

উদ্যোগের নাম—যুদ্ধদলিল। মূলত একটি ওয়েবসাইট। তাতে ১৫ খণ্ডের ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র’ নামক সংকলনটি সবার পড়ার সুবিধার্থে ইউনিকোডে রূপান্তর করে তুলে দেওয়া হয়েছে। এখন চাইলেই কেউ বইগুলোর প্রয়োজনীয় অংশ পড়তে পারবেন ওয়েবসাইটে। শুধু তা-ই নয়, মুক্তিযুদ্ধের উল্লেখযোগ্য ঘটনা নিয়ে প্রকাশ করা হয়েছে গ্রাফিক নভেল, কমিকস এবং জেলাভিত্তিক গণহত্যার পুস্তিকা। এগুলো নিয়ে তরুণ উদ্যোক্তারা হাজির হচ্ছেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। প্রচ্ছদে রইল যুদ্ধদলিল নামে তরুণদের সে উদ্যোগের কথা।
২১ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের স্বাধীনতা জাদুঘরের পাকা চাতাল বা প্লাজার এক কোনায় দাঁড়িয়ে এই তরুণদের গল্প শুনছিলাম। তাঁদের গল্প-আলাপের অনেকটা জুড়েই থাকল যুদ্ধদলিলে কাজ করার অভিজ্ঞতা।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চন্দ্রশেখর। যুদ্ধদলিলের শুরু থেকেই কাজ করেছেন অনুবাদক হিসেবে। তিনি বললেন, ‘আমাদের স্কুল লাইব্রেরির একটি তাকে লম্বা সারিতে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্রসংকলনের মোটা ভারী ১৫টি খণ্ড সাজানো ছিল। অনেক সময় ইচ্ছে হতো পড়ার, কিন্তু সেই কৈশোরে এত বড় বড় খণ্ড দেখে উৎসাহে কেমন যেন ভাটা পড়ত; মনে হতো, কোনো একসময় পড়ব। কিন্তু সে সময়টি এল এই প্রকল্পে কাজ করতে গিয়ে।’
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানার আগ্রহ থেকেই চন্দ্রশেখরের মতো যুদ্ধদলিলে কাজ করেছেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালসের (বিইউপি) সিদরাতুল সাফায়াত, মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির (এমআইএসটি) ধীমান দে, ইডেন মহিলা কলেজের মাঈমুনা তাসনিম। তাঁদের কাছেই শোনা হলো যুদ্ধদলিলের এগিয়ে চলার গল্প।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ওপর ১৫ খণ্ডের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দালিলিক প্রকাশনা। তথ্য মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশিত এই খণ্ডগুলো সম্পাদনা করেছেন কবি ও সাংবাদিক হাসান হাফিজুর রহমান। প্রকাশনা প্রকল্পে কাজ করেছেন দেশের বিশিষ্টজনদের নিয়ে গঠিত এক প্রামাণ্যকরণ কমিটি। এ খণ্ডগুলোতে মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাপ্রবাহ ও তথ্য-উপাত্ত, স্মৃতিচারণা যেমন তুলে ধরা হয়েছে, তেমনি রয়েছে ১৯০৫-৭১ সাল পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের বিশাল পটভূমিও। সব মিলিয়ে প্রায় ১৫ হাজার পৃষ্ঠার সংকলন। আয়তনের কারণে ব্যক্তিগত সংগ্রহে রাখা বেশ কঠিন ব্যাপার।
মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বগাথা নিয়ে যুদ্ধদলিল তৈরি করেছে এমন দেয়ালিকা। ছবি: সংগৃহীত‘অথচ মুক্তিযুদ্ধের সর্বজনস্বীকৃত এই প্রকাশনা সবার হাতের নাগালে থাকা উচিত। যদিও খণ্ডগুলোর পিডিএফ ফাইল ইন্টারনেটে পাওয়া যায়; কিন্তু পিডিএফ সংস্করণে পড়া তো খুব একটা সহজ নয়। তাই যুদ্ধদলিল ভাবল, সংকলনের ইউনিকোড রূপান্তর জরুরি। ইউনিকোডে লিখলে সব কম্পিউটার ও স্মার্টফোনে সরাসরি বাংলা পড়া যাবে। পিডিএফ ফাইল নামাতে যে সময় লাগে, সেটাও লাগবে না। আগ্রহী মানুষ চাইলেই যেন ‘কি-ওয়ার্ড’ দিয়ে অনুসন্ধান বাটনে চাপ দিয়ে প্রয়োজনীয় অংশটুকু পড়ে নিতে পারেন, চাইলেই যেন গবেষণা বা অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করতে পারেন’, যোগ করলেন বিদ্যুদ্বিকাশ মজুমদার। সরকারি তিতুমীর কলেজের এই শিক্ষার্থী যুদ্ধদলিলের ঢাকা বিভাগের সমন্বয়ক।
বিদ্যুদ্বিকাশের সে ভাবনা এখন আলোর মুখ দেখেছে। যুদ্ধদলিল (www.juddhodolil.com) মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক দলিলপত্র সবার জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছে। আগ্রহীরা ১৫ খণ্ডের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র পড়তে ও এর বিষয়বস্তু সম্পর্কে জানতে পারেন ওয়েবসাইটে। কিন্তু এই উদ্যোগের শুরুটা কীভাবে?
ফেসবুক স্ট্যাটাসে শুরু
২০১৫ সালের ২৫ জুলাই। যুদ্ধদলিলের প্রকল্প পরিচালক নাজমুল হাসান তাঁর ব্যক্তিগত প্রোফাইলে একটি স্ট্যাটাসে সংকলনটি ইউনিকোড সংস্করণে রূপান্তরের ব্যাপারে নিজের ভাবনা তুলে ধরেন। কীভাবে কাজটি এগোতে পারে, সেটা উল্লেখ করে সবার সহযোগিতা চান তিনি।
নাজমুলের ডাকে মুহূর্তেই অনেকে সাড়া দেন। যুদ্ধদলিল উদ্যোগের শুরু এবং তাঁদের পথ চলার কথা এভাবেই তুলে ধরা আছে ওয়েবসাইটে। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামিউল হাসান বলেছিলেন, ‘সে স্ট্যাটাস দেখেই আমরা যুক্ত হলাম। কাজ শুরু করলাম।’ শুধু সামিউল একা নন, তাঁর মতো সে স্ট্যাটাস দেখে দিন গড়াতেই একত্র হন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী থেকে শিক্ষক, সরকারি চাকরিজীবী থেকে চিকিৎসক, ব্যবসায়ীসহ নানা পেশার মানুষ। এঁদের বেশির ভাগই তরুণ।
মনের টানে, প্রাণের টানে
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র সংকলনের বিভিন্ন খণ্ডের পৃষ্ঠা নির্ধারণ করে দেওয়া হতো স্বেচ্ছাসেবকদের। অনুবাদ বা ইউনিকোডে রূপান্তর করে নির্দিষ্ট তারিখের মধ্যে জমা দিতেন তাঁরা। একটি দল নেয় সম্পাদনার দায়িত্ব। বইয়ের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা, অনুবাদের মান যাচাই করা—এসবই তাঁরা করেছেন। এমনই একজন স্বেচ্ছাসেবক জয়া করিম। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি, শুনেছি। বাবার মুখে অজস্রবার যুদ্ধের ভয়াবহতা শুনেছি, কল্পনা করে শিউরে উঠেছি। আর সেই মুক্তিযুদ্ধের দলিলপত্র নিয়ে কাজ করতে পারার সুযোগ কখনো পাব, তা ভাবিনি। তাই শত ব্যস্ততার মধ্যেও যখন এই প্রকল্পের কথা জানলাম, একটুও দেরি করিনি একাত্মতা প্রকাশ করতে। সাধ্য এবং সামর্থ্যের সর্বোচ্চটুকু দিয়ে প্রকল্পের সঙ্গে যুক্ত আছি, থাকব।’
জয়ার মতো সারা দেশের প্রায় ৩০০ স্বেচ্ছাসেবক ইউনিকোড রূপান্তর, দলিলের ইংরেজি অংশের অনুবাদ ও যাচাই-বাছাইয়ের কাজ করেছেন। এই কাজটি তাঁরা করেছেন মনের টানে; গৌরবের ভাগীদার হতে। যুদ্ধদলিলে যাঁরা অবদান রেখেছেন, তাঁদের প্রত্যেকের নাম রয়েছে ওয়েবসাইটে। প্রতিটি খণ্ডের বিষয়ভিত্তিক অনুচ্ছেদের সঙ্গে দেওয়া আছে সেই অংশের অনুবাদ বা রূপান্তরের দায়িত্ব পালনকারীর নাম। এই সম্মানটুকুই তাঁদের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
জেলাভিত্তিক গণহত্যার তথ্য নিয়ে প্রকাশিত পুস্তিকাব্যাপ্তি বাড়ল যুদ্ধদলিলের
যুদ্ধদলিলের প্রাথমিক উদ্যোগ ছিল দলিলপত্র ইউনিকোডে রূপান্তর করে ওয়েবসাইটে ও অ্যান্ড্রয়েড অ্যাপে অবমুক্ত করা, প্রতিদিন নিয়ম করে দলিলপত্রের নির্বাচিত অংশ কর্মীদের ফেসবুক পেজে প্রচার করা। ক্রমাগত তাঁরা এই কাজটি এখনো করে চলেছেন। ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ: দলিলপত্র থেকে বলছি’ (fb. com/muktizuddho 1971) নামের ফেসবুক পেজের অনুসারীর সংখ্যা এখন প্রায় ২ লাখ ১৫ হাজার।
যুদ্ধদলিলের যোদ্ধারা শুধু এ কাজেই থেমে থাকেননি। ২০১৬ সাল থেকে মাঠ পর্যায়ের কাজ শুরু করেছেন তাঁরা। দলিলপত্রের বিভিন্ন খণ্ড থেকে উল্লেখযোগ্য ঘটনা নিয়ে প্রকাশ করেছেন প্রচারপত্র, গ্রাফিক নভেল, কমিকস, জেলাভিত্তিক গণহত্যার পুস্তিকা। এগুলো নিয়ে কর্মীরা হাজির হচ্ছেন দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে। শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছে দিচ্ছেন বই; শোনাচ্ছেন গৌরব আর অর্জনের সত্য গল্প। আবার তরুণ কর্মীরা নিজেরাও ছুটে যাচ্ছেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর-জল্লাদখানা বধ্যভূমিতে; তাঁদের সঙ্গী হয়েছে খুদে শিক্ষার্থীরা।
সেদিন স্বেচ্ছাসেবকদের কাছে যুদ্ধদলিলের এগিয়ে চলার গল্প শুনতে শুনতেই দিনের ডুবুডুবু সূর্যটা বিদায় নিল। আবছা অন্ধকার ছাপিয়ে উদ্ভাসিত হয়ে উঠল সামনের শিখা চিরন্তন।
যুদ্ধদলিলের স্কুল আয়োজনদাবি তাঁদের আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবসের
২৫ মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস। যুদ্ধদলিলের স্বেচ্ছাসেবকেরা চান দিনটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এ জন্য তাঁরা ২৫ মার্চ বেলা ১১টায় জাতীয় প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করেছেন। শুধু ঢাকাতেই নয়, দেশের সব জেলা শহরেই আয়োজন করা হয়েছে গণহত্যা দিবসের অনুষ্ঠান।
গণহত্যার দলিল বিনা মূল্যে বিতরণের মাধ্যমে তাঁরা এই দাবির সপক্ষে জনমত গঠনের জন্য নামবেন। যুদ্ধদলিলের প্রকল্প ব্যবস্থাপক জান্নাতুল মনিকা বললেন, ‘এই দাবি আদায়ে আগামী দিনগুলোতে আমরা আরও কর্মসূচি পালন করব।’