২১ হাজার ফার্মেসির মধ্যে লাইসেন্সকৃত ফার্মেসি ১০ হাজার 

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual1 Ad Code

নিউজ ডেস্কঃ সিলেটের চার জেলায় জীবন রক্ষাকারী ঔষধ বিক্রির ফার্মেসি রয়েছে সাড়ে ২১ হাজার। এর মধ্যে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফার্মেসি রয়েছে প্রায় ১০ হাজার। বাকি সাড়ে ১১ হাজার ফার্মেসিই অনুমোদনহীন। কেমিস্টস এন্ড ড্রাগিস্টস সমিতি ও ঔষধ প্রশাসনের সিলেট অফিসের সাথে কথা বলে এমন তথ্য পাওয়া গেছে।

বিপুল সংখ্যক অবৈধ বা অনুমোদনহীন ফার্মেসি পরিচালিত হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সিলেটের বিশিষ্টজনেরা। বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের জন্য চরম হুমকি উল্লেখ করে এ ব্যাপারে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি তাদের। তবে, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সিলেট ও হবিগঞ্জের ড্রাগ সুপার মেহেদী হাসান সদ্য সিলেটে যোগদান করেছেন জানিয়ে অনুমোদনহীন ফার্মেসি থাকার বিষয়টি স্বীকার করেছেন।

Manual5 Ad Code

সংশ্লিষ্টদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, জীবন রক্ষাকারী ঔষধ বিপণনের জন্য ফার্মেসি ব্যবসা পরিচালনায় ড্রাগ লাইসেন্স ছাড়া কোনভাবেই ঔষধ বিক্রি করা যাবে না। লাইসেন্স প্রদানের ক্ষেত্রে ফার্মেসিকে বেশ কিছু বিষয় প্রতিপালনের জন্য নির্দেশনা প্রদান করা হয়। ড্রাগ লাইসেন্স ফার্মেসির দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন, রেজিস্ট্রার্ড ফার্মাসিস্ট দিয়ে পরিচালনা, নিবন্ধনবিহীন, মিসব্র্যান্ডেড, নকল, সরকারি ও মেয়াদোত্তীর্ণ ঔষধ এবং ফুড সাপ্লিমেন্ট ফার্মেসিতে মজুদ ও বিক্রি না করা, সাধারণ ঔষধ ও তাপসংবেদনশীল ঔষধ যথাযথভাবে সংরক্ষণ এবং তাপসংবেদনশীল ঔষধের তালিকা করে তা প্রদর্শনসহ বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়ে ফার্মেসির লাইসেন্স প্রদান করা হয়। এছাড়াও, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ফার্মেসির স্থান পরিদর্শন করারও নিয়ম রয়েছে। সব শর্ত পূরণ হলে ফার্মেসির পরিচালনার অনুমোদন দেয়া হয়।

Manual7 Ad Code

সংশ্লিষ্টরা জানান, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ ও মৌলভীবাজারে এমন অনুমোদিত ফার্মেসী আছে ১০ হাজার। এসব ফার্মেসির বাইরে প্রায় ১৬ হাজার ফার্মেসি কোন অনুমোদন ছাড়া চলছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা। ঔষধ প্রশাসন সিলেট, সুনামগঞ্জ ও মৌলভীবাজার অফিস অনুমোদনহীন ফার্মেসির সংখ্যা সম্পর্কে নির্দিষ্ট করে কিছুই বলতে না পারলেও কেমিস্টস এন্ড ড্রাগিস্টস সমিতি ও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, সুনামগঞ্জে অনুমোদিত ফার্মেসি প্রায় ১ হাজার ৯০০। সেখানে অনুমোদনহীন ফার্মেসি প্রায় ২ হাজার ৩০০। হবিগঞ্জে বৈধ ১ হাজার ৭০০ ফার্মেসির বিপরীতে অনুমোদনহীন প্রায় ৩ হাজার ফার্মেসি রয়েছে। মৌলভীবাজারে অনুমোদিত ২ হাজার ৪০০ ফার্মেসির বিপরীতে অনুমোদনহীন ফার্মেসি প্রায় ৫০০। সিলেটে অনুমোদনহীন ফার্মেসি সংখ্যা লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফার্মেসির প্রায় দ্বিগুণ। সিলেটে সবমিলিয়ে প্রায় ১০ হাজার ফার্মেসি রয়েছে। এর মধ্যে লাইসেন্সপ্রাপ্ত ফার্মেসি রয়েছে ৪ হাজার ৫০০। বাকি ৫ হাজার ৫০০ ফার্মেসি অনুমোদনহীন। বাংলাদেশ ড্রাগ রুল অনুযায়ী এসব অনুমোদনহীন ফার্মেসিতে ওষধ মজুদ, প্রদর্শন ও বিক্রি শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

এই ব্যবসার সাথে সংশ্লিষ্ট সিলেটের এক ব্যবসায়ী জানান, প্রথমে বলা হয় আগে শুরু করেন, পরে লাইসেন্সের জন্য আবেদন করবেন। পরে দেখা যায়, লাইসেন্সের জন্য আবেদন করলেও টাকা না দিলে লাইসেন্স মেলে না। অনেকে ১০/১২ বছর থেকে ব্যবসা করছেন তাদের লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে না ; কিন্তু যারা সম্প্রতি আবেদন করেছেন তারা লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছেন টাকার বিনিময়ে। সিলেট ড্রাগ অফিসের এক কর্মচারী লাইসেন্স প্রত্যাশীদের সাথে দরদাম করেন বলে তার অভিযোগ।

Manual4 Ad Code

অপরদিকে, সরকারি আইন অনুযায়ী প্রথমে দোকান প্রস্তুত ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র সজ্জিত করতে হয়। কিন্তু, এসময়ে ঔষধ বিক্রি করা যাবে না। আবেদনের পরে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা পরিদর্শন শেষে অনুমোদন দিলেই কেবল ফার্মেসিতে ঔষধ ক্রয়-বিক্রয় শুরু হতে পারে। সাধারণত ফার্মেসি স্থাপন করেই অনুমোদন নেয়ার পূর্বেই ঔষধ ক্রয়-বিক্রয় শুরু করে দেয়া হয় বলে জানান এক কর্মকর্তা।

সিলেট কেমিস্টস এন্ড ড্রাগিস্টস সমিতির সিনিয়র সহ-সভাপতি এটিএম মোশাহিদ উদ্দিন বলেন, ‘১৯৪০ সালের ড্রাগ এক্ট, ১৯৮২ সালের ঔষধ নীতিতে স্পষ্ট বলা আছে, ড্রাগ লাইসেন্সবিহীন দোকানে ঔষধ কোম্পানি ঔষধ সরবরাহ করতে পারবে না। কিন্তু অনেক লাইসেন্সবিহীন দোকানে ঔষধ কোম্পানিগুলো ঔষধ সরবরাহ করছে।’

‘একটি ফার্মেসির অনুমোদন নিতে হলে নানা প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। আবার ফার্মেসিগুলো পরবর্তীতে সঠিকভাবে অনুমোদনের শর্ত পালন করছে কি-না ঔষধ প্রশাসন তা পর্যবেক্ষণ করে উল্লেখ করে সিলেট কেমিস্টস এন্ড ড্রাগিস্টস সমিতির সভাপতি ময়নুল হক চৌধুরী বলেন, অনেক ফার্মেসি দীর্ঘদিন থেকে সরকারের নির্দেশমতো মান রক্ষা করে ফার্মেসি পরিচালনা করছে। কিন্তু দেখা যায়, নতুন ফার্মেসি খুলেই অনেকে লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু দীর্ঘদিন থেকে ফার্মেসি পরিচালনাকারীদের লাইসেন্স দেয়া হচ্ছে না। যারা সরকারের বিধিবিধান মেনে ফার্মেসি পরিচালনা করে আসেছে; তাদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে লাইসেন্স প্রদান করে বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ করে দেয়ার দাবি জানান তিনি।

সুনামগঞ্জ জেলা ড্রাগ সুপার মো. সিরাজ উদ্দিন ৬ মাস হয়েছে এসেছেন জানিয়ে বলেন, তাদের নিয়মিত তদারকি চলছে। অনুমোদনহীন ফার্মেসি খুব বেশি হবে না। তবে কেমিস্টস এন্ড ড্রাগিস্টস সমিতি এসব ব্যাপারে তথ্য রাখে। মৌলভীবাজার জেলা ড্রাগ সুপার সিরাজাম মুনিরা জানান, তিনি নিয়মিত ফিল্ড ভিজিট করছেন। যাদের লাইসেন্স নেই; তাদের সতর্ক করে আসছেন। ৩০ দিনের মধ্যে লাইসেন্স করে নিতে বলছেন। এ ব্যাপারে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে উল্লেখ করে পরবর্তীতে লাইসেন্সবিহীন পেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা জানিয়ে দিচ্ছেন।

সিলেটে যোগদান করেছেন এক মাসও হয়নি; তাই পূর্বের বিষয়ে তিনি কোন কথা বলতে চান না উল্লেখ করে ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের সিলেট ও হবিগঞ্জের দায়িত্বে থাকা সিলেটের ড্রাগ সুপার মো. মেহেদী হাসান বলেন, যারা অনুমোদন না নিয়ে ফার্মেসি পরিচালনা করছেন; তাদের অবিলম্বে ফার্মেসির লাইসেন্স গ্রহণ করে বৈধভাবে ফার্মেসি পরিচালনা করতে হবে। তিনি ফার্মেসির মালিকদের সরাসরি অফিসে তাঁর সাথে যোগাযোগ করার আহবান জানিয়ে বলেন, ফার্মেসি ব্যবসা যারা শুরু করবেন; তারা প্রায় সময় সরাসরি অফিসে না এসে লোক ধরেন। এতে তারা বিভ্রান্ত হন এবং দালালের খপ্পরে পড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হন। একসময় ড্রাগ লাইসেন্স অনেক কঠিন ছিল। এখন সরকার বিষয়টি সহজ করে দিয়েছেন। তিনি সবাইকে সরাসরি যোগাযোগ করে দ্রুত লাইসেন্স করে বৈধভাবে ফার্মেসি পরিচালনার অনুরোধ জানান। অন্যথায় ঔষধ প্রশাসন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানান তিনি।

Manual5 Ad Code

বিষয়টি উদ্বেগজনক উল্লেখ করে স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, কোন ধরনের দায় দায়িত্ব ও বাধ্যবাধকতা ছাড়াই চলছে বিশাল সংখ্যক অনুমোদনহীন ফার্মেসি। সঠিক পর্যবেক্ষণ, পরিদর্শন ও আইনের প্রয়োগ হচ্ছে না বলেই এমন অবস্থা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তারা। স্থানীয়রা বলেন, সঠিকভাবে ঔষধ সংরক্ষণ ও বিক্রি এবং মান রক্ষার বিষয়টি অধিক গুরুত্ব দেয়া উচিত। অন্যথায় জীবন রক্ষার সাথে জড়িত ঔষধ, এক সময় সাধারণ মানুষের জন্য জীবন সংহারের কারণ হয়ে যাবে। এছাড়া, এসব অনুমোদনহীন ফার্মেসি থেকে সরকার রাজস্ব বঞ্চিত হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তারা।

সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন সিলেটের সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, বিষয়টি উদ্বেগজনক। তবে ঔষধ প্রশাসন লাইসেন্স প্রক্রিয়া সহজীকরণ, লাইসেন্স ছাড়া পরিচালিত ফার্মেসিগুলোকে দ্রুত লাইসেন্স করে দেয়ার সুযোগ তৈরি এবং মনিটরিং জোরদার করা গেলে এই অবস্থা দ্রুত কাটিয়ে উঠা যাবে বলে তার মন্তব্য।

সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. প্রেমানন্দ মন্ডল বলেন, বিষয়টি জনস্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে এ ব্যাপারে দ্রুত পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ করবেন বলে জানান এ স্বাস্থ্য কর্মকর্তা।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code