

সিলেটে শনিবার বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করতে গিয়ে ঘণ্টাব্যাপী পুলিশের সঙ্গে ছাত্র-জনতার সংঘর্ষ ও কয়েক দফা ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এসময় দুই পুলিশ, তিন সাংবাদিক সহ অন্তত ৩০ জন আহত হয়েছেন। আটক করা হয়েছে ৪ জনকে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঘোষিত বিক্ষোভ মিছিলে সিলেটের রাজপথে ছাত্র জনতার ঢল নামে। এসময় লোকে লোকারণ্য হয়ে পড়ে চৌহাট্টাসহ এর আশাপাশের এলাকা। বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে শনিবার শহীদ মিনার ও চোহাট্টা পয়েন্টে অবস্থান নেন হাজার হাজার ছাত্র-জনতা।
শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ ও অবস্থান চলে বিকেল ৫টা পর্যন্ত। তবে ৫টার পর পুলিশের সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল ও শর্টগানের গুলীতে উত্তপ্ত হয়ে পড়ে চৌহাট্টা। এসময় দুই পুলিশ ও ৩ সাংবাদিকসহ অন্তত ৩০ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। আটক করা হয়েছে অন্তত ৪ জনকে।
আহত সাংবাদিকরা হলেন- সিলেট জেলা প্রেসক্লাবের উপদেষ্টা ও দৈনিক শ্যামল সিলেটের সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি এডভোকেট সামসুজ্জামান জামান, ক্লাবের কার্যনির্বাহী পরিষদের ক্রীড়া ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক, সিলেটপ্রতিদিনডটকমের স্টাফ ফটো সাংবাদিক রেজা রুবেল এবং ফটো সাংবাদিক রুহিন আহমদ।
এরআগে শুক্রবার বিকেলে আখালিয়ায় আহত হন দৈনিক কালবেলার ব্যুরো প্রধান মিঠু দাস জয় এবং সিলেটপ্রতিদিন২৪ডটকমের স্টাফ রিপোর্টার মোশাহিদ আলী।
এদিকে চৌহাট্টায় শুরু হওয়া সংঘর্ষে নগরীর জিন্দাবাজার, দরগাগেইট, আম্বরখানা, মিরবক্সটুলা, হাওয়াপাড়া, বন্দরবাজারহ এর আশপাশের কয়েক কিলোমিটার এলাকা রণক্ষেত্রে পরিনত হয়। পুলিশের গুলীর মধ্যে টিকতে না পেরে শিক্ষার্থীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়লেও কিছু সময় পর ফের জমায়েত হয়ে রাস্তা অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকে। সংঘর্ষ চলাকালে ব্যবসায়ীরা দোকানপাট বন্ধ করে নিরাপদে বসে থাকেন।
তবে পুলিশের হামলা গুলির মুখেও নগরীর বিভিন্ন পয়েন্টে অবস্থান নেন আন্দোলনকারী শিক্ষার্থীরা। তারা পুলিশের বিরুদ্ধে ভুয়া ভুয়া স্লোগান দিতে থাকেন। থেমে থেমে দফায় দফায় সংঘর্ষ চলে রাত সাড়ে ৭টা পর্যন্ত। মাগরিবের পর জিন্দাবাজার এলাকায় পুলিশের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের হয়রানী করা হবেনা এবং আটককৃতদের ছেড়ে দেয়া হবে মর্মে আশ্বস্ত করা হলে শিক্ষার্থীরা নিজ নিজ বাসায় ফিরে যান।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের ডাকা বিক্ষোভ মিছিলকে কেন্দ্র করে সিলেট নগরীর চৌহাট্টা জনসমূদ্রে পরিণত হয়। বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা দীর্ঘ ৩ ঘন্টা চৌহাট্টা-জিন্দাবাজার সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করতে থাকেন। বেলা ২টার দিকে কর্মসূচী শুরু হওয়ার কথা থাকলেও ১২টা থেকেই কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার সংলগ্ন এলাকায় আসতে থাকেন নগরীর বিভিন্ন কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা। বেলা বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে ছাত্র-জনতার ঢল। এসময় শিক্ষার্থীদের সাথে অভিভাবকসহ নানা শ্রেণীপেশার মানুষও অংশ নেন। বেলা ১টার দিকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মিছিল নিয়ে চৌহাট্টা পয়েন্টে আসার সময় আম্বরখানা এলাকায় ছাত্রলীগ বাঁধা দেয়। এই খবর চৌহাট্টায় ছড়িয়ে পড়লে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা আম্বরখানা অভিমুখে রওয়ান হন। পথিমধ্যে তারা খবর পান যে ছাত্রলীগের বাঁধা উপেক্ষা করে শাবি শিক্ষার্থীরা চৌহাট্টা আসছেন। তখন উত্তেজনা সাময়িক প্রশমিত হয়। শাবি শিক্ষার্থীরা যোগ দেয়ার সাথে সাথেই বদলে যায় দৃশ্যপট। মুহুর্তেই পুরো জনসমূদ্রে পরিণত হয় চৌহাট্টা এলাকা। এরপর থেকে ৫টার আগ পর্যন্ত চলতে থাকে বিক্ষোভ। ৫টার পরপরই শিক্ষার্থীরা চলে যাওয়ার প্রাক্কালে পেছন দিক থেকে হামলা চালায় পুলিশ। এরপরই রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে সিলেট।
এর আগে কর্মসূচি চলাকালে রাস্তায় বসে শিক্ষার্থীরা ‘আমার ভাই কবরে, খুনি কেন বাহিরে’, ‘জাস্টিস জাস্টিস উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘দিয়েছি তো রক্ত, আরও দিবো রক্ত’, ‘স্বৈরাচারের গদিতে আগুন জ্বালো একসাথে’, ‘জ্বালো রে জ্বালো, আগুন জ্বালো’, ‘বুকের ভেতর অনেক ঝড়, বুক পেতেছি গুলি কর’- এসব স্লোগান দিতে থাকেন।
বিকাল ৪টা ২০ মিনিটের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন সিলেটের প্রধান সমন্বয়ক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আব্দুল্লাহ আল গালিব সাংবাদিকদের বলেন, চৌহাট্টা পয়েন্টে আমরা আরও কিছুক্ষণ শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করবো। কেন্দ্র থেকে পরবর্তীতে নির্দেশনা এলে আমরা ফিরে যাবো। তবে আমাদের আন্দোলন চলমান থাকবে। রোববার থেকে আমাদের পূর্বঘোষিত অসহযোগ আন্দোলন শুরু হবে।
এদিকে চৌহাট্টা পয়েন্টে সংঘর্ষ নিয়ে পুলিশ ও শিক্ষার্থীদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য পাওয়া গেছে। পুলিশ বলেছে শিক্ষার্থীরা আগে ইটপাটকেল দিয়ে ঢিল ছুড়েছে। আর শিক্ষার্থীরা জানান পুলিশ আগে হামলা করেছে।
এ বিষয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের উপ কমিশনার (উত্তর) আজবাহার আলী শেখ বলেন, বিক্ষোভ মিছিলকে কেন্দ্র করে যাতে কোন নাশকতামূলক ঘটনা না ঘটে সে জন্য সতর্ক অবস্থানে ছিল পুলিশ। তারা বার বার আমাদের কাছাকাছি আসার চেষ্টা করেছে। পুলিশদের উত্তেজিত করেছিল। কিন্তু পুলিশ সর্বোচ্চ ধৈর্যধারণ করেছে। শেষ পর্যন্ত ইটপাটকেল দিয়ে ২/৩জন পুলিশকে আহত করার পর পুলিশ অ্যাকশনে যেতে বাধ্য হয়।