১৯৭১ সালে খুঁজে খুঁজে বুদ্ধিজীবী হত্যা করা হয়, ২০২৫ সালে হত্যা করা হচ্ছে শিল্পোদ্যোক্তাদের: বিটিএমএ সভাপতি

লেখক: Rumie
প্রকাশ: ১ বছর আগে

Manual2 Ad Code

অর্থনীতি ডেস্ক:

গ্যাসসংকট যেন ধুঁকতে থাকা শিল্প খাতের কফিনে শেষ পেরেক ঠুকে দিচ্ছে। ‘১৯৭১ সালে খুঁজে খুঁজে বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়েছিল, আর ২০২৫ সালে হত্যা করা হচ্ছে শিল্পোদ্যোক্তাদের।’ এমনই বিস্ফোরক অভিযোগ তুলেছেন ব্যবসায়ীদের শীর্ষ নেতারা। তাঁরা বলছেন, গ্যাসসংকট এমন মাত্রায় পৌঁছেছে যে, উৎপাদন থেমে যাচ্ছে একের পর এক কারখানায়। ৫০ শতাংশ কারখানায় ইতিমধ্যে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি কারখানাগুলোও আগামী দুই মাস টিকতে পারবে কি না, সন্দেহ। প্রায় সবার চলতি মূলধন সংকুচিত হয়ে আসছে। এমনকি সামনে ঈদের সময় শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করাও অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে অনেক প্রতিষ্ঠানের জন্য।

Manual6 Ad Code

গতকাল রোববার গুলশানের একটি ক্লাবে সাত ব্যবসায়ী সংগঠনের যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এসব উদ্বেগ প্রকাশ করেন বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএমএ) সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল। ‘শিল্প খাতে জ্বালানি, বিশেষ করে গ্যাস সংকটে টেক্সটাইল ও পোশাকশিল্পে উৎপাদন বিপর্যয়’ শীর্ষক এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে এফবিসিসিআই, বিটিএমএ, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ, বিসিআই, আইসিসিবি ও বিপিজিএমইএ।

শওকত আজিজ রাসেল বলেন, ‘গ্যাস না থাকলে কারখানা চলবে না। উৎপাদন না হলে বেতন-ভাতা কীভাবে দেব? সরকার যদি বেতন না দেওয়ার অপরাধে গাড়ি-বাড়ি বিক্রির নির্দেশ দেয়, তাহলে গ্যাস না দেওয়ার জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের শাস্তির কি ব্যবস্থা হবে না?’ তিনি হুঁশিয়ার করে বলেন, ‘শিল্প বাঁচাতে না পারলে সামনে দুর্ভিক্ষ আসবে।’

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, দেশের অনেক কারখানায় গত ১৪ এপ্রিল থেকে একেবারে গ্যাস নেই। কিছু এলাকায় যেটুকু আসছে, তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই কম। কারখানার প্রয়োজন যেখানে অন্তত ১০ পিএসআই চাপের গ্যাস, সেখানে মিলছে মাত্র ১-২ পিএসআই। ফলে কার্যত উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। কিন্তু মাস শেষে কর্মীদের বেতন ঠিকই দিতে হচ্ছে। একেকটি কারখানায় মাসে ১৫-২০ কোটি টাকার বেতন দিতে হয়, অথচ আয় নেই।

Manual2 Ad Code

বিসিআই সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, ‘গ্যাস নেই, উৎপাদন নেই, অথচ তিন মাস সুদ না দিলেই খেলাপি ঘোষণার হুমকি দিচ্ছে ব্যাংক। একই সঙ্গে সরকার বলছে, বেতন না দিলে গাড়ি-বাড়ি বিক্রি করতে হবে। এ পরিস্থিতিতে শিল্প কীভাবে চলবে?’

ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেন, সরকার শিল্পের চেয়ে গৃহস্থালি ব্যবহারকে প্রাধান্য দিচ্ছে। তাঁরা বলেন, ‘সিলিন্ডারের দাম কমিয়ে গৃহস্থালিতে লাইন প্রতিস্থাপন বন্ধ করুন, ভোলার গ্যাস সরাসরি ঢাকায় না এনে সারকারখানা ভোলায় সরিয়ে নিন।’ একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার দাবি তোলেন তাঁরা।

তাঁদের প্রশ্ন, ‘সরকার কি চায়, টেক্সটাইল শিল্প পাটশিল্পের মতো হারিয়ে যাক? ৫০ শতাংশ কারখানায় ইতিমধ্যে উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেছে। বাকি কারখানাগুলোও আগামী দুই মাস টিকতে পারবে কি না, সন্দেহ।’

বিটিএমইএর ভাইস প্রেসিডেন্ট সালেহ উজ্জামান বলেন, ‘শিল্প খাত ধ্বংসে যেন পরিকল্পিতভাবে একের পর এক মাস্টারপ্ল্যান নেওয়া হচ্ছে। একদিকে আপনারা সম্মেলন করে বিদেশি বিনিয়োগকারী আনছেন অথচ আমাদের কারখানাগুলো টিকিয়ে রাখার কোনো ব্যবস্থা নেই। তাহলে আমাদের ফ্যাক্টরিগুলোই তাঁদের দিয়ে দিন। অন্তত আমাদের জন্য সম্মানজনকভাবে ব্যবসা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার একটি পথ তৈরি করুন। আমরা আর পারছি না। প্রতিদিন শ্রমিকদের চাপ আর গালি শুনে ব্যবসা করার কোনো মানে হয় না। ভবিষ্যতে যেন ব্যবসায়ীরা মর্যাদা রক্ষা করে বেরিয়ে যেতে পারেন, সেই ‘এক্সিট পলিসি’ তৈরি করা এখন জরুরি।’

বাংলাদেশ টেরিটোরিয়াল অ্যান্ড লাইন ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিটিএলএমইএ) চেয়ারম্যান হোসেইন মেহমুদ বলেন, ‘গত ১৪ এপ্রিল থেকে আমাদের কারখানায় গ্যাস সরবরাহ নেই। এ অবস্থায় আমরা শ্রমিকদের বেতন কীভাবে দেব? আমাদের যেন পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এ সংকট নিরসনে গ্যাস খাতের দুর্নীতি বন্ধ করতে হবে এবং গ্যাস বিতরণে রেশনিং ব্যবস্থা চালু করা দরকার। একই সঙ্গে, দীর্ঘমেয়াদে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে আরও দুটি এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন করা জরুরি।

এ সংকট কাটাতে ব্যবসায়ীরা সরকারের কাছে তিন দফা দাবি তুলে ধরেছেন। তাঁরা বলছেন, অবিলম্বে শিল্প খাতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি শিল্প ও ক্যাপটিভ বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধির প্রস্তাব স্থগিত রাখার আহ্বান জানান তাঁরা। একই সঙ্গে গ্যাস সরবরাহ নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি একটি বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা নেওয়ার তাগিদ দেন উদ্যোক্তারা।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন বিটিএমইএ পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার রাজীব হায়দার, বিটিটিএলএমইএর সাবেক চেয়ারম্যান শাহাদাত হোসেন সোহেলসহ বিভিন্ন আয়োজক সংগঠনের প্রতিনিধিরা। বক্তারা রেশনিং পদ্ধতির আওতায় গ্যাস সরবরাহের দাবিও জানান। তাঁদের মতে, ‘যদি গ্যাস কম দিতে হয়, তাহলে অন্তত জানিয়ে দিন, কোন কোন সময় গ্যাস থাকবে না। সেই অনুযায়ী আমরা উৎপাদনের পরিকল্পনা নিতে পারি।’

Manual1 Ad Code

শিল্পোদ্যোক্তারা বলছেন, গ্যাস না দিলে উৎপাদন হবে না, উৎপাদন না হলে রপ্তানি কমবে, রপ্তানি না হলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ বাড়বেএটা বোঝার জন্য অর্থনীতিবিদ হওয়ার দরকার নেই। সরকারের নীতিনির্ধারকদের এখনই বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত নিতে হবে। না হলে দেশের প্রধান রপ্তানি খাত মুখ থুবড়ে পড়বে।

ডেস্ক: আর

Manual8 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code