তেলের মূল্যবৃদ্ধি, রেমিট্যান্স ও আমাদের গল্প

লেখক:
প্রকাশ: ৪ years ago

Manual4 Ad Code
রুবাইয়াত সাইমুম চৌধুরী :: জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে প্রায় ৫১ শতাংশ। তেলের দাম বাড়ানোর জন্য অনেক যুক্তি দেয়া হচ্ছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, ডলারের দামের ওঠানামা, মূল্যস্ফীতি, আইএমএফের শর্ত, মুসলমানদের প্রাণের দেশ সৌদি আরবের এশিয়ার ক্রেতা দেশের জন্য তেলের রেকর্ড পরিমাণ মূল্যবৃদ্ধি, ব্যবসায়ীদের চাপ—সব যুক্তি দেখানো যায়।
সমস্যা হলো যুক্তিগুলো ঠিক আসলে শক্তিশালী হয় না। বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমেছে। ব্যারেলপ্রতি দাম ৮৯-১২০ ডলার। প্রায় ২৫ শতাংশ কমেছে দাম। আমরা দাম বাড়িয়েছি ৫১ শতাংশ। করোনার সময় যখন তেলের দাম কমে ঋণাত্মকে চলে গিয়েছিল, তখন কিন্তু আমরা দাম কমাইনি। বলা হয়েছিল, এত বছরের ভর্তুকির জন্য যে টাকা ক্ষতি হয়েছিল কম দামে তেল কিনে প্রচলিত দামে বিক্রি করে সে ক্ষতি পুষিয়ে নেয়া হবে। আমরা মেনে নিয়েছি। মেনে না নিয়ে আমাদের উপায়ও ছিল না। যদিও ভর্তুকিকে ক্ষতি হিসেবে দেখাটা তাত্ত্বিকভাবে ঠিক না।
এখন সরকারি হিসাবে প্রায় ৭ দশমিক ৫ শতাংশ মূল্যস্ফীতি। অনেকে বলেন, বেসরকারি হিসাবে মূল্যস্ফীতি অনেক বেশি প্রায় ১৮ শতাংশ। এ অবস্থায় তেলের দাম ৫১ শতাংশ বাড়ানো যৌক্তিক করতে চাওয়াটাও অযৌক্তিক।
তেলের দাম বাড়ার আগে আমাদের আরো একটি সমস্যা চলছিল। সেটা হলো লেনদেনের। সহজ করে বললে আমরা রফতানি করে আর রেমিট্যান্সের মাধ্যমে যে টাকা আয় করি, তার চেয়ে বেশি আমদানি আর ঋণ শোধে ব্যয় করি। এর অর্থ আমাদের টাকা (ডলার) কমতে থাকছে। এটা থেকেই আসলে আমাদের সব সমস্যার শুরু। আয় ঠিক রাখতে পারলে আমাদের মূল্যস্ফীতি এমন হতো না।
এখন কথা হলো আয় ঠিক রাখার জন্য আমরা কী করতে পারতাম বা পারি?
ডলার আয় করার দুটি রাস্তা আমাদের। ১. রফতানি বাড়ানো ২. রেমিট্যান্স বাড়ানো। রফতানি বাড়ানোর জন্য আমরা বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছি। যেমন ইপিজেড স্থাপন, গ্যাসে ভর্তুকি, কর রেয়াত, সহজ শর্তে ঋণ প্রদান—এমন বেশকিছু পদক্ষেপ। এর কারণে আমাদের রফতানিও রেকর্ড ৫০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছুঁয়েছে।
কিন্তু সমস্যা হলো, আমরা রফতানি করতেও কাঁচামাল আমদানি করি। এ কাঁচামালের দাম বাড়ার কারণে আমাদের রফতানিতে লাভ কমে গিয়েছে। তাই দেখা যাচ্ছে, রেকর্ড ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি করেও আমরা ডলার সংকটে আছি। রেডিমেড গার্মেন্টসের পণ্য রফতানি করতে কাঁচামাল আমদানিতে আমাদের রিজার্ভের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। তাই আমরা যদি ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ ঠিক না করে শুধু রফতানি বাড়াই তাহলেও আমাদের ডলার রিজার্ভ যে খুব ভালো অবস্থায় যাবে, তা বলা যাবে না।
ডলার আয়ের দ্বিতীয় উৎস হলো রেমিট্যান্স। আর এ রেমিট্যান্স মূলত পাঠান আমাদের শ্রমিকরা। তারাই আমাদের আয়ের একটা স্তম্ভ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, জুলাই মাসে বাংলাদেশে রেকর্ড ২ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স আসে। এতে আমরা অনেক খুশি। কিন্তু সত্য কথা বলতে আমি তেমন খুশি না।
কারণ, আমাদের প্রায় ১ কোটি শ্রমিক বিভিন্ন দেশে কাজ করে ১ মাসে প্রায় ২ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন। অথচ সুন্দর পিচাই নামের একজন মানুষ একা বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার আয় করেন। সত্য নাদাল প্রায় ৫০ মিলিয়ন ডলার আয় করেন। ১ কোটি মানুষ মিলে রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, অমানুষিক পরিশ্রম করে আমরা এ দুই মানুষের চেয়ে মাত্র ১৬ গুণ বেশি ডলার আয় করি। ১ কোটি মানুষ এবং সেসব মানুষের সক্ষমতার কী নিদারুণ অপচয়।
আমরা স্বাধীনতার ৫০ বছর পরও শ্রমিকই রফতানি করছি। সিইও রফতানি করতে পারছি না। এমনকি যথেষ্ট পরিমাণে ডাক্তার, নার্স, প্রকৌশলী, শিক্ষক বা এক্সিকিউটিভও রফতানি করতে পারছি না। আমাদের ডলার আয় ভালোভাবে না বাড়াতে পারার এটিও একটি কারণ। এটা যে শুধু ডলার আয় বাড়ানো বাধাগ্রস্ত করছে, তা না বরং এটা ডলার ব্যয়ও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ব্যাপারটা একটু উদাহরণ দিয়ে বলা যাক। আমরা আমাদের শিক্ষায় যথেষ্ট বিনিয়োগ করিনি। এর ফলে আমরা দক্ষ জনশক্তি তৈরি করতে পারিনি। তাতে আমাদের নিজেদের স্বাস্থ্য এবং প্রকৌশল খাতে বিদেশী জনশক্তির ওপর যেমন নির্ভর করতে হয়, তেমনি মেডিকেল ট্যুরিজম এবং শিক্ষা খাতের জন্যও অতিরিক্ত ডলার খরচ করতে হয়। অথচ দক্ষ জনশক্তি তৈরিতে আমাদের কাঁচামালের (মানুষ) অভাব নেই। শুধু অভাব সঠিক বিনিয়োগ এবং সদিচ্ছার।
২০১২ সালে শুরু হওয়া গাজীপুর-ঢাকা বিমানবন্দরের বিআরটি লাইনের কাজ এখনো শেষ হয়নি। বাজেট ২০৩৭ দশমিক ৯ কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে ৪২৬৮ দশমিক ৩ কোটি টাকা করা হয়েছে। এ ১০ বছরে এ অবকাঠামো আমাদের ১ ডলারও আয় দেয়নি। অথচ এ ১০ বছরে আমরা যদি শুধু সেক্টর ঠিক করে যেমন—কুক, নার্স এবং ট্যুরিজকর্মীদের ট্রেনিংয়ের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকা এবং যেসব দেশে তাদের আমরা পাঠাতে চাই, সেসব দেশে ফরওয়ার্ড লিংকেজের জন্য ১ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ রাখতাম এবং সে টাকা সঠিকভাবে খরচ করে কাজটি ঠিকভাবে করতাম তাহলে মাসে কম করে ১ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স বাড়ত বাংলাদেশের।
এর মানে কি আমি অবকাঠামোগত উন্নয়নের বিপক্ষে? উত্তর হলো না। অবশ্যই আমাদের অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে হবে। কিন্তু সে উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে যাদের জন্য এ অবকাঠামো (জনগণ) তাদেরও উন্নয়ন করতে হবে। তা না হলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের ফলে আমাদের জিডিপিতে কনজামশন বেজড যে উচ্চলম্ফ হয়েছে তা বুমেরাং হয়ে আসবে।
বৈশ্বিক উত্তাল সময়ের ধাক্কায় আমরা পুরোপুরি গা-বাঁচিয়ে চলতে পারব না। এটাই সত্য। তবে আমাদের সরকারকে এটাও মাথায় রাখতে হবে, উত্তাল ঝড়ের ধাক্কা যেনো জনগণের গায়ে কম লাগে, এটাও তাদের দায়িত্ব। ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর বৃটেনের মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের ব্যাপারে সতর্ক করে বলে দিয়েছেন, তাদের সামনে মহাবিপদ অপেক্ষা করছে। তাদের প্রস্তুত হতে হবে।
আমাদের দেশের মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের জন্য এমন কোনো ঘোষণা নেই কোথাও। তেলের দাম বাড়ানোর, পূর্বঘোষণা এমনকি ধারণাও দেয়া হয়নি। প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে দাম বাড়ানোর পর আক্ষরিক অর্থে মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্তের মানুষ শংকিত। কারণ তারা ভাবছে, এই যে তেলের দাম বাড়ানো হলো, এর পরের ধাপ এর সঙ্গে সম্পর্কিত সবকিছুর দাম বাড়া। আমার নিজের হিসাবে আগামী ৩ সপ্তাহের মধ্যে সেসব জিনিসের দাম ৪০-১০০ শতাংশ বেড়ে যাবে। সহজ কথায় অনেক কিছুর দাম দ্বিগুণ হয়ে যাবে। এটা আমি যেমন ভাবছি, বেশির ভাগ মানুষও ভাবছে। আর অর্থনীতির তত্ত্ব থেকে আমরা জানি, অর্থনীতিতে বেশির ভাগ মানুষ যা ভাবে সাধারণত সেটাই হয়।
এখন সরকারের উচিত, দেশের অর্থনীতির সঠিক চিত্র জনগণের সামনে তুলে ধরা। সেটা ভালো হতে পারে, খারাপ হতে পারে কিংবা অতি খারাপ হতে পারে। কিন্তু যেটাই হোক, সেটা জানাতে হবে জনগণকে। এরপর জনগণকে সঙ্গে নিয়েই সংকট মোকাবেলা করতে হবে। শুধু দুর্নীতি ৫০ শতাংশ কমিয়ে আনতে পারলেই জনগণের ১০০ শতাংশ সহযোগিতা পাওয়া যাবে, তা নিশ্চিত। আমাদের ব্যক্তিগতভাবে এবং রাষ্ট্রীয়ভাবে কৃচ্ছ্রসাধনে যেতে হবে, তা বোঝা যাচ্ছে। তবে রাষ্ট্র যদি নিজে এক্ষেত্রে পথ না দেখায়, তাহলে ব্যক্তিগত কৃচ্ছ্রসাধন আসলে তেমন কোনো ফল দেবে না।
মানুষের আয় না বাড়িয়ে, জীবনের দাম কমিয়ে বাকি সবকিছুর দাম আকাশে তুলে দিয়ে—না মানুষ বাঁচে, না অর্থনীতি, না দেশ। আমরা চাই, সবকিছুই বাঁচুক। ভালোভাবে বাঁচুক।
রুবাইয়াত সাইমুম চৌধুরী: সহকারী অধ্যাপক, ফাইন্যান্স বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual8 Ad Code