স্মৃতিতে সরারচরের যুদ্ধ

লেখক:
প্রকাশ: ৭ years ago

Manual5 Ad Code

মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ) :
কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের পশ্চিম আব্দুল্লাহপুর গ্রামের মরহুম আব্দুল হামিদ ভূইয়ার ছেলে মোঃ সালাহ্ উদ্দিন (৬৫) রক্ত ঝড়া ১৯৭১ এর স্মৃতি তুলে ধরে বলেন, স্মৃতিশক্তি তেমন প্রখর না হওয়ায় তারিখটা স্মৃতিতে নেই। সম্ভবত ৯ থেকে ১১এর মধ্যে হবে। রাত তখন আনুমানিক আড়াইটা বাজে। কিশোরগঞ্জ জেলার বাজিতপুর উপজেলার সরারচর পাকবাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণ করতে মুক্তিযোদ্ধারা কুলিয়ারচর উপজেলার আগরপুর বাজারে একত্রিত হচ্ছিল। সুযোগ বুজে বীর মুক্তিযোদ্ধা আবদুল ওয়াহাব মাষ্টারের সাথে দলে ঢুকে পরলাম। পূর্ব প্রস্তুতি হিসাবে অন্ধকারের মাঝেই লাইন করে মুক্তিযোদ্ধাদের কাউন্টডাউন চলছে। ২ বার কাউন্টডাউন টাউনের পরও লোক একজন বেশি। অগত্যা হারিকেনের আলোতে মুখ দেখে দেখে গনণা হলো। কমান্ডার ছিলেন ভিটিগাঁও এর এক্স আর্মি (বর্তমানে প্রয়াত) মিছবাহ উদ্দিন। আমি উনার হাতে ধরা পড়ে গেলাম। রাগাম্বিত স্বরে বলছিলেন, “তুমি কি মুক্তিযোদ্ধা”? মাথা উঁচু করেই বলছিলাম, না। শেষ পর্যন্ত আমাকে সাথে নিতে বাধ্য হয়েছিলেন। কানে কানে যুদ্ধের পাসওয়ার্ড টা বলে দিয়ে ছিলেন। সরারচরের যুদ্ধে পাসওয়ার্ড ছিল পাঞ্জাব্বিয়া কুত্তা। আমাকে ১ টি মাইন বহন করে সরারচর রেল ষ্টেশনে পৌঁছানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সরারচর রেলষ্টেশনের দেড় দুই কিলোমিটার দক্ষিণে একটি গ্রাম কামালপুর! প্রতিবছর অগ্রহায়ণ মাসের প্রথম বৃহস্পতি বারে এখানে মেলা বসে। ঐখানে রাস্তার পাশে একটি কলা বাগান ছিল, যেখানে সারারাত মাইনটি নিয়ে বসা ছিলাম। কলা বাগানে কত লক্ষ কোটি মশা ছিল তা আল্লাহ্ ই জানতো। শর্ত ছিল, ধুমপান করা যাবেনা, কাশি দেওয়া যাবে না, মশাকে তাপ্পর দেওয়া যাবে না। এই সুযোগে মশা আমার সাথে যা আচরণ করার তাই করেছিল। ফজরের আজানের সাথে সাথেই যুদ্ধ শুরু হওয়ার কথা ছিল। যান্ত্রিক ত্রুটির কারনে সংকেত দিতে না পারায় যথা সময়ে যুদ্ধ শুরু হয়নি। বিলম্ভ হয়েছিল। যুদ্ধ শুরুর সাথে সাথেই পাক বাহিনীর বেপরোয়া গুলি বর্ষনে সরারচরের আকাশ বাতাস। প্রকম্পিত হয়ে উঠেছিল। এলাকার বাঁশঝাড় সহ গাছগাছাগুলোর কোন পাতা ছিলনা। এর ভিতর দিয়েই জীবন বাজি রেখে মাইনটি নিয়ে সরারচর রেলষ্টেশনে পৌঁছেছিলাম। যেখানে অপেক্ষায় ছিলেন কমান্ডার মিছবাহ উদ্দিন সাহেব। সরারচর হাইস্কুলের ছাত্রাবাসে ছিল পাকবাহিনীর ক্যাম্প। তাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্য সরারচর রেলষ্টেশনে দাড়িয়ে থাকা রেলগাড়িটিতে বিস্ফোরণ ঘটাতে মাইনটি ফিট করা হলো। কমান্ডার সাহেব আমাকে মাটিতে বুক লাগিয়ে শুয়ে পড়তে বললেন। আমি তাই করলাম। মাইনটি বিস্ফোরিত হলো। বুকের মধ্যে প্রচন্ড ঝাঁকুনি খেলাম। ভয়ও পেয়েছিলাম। মূহূর্তেই ট্রেনের ইঞ্জিনটি দাউ দাউ করে জ্বলে উঠছিল। ৭/৮দিন পর্যন্ত জ্বলছিল। সকাল হতেই লোকজন ঘর থেকে বের হতে শুরু করে ছিল। সময় যত গড়াতে লাগলো জনতার ¯্রােত ততই বাড়তে লাগলো। নারী-পুরুষ, আবাল বৃদ্ধ বনিতা সবাই একযোগে রাস্তায় নেমে পড়েছিল। সরারচর ও এর আশেপাশের এলাকা মুক্তিযোদ্ধা জনতায় একাকার হয়ে গিয়েছিল। ঐএলাকায় অনেক নারিকেল গাছ ছিল। সেদিন কোন গাছের নারিকেল অবশিষ্ট ছিলনা। সব কচি নারিকেল দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের আপ্যায়ন করা হয়েছিল। শুধু তাই নয়, সারা রাস্তায় মানুষ মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য পান, বিড়ি, সিগারেট, লজেন্স, বিস্কুট, সিদ্ধডিম যার ঘরে যা আছে তা নিয়েই দাঁড়িয়েছিলেন। সরারচর, কামালপুর, মাছিমপুর, রামদীসহ আশেপাশের সব গ্রামের ভাত ও তরকারির ডেক্সি রামদীর কুলুর বাজারের বটগাছের নীচে একত্রিত হয়েছিল। সন্ধ্যা পর্যন্ত এখানে খাওয়া-দাওয়া হয়েছিল। এ যেন এক আনন্দ মেলা। সন্ধ্যার পর যুদ্ধ বিরতি হয়েছিল। পরের দিন সকালে যেয়ে দেখলাম, দেশীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় রাতেই পাকবাহিনী পালিয়ে গেছে। যুদ্ধে এক পাকি সৈন্য মারা যায় এবং একজন জীবিত অবস্থায় ধরা পড়ে। ২২/২৩ জন রাজাকারের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছিল।
স্বাধীনতার জন্য কি আকুতি, কি পরিমাণ ত্যাগ করতে হয়েছে তা বলে বুঝানো সম্ভব নয়। মুক্তিযোদ্ধা হতে না পারার আক্ষেপ নেই। যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করতে পেরে নিজেকে ধন্য মনে করছি। সেদিন যদি যুদ্ধে মারা যেতাম তবে আমার নামটি হয়ত কেউ জানতো না তবে ৩০ লক্ষ শহীদের সাথে শহীদের মর্যাদাটুকু অন্ততঃ পেতাম। স্বাধীন দেশে দেখতে হতোনা অন্যায়, অবিচার, সন্ত্রাস, দুর্নীতি। আসুন না স্বাধীনতার চেতনায় দেশ গড়তে সবাই মিলে আর একবার লড়ি। সফল করি শহীদদের স্বপ্ন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code