‘এক লাখে ৫ লাখ টাকার ঘর’ পাওয়ার আশায় নিঃস্ব

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual1 Ad Code

নিউজ ডেস্কঃ 

তিন শর্তে এক লাখ টাকা জমা দিলে মিলবে পাঁচ লাখ টাকার ঘর। আর ১০ হাজার টাকা দিলে পাওয়া যাবে একটি গভীর নলকূপ। তবে শুধু টাকা দিলেই চলবে না, পালন করতে হবে ধর্মকর্ম। তাহলেই এক শ দিনের মধ্যে ঘর নির্মাণের কাজ শুরু হয়ে যাবে।

এলাকায় আসা এক ‘হুজুরের’ এমন বয়ান ও বিনয়ী আচরণে মুগ্ধ হয়ে দরিদ্র মানুষজন ঘরের গরু-ছাগল বিক্রি করেছেন, মহাজনি সুদে ঋণ করে এনে টাকা দিয়েছেন। নিয়মিত ধর্মকর্মও পালন করেছেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ফল হয়নি। ঘর, নলকূপ পাওয়া তো দূরের কথা, সেই হুজুর এখন লাপাত্তা। তাঁর মুঠোফোনও বন্ধ। যাঁরা টাকা দিয়েছেন, তাঁদের এখন মাথায় হাত। টাকা ফেরত পেতে ভুক্তভোগীদের পক্ষ থেকে শেষমেশ আদালতে মামলা করা হয়েছে।

সুনামগঞ্জের বিশ্বম্ভরপুর ও তাহিরপুর উপজেলার কয়েকটি গ্রামের ৫০টির মতো পরিবার এমন প্রতারণার শিকার হয়েছে। এ ঘটনায় বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মিয়ারচর গ্রামের ফালান মিয়া (৩২) বাদী হয়ে গত ২০ সেপ্টেম্বর সুনামগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তিনজনের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের দায়িত্ব দিয়েছেন।

মামলার আসামিরা হলেন মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলার লইয়ারকুল গ্রামের আবদুল আজিজ আলহেলাল (৪০), তাঁর বোন আকলিমা আক্তার (৩৪) ও আকলিমার স্বামী রেনু মিয়া (৪৫)।

মামলার আরজি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আবদুল আজিজ আলহেলালের শ্বশুরবাড়ি তাহিরপুরের কলাগাঁও গ্রামে। এ কারণে ওই এলাকায় তাঁর নিয়মিত যাতায়াত ছিল। তাঁর ভায়রা এইচ এম ইসমাইল হোসেন একই এলাকার সুন্দর পাহাড়ি গ্রামের বাসিন্দা। তিনি বিশ্বম্ভরপুরের মিয়ারচর মাদ্রাসায় শিক্ষক হিসেবে কর্মরত এবং সেখানেই থাকেন। আলহেলাল সুনামগঞ্জে এলেই গ্রামের মানুষদের নিয়ে ধর্মীয় কথাবার্তা বলেন। তাঁর আচার–আচরণ ও বিনয় দেখে মানুষ তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হন। তিনি ভায়রার মাদ্রাসায় এসেও একইভাবে এলাকার লোকজনের মধ্যে ধর্মীয় বয়ান দিতেন। এতে এলাকার মানুষ তাঁর ভক্ত হয়ে যান।

শিক্ষক ইসমাইল হোসেন জানান, তাঁর ভায়রা আলহেলাল তিন বছর ধরে সুনামগঞ্জে নিয়মিত আসেন। তিনি নিজেকে পরহেজগার ও আলেম হিসেবে উপস্থাপন করেন। এ বছরের জানুয়ারি মাসে আলহেলাল জানান, ‘সাব আ সানাবিল সমাজকল্যাণ একাডেমি’ নামে তাঁর একটি সংগঠন আছে। ওই সংগঠনের মাধ্যমে অসহায়, দরিদ্র মানুষদের বেশ কিছু ঘর করে দেওয়া হবে। পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানির জন্য স্থাপন করা হবে নলকূপ। তিনি সুনামগঞ্জে কিছু ঘর ও নলকূপ দিতে চান। এরপর মিয়ারচর মাদ্রাসায় এলাকার কিছু লোককে নিয়ে বসেন তিনি। তাঁর কথা শুনে অনেকেই রাজি হয়ে টাকা জোগাড় করা শুরু করেন। প্রতিটি ঘরের জন্য এক লাখ এবং একটি নলকূপের জন্য ১০ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়। তবে ঘর ও নলকূপ পেতে হলে শুধু টাকা দিলেই হবে না, পালন করতে হবে তিনটি শর্ত। এগুলো হলো—সব ধরনের সুদমুক্ত থাকা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া এবং পর্দার বিধান মানা। হুজুরের এসব কথা শুনে মানুষ আরও আগ্রহী হয়ে ওঠেন।

ভুক্তভোগী কয়েকজন জানান, গত ফেব্রুয়ারি ও মার্চে বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মিয়ারচর, বাঘগাঁও, ছত্রিশ, আমড়িয়া, সিরাজপুর গ্রামের মানুষজন ঘর ও নলকূপের জন্য আলহেলালকে টাকা দেন। টাকা নেওয়ার সময় তিনি শর্তযুক্ত একটি কাগজ দিয়েছেন। কিন্তু তিন মাস পর যখন ঘরের কাজ শুরু হয় না, তখন মানুষজন ইসমাইল হোসেনকে ধরেন। ইসমাইল যোগাযোগ করেন আলহেলালের সঙ্গে। এরপর থেকে তিনি নানা টালবাহানা শুরু করেন।

Manual8 Ad Code

ইসমাইল হোসেন জানান, ‘আমার মাধ্যমে ঘর ও নলকূপের জন্য ১১ লাখ ৭০ হাজার টাকা নিয়েছেন আলহেলাল। এর বাইরে অনেকের কাছ থেকে টাকা নেওয়া হয়েছে বলে শুনেছি। কিন্তু আমি জানি না। সব মিলিয়ে আলহেলাল প্রতারণার মাধ্যমে সুনামগঞ্জের দুই এলাকার মানুষের কাছ থেকে ৩০-৪০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।’ ইসমাইল বলেন, ‘উনার প্রতারণাটা আমরা বুঝতে পারিনি। পরে উনার বোন এসেও বলেছে টাকা ফেরত দিবে। এখন উল্টো নানা হুমকিধমকি দিচ্ছে আমাদের। তাই বাধ্য হয়ে মামলা করেছি।’

মিয়ারচর গ্রামের বাসিন্দা স্থানীয় দক্ষিণ বাদাঘাট ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সাবেক চেয়ারম্যান তারা মিয়া বলেন, ‘যারা প্রতারণার শিকার হয়েছে, তারা অসহায়, দরিদ্র মানুষ। এখন আমাদের কাছে কান্নাকাটি করে। আমরাই বলেছি আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য। প্রশাসন উদ্যোগ নিলে তারা টাকা ফেরত পেতে পারে।’

Manual8 Ad Code

তাহিরপুর উপজেলার কলাগাঁও গ্রামের বাসিন্দা কবির আহমদ জানান, তাঁদের এলাকার অন্তত ছয়টি গ্রাম থেকে একইভাবে মানুষকে ঘর ও নলকূপ দেওয়ার কথা বলে টাকা নিয়েছেন আলহেলাল।

এ ব্যাপারে কথা বলার জন্য আবদুল আজিজ আলহেলালের সংগঠনের প্যাডে দেওয়া তাঁর চারটি মোবাইল নম্বরে যোগাযোগ করলে সব কটি বন্ধ পাওয়া যায়।

Manual2 Ad Code

পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার খালেদ-উজ-জামান সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, তাঁরা আদালত থেকে মামলাটি পেয়েছেন। পিবিআইয়ের একজন কর্মকর্তাকে মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছেন।

Manual3 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code