BengaliEnglishFrenchSpanish
শিশুশ্রম বন্ধে ব্যবস্থা নিন - BANGLANEWSUS.COM
  • ৮ই ফেব্রুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ


 

শিশুশ্রম বন্ধে ব্যবস্থা নিন

newsup
প্রকাশিত ডিসেম্বর ২১, ২০২১
শিশুশ্রম বন্ধে ব্যবস্থা নিন

আজকের তরুণ শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ। তারাই দেশের উজ্জ্বল নক্ষত্র। তাদের হাত ধরেই দেশ একদিন উন্নয়নের দিকে অগ্রসর হবে। কিন্তু তারাই আজ বিভিন্ন কারণে শিশুশ্রমের শিকার। যাদের হাতে বই, কলম থাকার কথা, আজ তাদের হাতে বোঝা।

শিশুদের কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করার একটি চেষ্টা চলেছে বিশ্বব্যাপী। বস্তুত একমাত্র শিক্ষা ও খেলাধুলা ছাড়া আর কোনো কাজই শিশুদের জন্য নিরাপদ বা স্বস্তিকর হতে পারে না। কিন্তু প্রতিদিন লাখ লাখ শিশু তাদের বাঁচার তাগিদে জীবনযুদ্ধে অবতীর্ণ হচ্ছে।

আমরা যুক্তরাষ্ট্রের দিকে লক্ষ্য করলে দেখতে পাই, সে দেশেও লক্ষ লক্ষ ছিন্নমূল অভুক্ত শিশুদের মিছিল দীর্ঘতর হচ্ছে। তাদের দেশের সাথে আমাদের দেশের একটাই তফাত- ওরা ওদের দেশের অভুক্ত, অসহায় শিশুদের জন্য নিয়মিত আশ্রয় ও খাদ্যের ব্যবস্থা করছে কিন্তু আমাদের দেশেও ধনী ও সামর্থ্যবান মানুষ থাকা সত্তে¡ও আমরা তা করছি না। আবার যতটুকু সামর্থ্য আছে তারও সদ্ব্যবহার হচ্ছে না। এনজিও সংস্থাগুলো যতই মুখে দারিদ্র্য বিমোচনের কথা বলুক তার বাস্তবায়ন তেমন একটা হচ্ছে না। এসব শিশুদের যে শুধু নিজেদের জন্য অন্য জোগাড় করতে হয় তাই নয়, বিভিন্ন কারণে পরিবারের সকল সদস্যদের গুরুভারও বহন করতে হয়। কারো পরিবারে বাবা-মা দুজনেই অসুস্থ, কারো পরিবারে তার জন্মের আগেই বাবা ছেড়ে চলে গেছে, কারো পরিবার তাকে একাই বহন করতে হয়। ক্ষুধার যন্ত্রণা কতোটা ভয়াবহ হতে পারে একমাত্র এই হতদরিদ্র শিশুদের চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না।

আমরা যতই নীতিমালা তৈরি করি না কেন, সেগুলো তাদের জীবনে তেমন কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। এ রকম হতদরিদ্র ঘরের শিশুদের বেঁচে থাকার জন্য কাজের দরকার। তা যেকোনো কাজই হোক না কেন। এক্ষেত্রে কোনো বাছবিচার বা মজুরি নিয়ে দরকষাকষির তাদের কাছে কোনো প্রশ্নই আসে না। সেই সুযোগে বহু শিশু বিভিন্ন দেশে পাচার হয়ে যায়। কিছু শিশু নিয়োজিত হয় ভিক্ষাবৃত্তি, মাদক পাচার, ছিনতাইসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কাজে। ব্যাপকভাবে বিভিন্ন নির্যাতন এমনকি যৌন হয়রানির শিকার হয়ে থাকে। আর কাজের কথায় যদি আসি বলা যায়, জাহাজ কাটা থেকে শুরু করে ঢালাই, ইটভাটা, বিভিন্ন কারখানা, বর্জ্য অপসারণ, গাড়ির হেলপার থেকে শুরু করে তৈরি মোটর গ্যারেজ পর্যন্ত কোথায় তারা নেই।
আমাদের মনে রাখতে হবে, ক্ষুধা ও দারিদ্র্য থাকলে শিশুশ্রমও থাকবে। আর শিশুশ্রম থাকলে তাতে কমবেশি ঝুঁকি থাকবেই, থাকবে নানা ধরনের বঞ্চনাও। তবে দারিদ্র্যের ভয়াবহতা কমানো না গেলে জনসচেতনতাও খুব একটা কাজে আসবে না। শিশুদের জন্য স্কুলে সাময়িকভাবে খাবার ব্যবস্থা করলেই যে সমস্যা মিটে যাবে তাও নয়। তার কারণ আগেই বলা হয়েছে, বহু শিশুকে তাদের পরিবারের সকল সদস্যের ভরণপোষণ করতে হয়।

প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, মহামারীর কারণে ২০২২ সাল সমাপ্ত হওয়ার আগেই বিশ্বব্যাপী অতিরিক্ত ৯০ লাখ শিশু শ্রমে নিযুক্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিস্থিতি অনুকরণে তৈরি একটি মডেলে (সিমিউলেশন মডেল) দেখা গেছে, এই সংখ্যাটি বেড়ে ৪ কোটি ৬০ লাখে পৌঁছতে পারে, যদি তাদের গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক সুরক্ষার আওতায় আনা না হয়।
কোভিড-১৯-এর কারণে বাড়তি অর্থনৈতিক চাপ এবং স্কুল বন্ধের কারণে ইতোমধ্যে শিশুশ্রমে নিযুক্ত শিশুদের হয়তো দৈনিক আরও দীর্ঘ সময় ধরে বা আরও খারাপ অবস্থার মধ্যে কাজ করতে হচ্ছে। অন্যদিকে ঝুঁকির মুখে থাকা পরিবারগুলোতে কাজ হারানো বা আয় কমে।যাওয়ার কারণে আরো অনেক শিশু হয়তো সবচেয়ে খারাপ ধরনের শিশুশ্রমে নিযুক্ত হতে বাধ্য হচ্ছে।

দেশে শিশুশ্রম নিষিদ্ধসহ সরকারের নানামুখী ইতিবাচক পদক্ষেপ সত্তে¡ও শিশুশ্রম কমছে না। বরং বাড়ছে। এ রকমই তথ্য-পরিসংখ্যান উঠে এসেছে ২৬৭টি শিশু সংগঠনের মোর্চা বাংলাদেশ শিশু অধিকার ফোরামের পরিবেশিত প্রতিবেদনে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ সমীক্ষা অনুযায়ী দেশে ১২ লাখ ৮০ হাজার শিশু এমনি ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। এসব শিশু প্রধানত কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে ছোট ছোট শিল্প-কারখানায়, লেদ মেশিনে, ইটভাটিতে, বিড়ি-সিগারেট তৈরিসহ নানা ক্ষেত্রে যেখানে শুধু উদয়াস্ত পরিশ্রমই নয়, সমূহ স্বাস্থ্য ঝুঁকিসহ নিরাপত্তা ঝুঁকিও বিদ্যমান। শিশু অধিকার ফোরামের তথ্যানুযায়ী শুধু গৃহকর্মেই নিয়োজিত শিশু শ্রমিকের সংখ্যা চার লাখ ২১ হাজার। এই শ্রমও এই কারণে ঝুঁকিপূর্ণ যে, অধিকাংশ শিশুর গৃহকর্মের কাজেও কমপক্ষে ১৫-১৬ ঘণ্টা কাজ করতে হয় এক নাগাড়ে। সেই অনুপাতে না আছে পেটপুরে খাবার ও পুষ্টি। বরং প্রতিনিয়ত জোটে বকাঝকা-লাঞ্ছনা-গঞ্জনা মারধর। নির্মম অত্যাচারে একাধিক মৃত্যুর খবরও আছে। এর পাশাপাশি নারী গৃহকর্মীদের ক্ষেত্রে রয়েছে অহরহ যৌন নিপীড়ন-নির্যাতনসহ হত্যার ঘটনা। অনেক ক্ষেত্রে মামলা-মোকদ্দমা হলেও সুবিচার নিশ্চিত হয় না। শিশুশ্রম নিরসনে আমাদের সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাংলাদেশ শ্রম আইন, ২০০৬-এ নির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছে, কারা শিশু। এখানে বলা আছে, ১৪ বছরের নিচে কোনো শিশুকে কাজে নেয়া যাবে না। ১৪ থেকে ১৮ বছর পর্যন্ত কাজে নেয়া যাবে, তবে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নেয়া যাবে না।
আমাদের শিশুশ্রম নীতি, ২০১০ আছে, এটা বাস্তবায়ন করার জন্য বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করেছি। বাসায় যারা কাজ করে, তাদের কল্যাণের জন্য একটা নীতিমালা করা হয়েছে।
শিশুদের জন্য সব কাজই ঝুঁকিপূর্ণ। তারপরও ৩৮টি কাজকে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এই ৩৮টি কাজে শিশুদের কোনোভাবেই নিয়োগ করা যাবে না।

শিশুশ্রম নিরসনে জাতিসংঘ প্রণীত সব সনদে আমাদের সরকার অনুস্বাক্ষর করেছে। শিশুশ্রম নিরসনের জন্য কতগুলো পদক্ষেপ ঠিক করেছি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে নীতির প্রয়োগ, শিক্ষা, পুষ্টি ও স্বাস্থ্য, সামাজিক সচেতনতা, গবেষণা, প্রশিক্ষণ ইত্যাদি।
বাংলাদেশে শিশুশ্রম আছে তবে ধীরে ধীরে কমছে, এটাই হলো বাস্তবতা। এসডিজিতে ২০২৫ সালের মধ্যে শিশুশ্রম নিরসনের লক্ষ্যমাত্রা আছে। এ লক্ষ্য অর্জন করতে হলে শিশুশ্রম নিরসনে জাতীয় কর্মপরিকল্পনাকে জোরদার করতে হবে।
ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুশ্রম বন্ধ না হওয়ার মূল কারণ আসলে দারিদ্র্য। কেননা অনেক শিশু শ্রমিকের আয়েই চলে তাদের পরিবার। অভাবের তাড়নায় নিরুপায় হয়ে শিশুরা এসব কাজ করছে। সস্তা শ্রমের কারণেও মালিকপক্ষ সুযোগ নিচ্ছে। এমতাবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ-অঝুঁকিপূর্ণ উভয় শ্রমে শিশুদের নিরস্ত করা কঠিন বৈকি। দেশে যতদিন দারিদ্র্য ও বেকারত্ব থাকবে ততদিন এসব কাজে শিশুদের বিরত রাখা সম্ভব হবে না। এজন্য সেসব শিশুর অভিভাবকের কর্মসংস্থানসহ জীবনমানের উন্নয়ন প্রয়োজন। ক্ষেত্রবিশেষে বিধবা বা দুস্থ ভাতার মতো ঐ শিশুদের জন্যও বিশেষ ভাতা চালু করার চিন্তা-ভাবনা করা যেতে পারে।

জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে তাঁর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার রূপকল্প-২০৪১ আলোকে উন্নত-সমৃদ্ধ দেশ গঠনে শিল্পোন্নয়ন এবং এসডিজির লক্ষ্যমাত্রা পূরণে শ্রমিক-মালিকের সুসম্পর্ক, তাদের অধিকার, পেশাগত নিরাপত্তা ও সুস্থতা নিশ্চিতকরণের কোনো বিকল্প নেই। দেশের এ সুবিশাল শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের যথাযোগ্য মর্যাদা, সম্মান ও অধিকার নিশ্চিতকরণ, শোভন কর্মপরিবেশ, শিশুশ্রম নিরসন, ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ, শ্রমিকমালিকের ঐক্যের মধ্য দিয়ে জাতির পিতার জন্মশতবার্ষিকী “মুজিববর্ষ-১০০”তে তার স্বপ্নের সোনার বাংলা গড়াই আমাদের অঙ্গীকার।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।