তমদ্দুন মজলিসের ৭৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সিলেটে আলোচনা সভা

লেখক: বাংলানিউজ ইউএস.কম
প্রকাশ: ৪৯ minutes ago

Manual5 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট: তমদ্দুন মজলিসের ৭৯তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ১লা সেপ্টেম্বর তমদ্দুন মজলিস সিলেট বিভাগীয় কমিটির কুমারপাড়াস্থ অস্থায়ী কার্যালয়ে আয়োজিত এ সভায় সংগঠনটির ঐতিহাসিক ভূমিকা, ভাষা আন্দোলনে অবদান, জ্ঞানচর্চা, শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির প্রসার এবং বর্তমান সময়ে এর কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করার বিষয়ে আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়।

তমদ্দুন মজলিস সিলেট জেলা কমিটির সভাপতি ড. তুতিউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন ভাষাসৈনিক অধ্যক্ষ মসউদ খান। প্রধান বক্তা ছিলেন লে. কর্নেল (অব.) এম আতাউর রহমান পীর। বিশেষ অতিথি ছিলেন কবি বেলাল আহমদ চৌধুরী। কবি কামাল আহমদের পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের কার্যক্রম শুরু হয়। সভায় কবি মোঃ ফয়জুল হক, প্রকাশক ও গবেষক বায়েজিদ মাহমুদ ফয়সল, এম এইচ শিবলী, কয়েছ আহমদ সাগর, ইছমত ইবনে ইছহাক সানজিতসহ সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বক্তব্য দেন।

প্রধান বক্তার বক্তব্যে লে. কর্নেল (অব.) এম আতাউর রহমান পীর বলেন, তমদ্দুন মজলিসকে শুধু একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন হিসেবে দেখলে এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব পুরোপুরি অনুধাবন করা সম্ভব নয়। উপমহাদেশের মুসলিম সমাজের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক পুনর্জাগরণের ইতিহাসে সংগঠনটির একটি গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান রয়েছে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পরপরই ১৯৪৭ সালের ১ সেপ্টেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবুল কাসেমের নেতৃত্বে তমদ্দুন মজলিস প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার শুরু থেকেই ইসলামী তাহজিব-তমদ্দুনের বিকাশের পাশাপাশি শিক্ষা, জ্ঞানচর্চা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির উন্নয়ন এবং বাংলা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে সংগঠনটি সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। তিনি বলেন, ভাষা আন্দোলনের সূচনাপর্বের ইতিহাসে তমদ্দুন মজলিসের ভূমিকা বিশেষভাবে স্মরণীয়। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর সংগঠনের উদ্যোগে প্রকাশিত ‘পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা বাংলা না উর্দু?’ শীর্ষক পুস্তিকা ভাষার প্রশ্নে তৎকালীন বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্কে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অধ্যাপক আবুল কাসেম সম্পাদিত এ পুস্তিকায় কাজী মোতাহার হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ ও আবুল কাসেম বাংলা ভাষার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন। পূর্ব পাকিস্তানে বাংলাকে শিক্ষার মাধ্যম, আদালত ও প্রশাসনের ভাষা এবং পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবি এতে উত্থাপন করা হয়।

Manual6 Ad Code

লে. কর্নেল (অব.) এম আতাউর রহমান পীর আরও বলেন, ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে তমদ্দুন মজলিসের উদ্যোগ পরবর্তীকালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনের সাংগঠনিক ভিত্তি গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখে। ১৯৪৭ সালের অক্টোবর মাসে রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠনের ক্ষেত্রেও সংগঠনটির নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ভাষার প্রশ্নে শিক্ষক, ছাত্র, বুদ্ধিজীবী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে যে সচেতনতা তৈরি হয়েছিল, তা পরবর্তী আন্দোলনের পথকে সুগম করে। তিনি বলেন, তমদ্দুন মজলিসের ঐতিহ্য ভাষা আন্দোলনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা ভাষায় জ্ঞানচর্চা ও পাঠ্যপুস্তক প্রকাশের ক্ষেত্রেও সংগঠনটির উদ্যোগ ছিল উল্লেখযোগ্য। প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আবুল কাসেম বাংলা ভাষায় শিক্ষার প্রসার এবং পাঠ্যপুস্তক রচনায় ভূমিকা রাখেন। একই সঙ্গে ইসলামী তাহজিব-তমদ্দুনের সঙ্গে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান ও শিক্ষার সমন্বয়ে ন্যায় ভিত্তিক সাম্যবাদী সমাজ ব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তার ওপরও সংগঠনটি গুরুত্ব আরোপ করে।

Manual3 Ad Code

প্রধান অতিথি অধ্যক্ষ মসউদ খান বলেন, প্রতিষ্ঠার পর তমদ্দুন মজলিস শুধু প্রচার-প্রচারণার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বই, পুস্তিকা ও বিভিন্ন প্রকাশনার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে জ্ঞান ও চিন্তার প্রসারে ভূমিকা রেখেছে। ভাষা ও সংস্কৃতির প্রশ্নে সংগঠনটির ঐতিহাসিক অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা প্রয়োজন। তিনি বলেন, তমদ্দুন মজলিসের চিন্তাধারার কিছু প্রভাব পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক ক্ষেত্রেও দেখা যায়। খেলাফতে রব্বানী পার্টি ১৯৫৪ সালের পূর্ববঙ্গ আইনসভা নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের অংশ হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেয় এবং দুটি আসনে (অধ্যাপক শাহেদ আলী ও অধ্যাপক আবুল কাসেম) জয়লাভ করে। তবে তমদ্দুন মজলিসের মূল ঐতিহ্যকে কেবল রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর বুদ্ধিবৃত্তিক, সাংস্কৃতিক ও নৈতিক চেতনাকে গুরুত্ব দেওয়ার ওপর তিনি জোর দেন।

 

বর্তমান সময়ে সংগঠনটির কার্যক্রম প্রসঙ্গে অধ্যক্ষ মসউদ খান বলেন, ইসলামের তাহজিব ও তমদ্দুনের মানবিক, নৈতিক ও কল্যাণমুখী দিক সমাজের সামনে আরও ব্যাপকভাবে তুলে ধরতে হবে। সেমিনার, সিম্পোজিয়াম, আলোচনা, গবেষণা ও প্রকাশনার মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মকে ন্যায়বিচার, সাম্য, সহমর্মিতা, শান্তি ও মানবিকতার শিক্ষা সম্পর্কে অবহিত করতে হবে। বিভাজনের পরিবর্তে মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার ভিত্তিতে সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

Manual6 Ad Code

 

বিশেষ অতিথি কবি বেলাল আহমদ চৌধুরী বলেন, তমদ্দুন মজলিসের ইতিহাস বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক ও সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। ভাষা, সাহিত্য, শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে সংগঠনটির অবদান নতুন করে মূল্যায়নের প্রয়োজন রয়েছে। তিনি সংগঠনের ঐতিহ্য ধারণ করে সমকালীন সমাজের প্রয়োজন অনুযায়ী কর্মসূচি সম্প্রসারণের আহ্বান জানান।

Manual5 Ad Code

 

সভাপতির বক্তব্যে ড. তুতিউর রহমান বলেন, ৭৯ বছর আগে যে লক্ষ্য ও আদর্শ নিয়ে তমদ্দুন মজলিসের যাত্রা শুরু হয়েছিল, সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে কর্মপদ্ধতিতে পরিবর্তন এলেও জ্ঞান, নৈতিকতা, মানবিকতা ও সাংস্কৃতিক চেতনার বিকাশে সংগঠনটির প্রয়োজনীয়তা এখনও রয়েছে। ঐতিহাসিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মকে সংগঠনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। সভায় বক্তারা তমদ্দুন মজলিসের দীর্ঘ পথচলা ও ঐতিহাসিক অবদান স্মরণ করে ইসলামী তাহজিব-তমদ্দুন, জ্ঞানচর্চা, বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতি, মানবিক মূল্যবোধ এবং নৈতিক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে সংগঠনের কার্যক্রম আরও জোরদার করার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

.

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code