BengaliEnglishFrenchSpanish
উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে ‘ছয়-নয়’ সুদের হার ধরে রাখা কেন? - BANGLANEWSUS.COM
  • ৩০শে জানুয়ারি, ২০২৩ খ্রিস্টাব্দ


 

উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে ‘ছয়-নয়’ সুদের হার ধরে রাখা কেন?

newsup
প্রকাশিত সেপ্টেম্বর ২০, ২০২২
উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে ‘ছয়-নয়’ সুদের হার ধরে রাখা কেন?

ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ : বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এর কিছু অভ্যন্তরীণ আর কিছু বাইরে থেকে আমদানীকৃত, যার সূত্রপাত রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ ও করোনা। বড় চ্যালেঞ্জ হলো মূল্যস্ফীতি ও টাকার অবমূল্যায়ন। ডলারের চাহিদা বেড়ে যাওয়া এবং জোগান কমে যাওয়ায় রিজার্ভের ওপর চাপ বেড়েছে। ডলার সংকট নিরসনে অবশ্য বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। বিলাসপণ্য আমদানি নিরুৎসাহিতকরণ, টাকার অবমূল্যায়ন ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও নানা ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে। এসব ব্যবস্থার প্রভাব এখনো মুদ্রাবাজার ও মূল্যস্ফীতির ওপর পড়েনি। মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, টাকার দরপতনও অব্যাহত রয়েছে।
আমরা সবাই জানি, মূল্যস্ফীতির সঙ্গে টাকার সরবরাহের একটি যোগসূত্র আছে। বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি অর্থবছরের জন্য যে মুদ্রানীতি ঘোষণা করেছে তার একটি বড় লক্ষ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে মুদ্রানীতিকে সংকোচনমূলক করা হয়েছে। অর্থাৎ বাজারে মুদ্রার সরবরাহ কমানোর জন্য নীতি সুদের হার বাড়ানো থেকে শুরু করে বেশকিছু পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। রেপো রেট বাড়ানো হয়েছে যাতে বেসরকারি খাতে মুদ্রার সরবরাহ কমে। এর অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বার্তা দেয়া হচ্ছে মুদ্রা সরবরাহ কমানো হবে। ঋণের প্রবাহ যদি বেশি এবং তা অনুৎপাদনশীল খাতে সম্প্রসারিত হয় তাহলে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। বাংলাদেশ ব্যাংক অত্যাবশ্যকীয় পণ্য ছাড়া অন্যান্য পণ্য আমদানি নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগ নিয়েছে। চাল আমদানিতে সরকার শুল্ক প্রত্যাহার করেছে, বাংলাদেশ ব্যাংকও বৈদেশিক মুদ্রার সংস্থান করবে বলে ঘোষণা দিয়েছে। এসব পদক্ষেপ ইতিবাচক। তবে এর সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি দিতে হবে যাতে বেসরকারি খাতের ঋণ উৎপাদনশীল খাতে যায়। সস্তায় ঋণ পেলে অনুৎপাদনশীল খাতে তা চলে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংকের তদারকিও জোরদার করতে হবে। কটেজ, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পগুলোয় ঋণের প্রবাহ বাড়ানোর দিকে দৃষ্টি দিতে হবে। কারণ এখানে কর্মসংস্থান হয় বেশি এবং বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের সবচেয়ে বড় শিকার তারা। বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতিটি অনেকটাই সরবরাহজনিত। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার প্রভাব দেশের বাজারে পড়েছে। দেশের বাজারে আমদানিনির্ভর পণ্যর দাম অত্যধিক বেড়েছে। এর সঙ্গে সঙ্গে সম্পূরক ও পরিপূরক পণ্যের দামও বেড়েছে। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদের কিছুটা কারসাজির বিষয়টিও উড়িয়ে দেয়া যাবে না। মেগা প্রকল্পগুলোয় মূল্যস্ফীতির নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়ে যাওয়ায় মেগা প্রকল্পগুলোর ব্যয়ও বেড়ে যাবে। বর্তমান সংকট মোকাবেলায় সরকার কিছু প্রকল্প স্থগিতও রেখেছে। পাশাপাশি গুরুত্ব বিবেচনায় প্রকল্পের তালিকা করা হয়েছে—এসবই ভালো পদক্ষেপ।
ডলার সংকটের প্রথম দিকে সরকার বৈদেশিক মুদ্রাবাজার নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। কিন্তু এ বাজার আগে চাহিদা ও জোগানের ওপর নির্ভরশীল ছিল, সেটি ছিল ম্যানেজড ফ্লোটিং। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক আবার টাকার মূল্যমান বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়ার কথা বলেছে। কিন্তু এখনো কিছু নিয়ন্ত্রণ রাখা হচ্ছে বটে তবে তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সুদের হারের ইতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে সুদের হার ক্যাপ করে আটকিয়ে রাখা হয়েছে। করোনার শুরুর দিকে বাংলাদেশ ব্যাংক ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ সুবিধা প্রদানের কথা বলে ছয়-নয় শতাংশ সুদের হার নির্ধারণ করে দেয়। এটি ছিল বড় ধরনের ভুল। কারণ বিনিয়োগে সুদের হারের ভূমিকা খুবই নগণ্য। অন্যান্য বিষয় যেমন—মজুরি, খাজনা, জমির মূল্য, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, ঘুস-দুর্নীতি, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ইত্যাদির ভূমিকা অনেক বেশি। বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে হলে এসব বিষয়ে দৃষ্টি দিতে হবে। ছয়-নয় সুদের হার নির্ধারণে বিনিয়োগ খুব বেশি বাড়েনি। সুদের হার যখন ১২-১৪ শতাংশ ছিল তখন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আরো বেশি হয়েছে। ফলে সুদের হার কম থাকলেই বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়বে, বিষয়টি তেমন নয়। যেসব পণ্যের চাহিদা বাজারে রয়েছে সেখানে ঋণের সুদের হার ১২-১৪ শতাংশ হলেও বিনিয়োগ লাভজনক হবে। কিন্তু অনুৎপাদনশীল খাতে এবং যেসব পণ্যের চাহিদা নেই ঋণ সেখানে গেলে ৯ শতাংশ সুদেও সেটি লাভজনক করা যাবে না। এতে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে উঠবে।
প্রথমেই আলোচনা করা যাক আমানতের সুদের হার নিয়ে, বাংলাদেশ ব্যাংক সেটির সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দিয়েছে ৬ শতাংশ। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশের বেশি। ফলে আমানতের সুদের হার নির্ধারণ করে দিয়ে সরকার সঞ্চয়কারীদের শাস্তি প্রদান করছে। বিশ্বের কোনো দেশেই এমন ব্যবস্থা নেই। মানুষ কথা বলছে না ভয়ে। এর মাধ্যমে মানুষকে বার্তা দেয়া হচ্ছে ব্যাংকে সঞ্চয় করলে কম রিটার্ন পাবেন। বর্তমানে মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় মানুষ অর্থ হারাচ্ছে। এটি কোনো যুক্তিতেই গ্রহণযোগ্য নয়। এর প্রভাবও পড়েছে সঞ্চয়ের ওপর। ব্যাংকের আমানতপ্রবাহ কমে গিয়েছে। শুধু তাই নয়, সঞ্চয়পত্রের বিক্রিও কমে গেছে। মূল কথা, যেসব ব্যাংকের অর্থ বেশি প্রয়োজন তারা বেশি সুদের হার প্রদান করবে আর যার অর্থ দরকার নেই সে কম সুদে অর্থ সংগ্রহ করবে। এটি বাজার অর্থনীতির কথা। সুদের হার নির্ধারণ করে দেয়ার আগে এ ব্যবস্থাই ছিল বাংলাদেশে।
সঞ্চয়ের বিকল্প নেই। দেশীয় সঞ্চয় ও সম্পদ মবিলাইজ না করলে বিনিয়োগ কীভাবে বাড়বে? এমনিতেই বেসরকারি খাতের বিনিয়োগ জিডিপির ২৮-২৯ শতাংশে আটকে রয়েছে, এটিকে ৩২-৩৪ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। আমরা কি সবসময় বাইরের থেকে ঋণ ও সহায়তা নিয়ে বিনিয়োগ করতে পারব? বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে স্থানীয় সঞ্চয়ও বাড়াতে হবে। আমাদের প্রতি বছর বাজেট ঘাটতি থাকে, সেটি মেটানো হয় স্থানীয় সঞ্চয় ও বৈদেশিক ঋণ থেকে। বৈদেশিক ঋণ যে সবসময় ভালো ফল দেবে, তাও নয়। এক্ষেত্রে শ্রীলংকা ও পাকিস্তানের উদাহরণ আমাদের সামনে রয়েছে। অনেক আগে দক্ষিণ আফ্রিকা, আর্জেন্টিনার উদাহরণও রয়েছে। দেশগুলো বৈদেশিক ঋণ নিয়ে তা পরিশোধে ব্যর্থ হয়েছিল। এর ফলে দেশগুলোর অর্থনীতি বড় বিপর্যয়ের মুখে পড়ে। তাই বাংলাদেশকে সতর্ক হতে হবে। অতিমাত্রায় বৈদেশিক ঋণনির্ভর না হয়ে দেশজ সঞ্চয় বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দিতে হবে। উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে যখন বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রার সরবরাহ কমাতে চাইছে, সেখানে সুদের হার মূল্যস্ফীতির নিচে বেঁধে রাখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। এতে অর্থনীতির স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হতে বাধ্য।
এবার আসি ঋণের সুদের হার প্রসঙ্গে। ঋণ সস্তা করলেই বিনিয়োগ বাড়ে এমন কোনো উদাহরণ আমাদের সামনে নেই, বরং এতে অর্থের প্রবাহ অনুৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হওয়ার প্রবণতা বাড়ে। এতে ব্যাংকে খেলাপি ঋণও বেড়ে উঠতে দেখা যায়। ব্যবসায়ীরা বলে থাকেন উচ্চ সুদে তারা প্রতিযোগিতায় টিকতে পারবেন না। সাড়ে ৭ শতাংশ মূল্যস্ফীতির মধ্যে ঋণের প্রকৃত সুদের হার হলো মাত্র দেড় শতাংশ। ফলে মানুষ অধিক ঋণ নেবে এবং এটি অনুৎপাদনশীল খাতে প্রবাহিত হবে। আমাদের অতীত অভিজ্ঞতা কিন্তু তাই বলে। আগামী বছর কেউ যদি ঋণের সুদ দিতে চায়, তবে তাকে প্রকৃত অর্থে দেড় থেকে দুই শতাংশ সুদ দিতে হবে। এটি কি গ্রহণযোগ্য? একদিকে আমানতকারী বঞ্চিত হচ্ছে, অন্যদিকে ঋণ গ্রহণকারী মাত্রাতিরিক্ত সুবিধা পাচ্ছে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়। সুদের হার নির্ধারণে সরকার ব্যবসায়ীদের অযাচিত সুবিধা দিচ্ছে। এটি ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ী বা উদ্যোক্তারা পাচ্ছেন না। কারণ ঋণের বেশির ভাগই বড় ব্যবসায়ীদের কাছেই যায়।
অনেকে বলে থাকেন ৯ শতাংশের বেশি ঋণের সুদ হলে উদ্যোক্তারা অর্থ নেবেন না। এক্ষেত্রে প্রশ্ন, ব্যবসায় লাভ না হলে তিনি কেন সেখানে বিনিয়োগ করবেন। যেসব পণ্যের চাহিদা বেশি, নতুন ক্ষেত্রে যদি সম্ভাবনা থাকে তবে ৯ শতাংশের বেশি সুদ নিয়ে কেন লাভ করা যাবে না। আর লাভ না হলে কেন সেখানে অযথা বিনিয়োগ করা হবে? এটি কোনো টেকসই সমাধানও নয়। ক্ষুদ্রঋণের সুদের হার ২০-২৪ শতাংশ (যদিও এটি কাক্ষিত নয়) হলেও সেটি দিয়ে মানুষ মুনাফা করছে। তাহলে বড় বিনিয়োগকারীরা কেন পারবেন না। ঋণের সুদের হার মূল্যস্ফীতির ওপর রাখতে হবে। অর্থ পাওয়া ব্যয়বহুল হলে সেটি সঠিক খাতে ব্যবহূত হবে। এখন ৯ শতাংশ সুদ রাখায় যার কোনো ঋণ দরকার নেই, সেও নিচ্ছে এবং সেটি চলে যাচ্ছে অনুৎপাদনশীল খাতে। এরই মধ্যে এর প্রভাব দেখতে পাচ্ছি। কম সুদে ঋণ পাওয়া রিয়েল এস্টেটের দাম বাড়ছে, জমির দামও বাড়ছে। তার মানে ব্যাংকের অর্থ অনুৎপাদনশীল খাতে চলে যাচ্ছে। অর্থ ফাটকাবাজারেও প্রবাহিত হবে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, সুদের হার বাড়ানো হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। এটি অর্থনীতির সূত্রের সঙ্গে মোটেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, বরং সুদের হার বাড়ানো হলে অর্থের প্রবাহ কমে আসবে, যা মূল্যস্ফীতি কমাতে সহায়ক ভূমিকা রাখবে। এ কারণেই বাংলাদেশ ব্যাংক মুদ্রানীতি ঘোষণার সময় নীতি সুদের হার, রেপো রেট ইত্যাদি বাড়িয়ে অর্থের প্রবাহের রাশ টানার চেষ্টা করেছে। এক্ষেত্রেও বৈপরীত্য বিদ্যমান। বাংলাদেশ ব্যাংক একদিকে অর্থের প্রবাহ কমানোর কথা বলছে, অন্যদিকে টাকা সস্তা করে রাখা হয়েছে। ফলে মুদ্রানীতির লক্ষ্য অর্জিত হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসবে।
ছয়-নয় সুদের ফাঁদ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। বাজারে অর্থের চাহিদা ও জোগানের মাধ্যমেই এটি নির্ধারণ হওয়া বাঞ্ছনীয়। এটা ঠিক বাজার একেবারে খুলে দিলে সুদের হার অনেক বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কেস টু কেস যাচাই করে ব্যবস্থা নিতে পারে। যেসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের অবস্থা ভালো না, তারা অধিক সুদে অর্থ সংগ্রহ করছে কিনা, সেটি বাংলাদেশ ব্যাংকের মনিটর করতে হবে। কোনো প্রতিষ্ঠান যদি উচ্চসুদে আমানত সংগ্রহ ও স্বল্প সুদে ঋণ প্রদান করে তাদের হিসাব-নিকাশ খতিয়ে দেখতে হবে। কোনো ব্যাংক যদি ঋণের সুদের হার অতিরিক্ত চার্জ করে সেটিও বাংলাদেশ ব্যাংকের দেখতে হবে। স্প্রেড রেট কমিয়ে আনতে হবে। কোনো অবস্থাতেই এটি ৩ শতাংশের বেশি হতে পারবে না। উন্নত দেশগুলোয় স্প্রেড রেট ২-৩ শতাংশের মধ্যে থাকে। কিন্তু আমাদের এখানে ৫-৬ শতাংশ পর্যন্ত স্প্রেড রেট, যা কাঙ্ক্ষিত নয়।
গুটিকতক রাষ্ট্র ছাড়া বিশ্বের কোনো দেশেই সুদের হার নির্দিষ্ট করে দেয়া হয় না। রাশিয়া, কিউবার মতো দেশগুলোয় সুদের হার নির্দিষ্ট করে দেয়া হয়, সেখানে প্রতিটি বিষয়ই সরকার নির্ধারণ করে দেয়। চীনে একসময় সুদের হারের ওপর ক্যাপ আরোপ করা হতো। তারাও এখন বাজারমুখী। যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপ, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়ায় সুদের হার বাজার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত। বাংলাদেশেও এতদিন বাজারের চাহিদা-জোগানের মাধ্যমে সুদের হার নির্ধারিত হয়ে এসেছে। তাতে বড় ধরনের জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে জানা যায় না, বরং সে সময়ই বাংলাদেশের বেসরকারি বিনিয়োগ ও সঞ্চয় সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। এর ফলও অর্থনীতি পেয়েছে, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার ৭-৮ শতাংশে উঠে গিয়েছিল। আর বিনিয়োগ শুধু সুদের হারের ওপর নির্ভর করে না। অন্যান্য ব্যয়ের ওপর নির্ভর করে। বিশ্বব্যাংকের ডুইং বিজনেস সূচকে বাংলাদেশের খারাপ অবস্থার পেছনে সুদের হারের তেমন ভূমিকা নেই; বরং চাঁদাবাজি, ঘুষ, দুর্নীতি, দুর্বল যোগাযোগ ব্যবস্থা, আমলাতান্ত্রিক জটিলতাকে সেখানে দায়ী করা হয়েছে। সিঙ্গাপুরের বন্দর থেকে একটি জাহাজের পণ্য খালাস করতে লাগে দুই-তিনদিন আর আমাদের চট্টগ্রাম বন্দরে এক মাসের বেশি লেগে যায়। এতে ব্যয় বেড়ে যায়। তাছাড়া পরিবহন ব্যয়ও বাংলাদেশে অনেক বেশি। জমি ক্রয় করতে গেলে বাড়তি অর্থ ঘুস দিতে হয়। শুধু তাই নয়, কোনো বিনিয়োগকারী নতুন উদ্যোগ শুরু করতে গেলে তাকে পদে পদে ঘুস দিতে হয়। এতে ব্যবসার ব্যয় অনেক বেড়ে যায়। গবেষণায়ও দেখা গিয়েছে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সুদের হারের ভূমিকা খুবই সামান্য। অন্যান্য ব্যয় কমিয়ে আনা গেলে সুদ বাবদ ২-৩ শতাংশ বাড়তি ব্যয় কোনো সমস্যাই তৈরি করে না।
কোনো রকম সুফল ছাড়া ছয়-নয় শতাংশের মধ্যে সুদের হার বেঁধে রাখা কোনো অবস্থাতেই যৌক্তিক নয়। অর্থনীতির সূত্রেও এটি গ্রহণযোগ্য নয়। দ্রুতই এটি তুলে নেয়াই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ: সাবেক গভর্নর
বাংলাদেশ ব্যাংক; অধ্যাপক, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।