১০ জানুয়ারি এক অনন্য দিন 

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৩ years ago

Manual8 Ad Code

ফিচার ডেস্ক:

Manual3 Ad Code

বাঙালি জাতির জীবনে ১০ জানুয়ারি অনন্য ঐতিহাসিক একটি দিন। ১৯৭২-এর এই দিনে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের মধ্য দিয়ে বাংলার মানুষ বিজয়ের পরিপূর্ণতা অর্জন করে। ’৭১-এর ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ হানাদার মুক্ত হলেও এদেশের মানুষ স্বাধীনতার স্বাদ পায়নি। যতক্ষণ মহান নেতা ফিরে না এসেছেন, ততক্ষণ বাংলাদেশের স্বাধীনতা পরিপূর্ণতা লাভ করতে পারেনি। স্বাধীনতা সেদিন পূর্ণতা পায়, যেদিন জাতির পিতা স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে তার স্বপ্নের স্বাধীন সোনার বাংলায় ফিরে এসেছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের ফয়সালাবাদের প্রধান কারাগার লায়ালপুর জেলে রাখা হয়েছিল। আগস্টের মাঝামাঝি সামরিক আদালতে তার বিচার শুরু হয়। বিচারের রায় ছিল পূর্বনির্ধারিত। ২৬ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের সময় ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, বিনা শাস্তিতে সে পার পাবে না। বিচারটা ছিল প্রহসনের। গোটা বিচার প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি আদালতে চুপচাপ বসে থাকতেন। বিচার প্রক্রিয়া চলাকালে তার পক্ষে নিয়োগ করা আইনজীবী জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘মুজিব নিজের পক্ষে কোনো অবস্থান নিতে চান কি না।’ উত্তরে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘আমি নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী। আমাকে অথবা আমার জনগণকে বিচার করার কোনো অধিকার এদের নেই। আইনের দিক দিয়ে কোনো বৈধতা এ আদালতের নেই’ (আহমেদ সালিম, ‘পাকিস্তানের কারাগারে শেখ মুজিবের বন্দিজীবন’)। ’৭১-এর ৩ ডিসেম্বর, প্রহসনমূলক বিচারের রায়ে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগে বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির দণ্ড হয়। পরে তাকে লায়ালপুর থেকে স্থানান্তর করা হয় মিয়ানওয়ালি জেলে। বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘তার কারাকক্ষের পাশে কবর খোঁড়া হয়।’ আহমেদ সালিম লিখেছেন, ‘জেলের ডেপুটি সুপার ফজলদাদ একদিন ব্যারাকে এসে আটজন বন্দিকে বাছাই করলেন। এদের দিয়ে আট ফুট লম্বা, চার ফুট প্রশস্ত ও চার ফুট গভীর গর্ত খোঁড়া হলো। উপস্থিত সবাই বুঝতে পারলেন, সেই রাতেই শেখ মুজিবকে ফাঁসি দেওয়া হবে। ৯টার মধ্যে কবর খোঁড়া সম্পন্ন হলো। কিন্তু সেই রাতে কিছু ঘটল না। ফাঁসি দেওয়ার নির্ধারিত দিন জুলফিকার আলী ভুট্টো প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে দেখা করে শেখ মুজিবকে ফাঁসি না দেওয়ার পরামর্শ দেন। তিনি বলেন, যদি মুজিবকে ফাঁসি দেওয়া হয়, তাহলে বাঙালির ক্রোধের লক্ষ্য হবে পূর্বাঞ্চলে মোতায়েনকৃত পাকবাহিনীর সর্বোচ্চ অফিসার থেকে সর্বনিম্ন সৈনিক পর্যন্ত সবাই। ভুট্টোর উপদেশ অনুসারে ইয়াহিয়া খান মুজিবের ফাঁসি স্থগিত রাখেন। কয়েকদিনের জন্য কবর ভরাট করা হয়। ১৫ দিন পর একইভাবে গর্ত খোঁড়ার হুকুম আসে। এবারও শেখ মুজিবের ফাঁসি দেওয়া হলো না। এমন প্রক্রিয়া তিনবার ঘটেছিল এবং তিনবারই তার ফাঁসি পিছিয়ে দেওয়া হয়।’

Manual7 Ad Code

১৬ ডিসেম্বর আমরা বিজয়ী হলে ইয়াহিয়া খান সেই আদেশ বাস্তবায়ন করতে পারেননি। পাকিস্তানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের পর ইয়াহিয়া খানকে অপসারণ করে ভুট্টো পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট হন। ইয়াহিয়া খান ভুট্টোর কাছে আবেদন করেছিলেন, ‘আমার একটি স্বপ্ন অপূর্ণ রয়ে গেছে, সেটি হলো শেখ মুজিবকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝোলানো, আমাকে সেই সুযোগ দেওয়া হোক।’ যে কারণে ভুট্টো মিয়ানওয়ালি কারাগারের জেল সুপার হাবীব আলীর কাছে বার্তা পাঠায় এবং বঙ্গবন্ধুকে মিয়ানওয়ালি কারাগার থেকে চশমা ব্যারাজস্থ হাবীব আলীর বাসভবনে নিয়ে রাখা হয়। এরপর ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অনুনয়-বিনয় করে পাকিস্তানের সঙ্গে একটি সম্পর্ক রাখার জন্য অনুরোধ করেন। বঙ্গবন্ধু ঘৃণাভরে সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।

ভারতের আকাশসীমা পাকিস্তানের জন্য নিষিদ্ধ থাকায় বঙ্গবন্ধুর অভিপ্রায়ে তাকে মুক্তি দিয়ে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দিতে রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা বজায় রেখে ৮ জানুয়ারি পাকিস্তান সরকার তাকে লন্ডন পৌঁছে দেয়। দ্রুতগতিতে খবরটি ছড়িয়ে পড়ে। ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত নেয়, তারা বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেবে। বিমানবন্দরে বঙ্গবন্ধুকে আনুষ্ঠানিকভাবে বরণ করে ব্রিটিশ সরকার। বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রীয় অতিথি হিসাবে ব্রিটেনের ক্ল্যারিজেস হোটেলে নিয়ে যাওয়া হয়। হোটেলে পৌঁছার কিছুক্ষণের মধ্যে তৎকালীন বিরোধী দলের নেতা লেবার পার্টির হ্যারল্ড উইলসন (পরে প্রধানমন্ত্রী) বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আলোচনায় বাংলাদেশের স্বীকৃতি প্রদানের ব্যাপারে ব্রিটেনের অনুসৃত নীতি ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘এক্ষেত্রে কনজারভেটিভরা কোনো সিদ্ধান্ত নিলে আমরা পূর্ণ সমর্থন জানাব।’ উল্লেখ্য, দেশ স্বাধীনের পর ’৭২-এর ৪ ফেব্রুয়ারি প্রথম পশ্চিমা দেশ হিসাবে ব্রিটেন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদান করে। বিকালে বঙ্গবন্ধু ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে যান। সেখানে বঙ্গবন্ধুকে বরণ করেন কনজারভেটিভ পার্টির নেতা প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ।

Manual6 Ad Code

১৬ ডিসেম্বর প্রিয় দেশ শত্রুমুক্ত হলেও বঙ্গবন্ধু কোথায় আছেন, কেমন আছেন, আমরা জানতাম না। যেদিন, ৮ জানুয়ারি, বঙ্গবন্ধুর মুক্তির সংবাদ জানলাম, সেদিন এক অনির্বচনীয় আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল সারা দেশে। যেদিন তিনি ফিরে এলেন, সেদিন ছিল সোমবার। সকাল থেকেই লাখ লাখ মানুষ ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে চারদিক মুখরিত করে মিছিল নিয়ে ছুটল বিমানবন্দর অভিমুখে।

Manual7 Ad Code

জাতির পিতার দুটি স্বপ্ন ছিল-বাংলাদেশ স্বাধীন করা এবং দেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলায় রূপান্তরিত করা। আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়ে প্রথম স্বপ্ন তিনি পূরণ করেছেন। আরেকটি স্বপ্ন বাস্তবায়নে যখন দ্বিতীয় বিপ্লবের ডাক দিলেন, তখনই বুলেটের আঘাতে সপরিবারে জাতির পিতাকে হত্যা করা হলো। আমাদের সৌভাগ্য তার দুই কন্যা তখন বিদেশে অবস্থান করায় তারা রক্ষা পান। ’৮১-এর মধ্য ফেব্রুয়ারিতে বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যার হাতে রক্তে ভেজা আওয়ামী লীগের পতাকা আমরা তুলে দিয়েছিলাম। সেই পতাকা হাতে নিয়ে নিষ্ঠা, সততা ও দক্ষতার সঙ্গে তিনি বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে চলেছেন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code