঙ্গে পালন করেছেন।

চিঠিতে তিনি লিখেছেন—

> “আমি খুব সাহসী মানুষ নই, কিন্তু চোখ রাঙিয়ে কেউ আমাকে দিয়ে কিছু লেখাতে পারেনি।”

তবে জীবনের শেষ সময়ে তার লেখা পত্রিকায় প্রকাশের জন্য অনুরোধ করতে হয়েছে, পাঠকরা তেমন আগ্রহ দেখাননি।

অর্থনৈতিক সংকট ও স্বাস্থ্যজটিলতা-

বিভুরঞ্জন সরকারের জীবনচিত্রের এক বড় দিক ছিল আর্থিক অনটন।

দীর্ঘকাল সহকর্মীদের তুলনায় কম বেতন।

মাসিক ওষুধের খরচ মাত্র ২০–২২ হাজার টাকা।

ধার-দেনা ছাড়া চলতে পারতেন না।

নিজের ছেলের চিকিৎসা ও মেয়ের শিক্ষাগত ব্যর্থতার ব্যয়ও বহন করতে হয়েছে।

তিনি লিখেছেন—

“আহা, যদি ওই বেতনের একটি চাকরি পেতাম, তাহলেও সংসার চালানোর জন্য ধার-দেনা করতে হতো না।”

Manual7 Ad Code

অর্থনৈতিক এই অভাব, চিকিৎসা ও ঋণ—সব মিলিয়ে তার মানসিক চাপ ও হতাশার মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

পরিবারিক জীবন ও সন্তানের সংগ্রাম-

বিভুরঞ্জন সরকারের স্ত্রী ছাড়া দুই সন্তান।

কন্যা বড়, চিকিৎসক, বিসিএস পাস, এমডি করার সময় থিসিস পরীক্ষায় ব্যর্থ।

ছেলে বুয়েট পাস, বিদেশি বৃত্তি পেয়েও শারীরিক সমস্যার কারণে সময়মতো যেতে পারেনি, চাকরিতে স্থিতিশীলতা পায়নি।

পিতা হিসেবে বিভুরঞ্জন সরকারের কণ্ঠে বারবার ভেসে ওঠে—“অপরাধ কি ওর নাম, নাকি বাবা হিসেবে আমি?”

এই পরিবারিক দুশ্চিন্তাও তার হতাশাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

সাংবাদিকতা বনাম রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক প্রভাব-

চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেছেন—শেখ হাসিনার দরবারে সাহায্যের আবেদন করেও কোনো ফল পাননি। অন্যদিকে অনেক সাংবাদিক রাজনৈতিক আনুকূল্য ও তোষামোদে প্লট, বিদেশ সফর বা নগদ অর্থ পেয়েছেন।

সত্য প্রকাশের জন্য সাংবাদিকদের মামলা, হয়রানি বা প্রাণহানির ঝুঁকি থাকে।

সম্পাদকরা অনেক সময় চাপ সহ্য করতে না পেরে সাহসী লেখকদের লেখা প্রত্যাহার করে দেন।

মিডিয়ার অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাও প্রায়শই স্বাধীন নয়, ফলে সাংবাদিকরা নানাবিধ মানসিক ও পেশাগত চাপে থাকেন।

এই পরিস্থিতি দেশের গণতন্ত্রের স্থিতিশীলতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে।

বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজের সংকট-

বিভুরঞ্জন সরকারের ব্যক্তিগত দুঃখ শুধু তার নিজস্ব নয়। এর আড়ালে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজের দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা:

অর্থনৈতিক নিরাপত্তাহীনতা: বহু সাংবাদিক বেতন পান না, মাসে ধার-দেনা করে জীবন চালান।

রাজনৈতিক চাপ: ক্ষমতাসীন দল বা বিরোধী দলের প্রভাবের কারণে সাংবাদিকরা প্রায়ই তোষামোদ করতে বাধ্য হন।

নিরাপত্তা ঝুঁকি: সত্য লিখতে গেলে মামলা, হয়রানি, এমনকি প্রাণহানির সম্ভাবনা থাকে।

Manual4 Ad Code

সামাজিক স্বীকৃতির অভাব: সততা ও দায়বোধের সঙ্গে কাজ করা সাংবাদিকরা বৈষম্য ও অবহেলার শিকার হন।

বিভুরঞ্জন সরকারের চিঠিতে পাওয়া যায় সেই অভিজ্ঞতার প্রতিফলন:

Manual6 Ad Code

“আমার একটি লেখার জন্য আজকের পত্রিকার অনলাইন বিভাগকে লালচোখ দেখানো হয়েছিল।”

সত্য বলার দায় ও সমাজের অমানবিক বাস্তবতা-

বাংলাদেশে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা শুধু কাগজে-কলমে বিদ্যমান। বাস্তবে সাংবাদিকরা প্রায়শই অবহেলা, দারিদ্র্য ও রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে টিকে থাকার চেষ্টা করেন।

বিভুরঞ্জন সরকারের জীবন-চলন এই বাস্তবতাকে তুলে ধরেছে। সত্য বলার দায় শুধু সাহসের নয়, এটি আর্থিক ও সামাজিক নিরাপত্তার অভাবের সঙ্গে লড়াইয়ের নাম।

রাষ্ট্রের দায় ও আমাদের করণীয়-

বিভুরঞ্জন সরকারের মৃত্যু আমাদের শিখিয়েছে—সত্যের প্রতি দায়বদ্ধতা একার কোনো উপায় নয়; রাষ্ট্র, সমাজ ও গণমাধ্যমকেও সেই দায় নিতে হবে।

প্রয়োজন:

ন্যায্য বেতন ও চাকরির নিরাপত্তা: সকল সাংবাদিককে ন্যূনতম বেতন কাঠামোর আওতায় আনা।

রাজনৈতিক চাপমুক্ত গণমাধ্যম: সংবাদপত্র ও অনলাইন মিডিয়াকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক চাপ থেকে মুক্ত রাখা।

চিকিৎসা ও কল্যাণ তহবিল: অসুস্থ সাংবাদিকদের চিকিৎসার জন্য বিশেষ তহবিল গঠন।

পেশাদারিত্বের স্বীকৃতি: যারা সততার সঙ্গে কাজ করেন, তাদের সম্মানিত করা।

বিভুরঞ্জন সরকারের জীবন ও মৃত্যু আমাদের সতর্ক করছে—সত্য বলার জন্য সাহসী হতে হবে, কিন্তু সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়িত্বও সমান। না হলে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা কেবল এক কাল্পনিক স্বপ্ন হয়ে থাকবে।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
  • মৃত্যু ও সাংবাদিক সমাজের দীর্ঘশ্বাস
  • সত্য লিখে বাঁচা সহজ নয় : বিভুরঞ্জন সরকারের জীবন
  • Manual1 Ad Code
    Manual4 Ad Code