

গাইবান্ধা প্রতিনিধিঃ
মানুষ গড়ার দায়িত্ব পালন করছেন যে শিক্ষক শিক্ষিকা তাঁরাই আজ মানবেতর জীবন যাপন করছেন। করোনার কারণে আগে থেকেই সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ। এখন চলছে লকডাউন। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন সব শ্রেণীপেশার মানুষ। এর মধ্যে কিন্ডার গার্টেনের শিক্ষকদের পরিবারে চলছে নীরব দুর্ভিক্ষ। কারণ তাদের পরিবার চলে শিক্ষার্থীদের বেতনের টাকায়। অস্বচ্ছল পরিবারের এসব শিক্ষকদের সহায়তায় কেউ এগিয়ে না আসায় চরম বিপাকে পড়েছেন তারা। জেলা উপজেলার প্রান কেন্দ্রসহ প্রতিটি ইউনিয়নে প্রায় ৫/৬টি করে প্রি-ক্যাডেট (স্কুল)। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা করোনা ভাইরাসের কারনে সারা দেশের মতো গাইবান্ধা জেলার কিন্ডার গার্টেন গুলো (কেজি স্কুল) বন্ধ রয়েছে। ফলে কর্মহীন হয়ে পড়েছেন স্কুলগুলোর হাজার হাজার শিক্ষক/কর্মচারীরা। স্কুল বন্ধ থাকায় বেতন না পেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন শিক্ষকরা। অর্থকষ্টে জীবন-যাপন করা শিক্ষকরা রেশন কার্ড ও নগদ টাকা প্রনোদনা দেয়ার দাবি জানিয়েছেন সরকারের কাছে।
জানা যায়, জেলা উপজেলার প্রান কেন্দ্রসহ প্রতিটি ইউনিয়নে প্রায় ৫/৬ টি করে প্রি-ক্যাডেট স্কুল আছে। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রয়েছেন হাজার হাজার শিক্ষক/কর্মচারী। এ শিক্ষকরা প্রায় লক্ষাধিক শিক্ষার্থীকে পাঠদান করিয়ে থাকেন। এই কিন্ডার গার্টেন স্কুলগুলো শিক্ষার্থীদের বেতন ও টিউশন ফি দিয়েই চলে। শিক্ষার্থীদের বেতনেই সকল শিক্ষক/কর্মচারীদের বেতন প্রদান করা হয়। কিন্তু করোনায় সরকারি আদেশে গত ১৮ মার্চ হতে সকল কিন্ডার গার্টেন স্কুল বন্ধ থাকায় কোনো বেতন নেই শিক্ষকদের। টিউশন ফি বন্ধ থাকায় শিক্ষক ও কর্মচারীদের মাসিক সম্মানীও বন্ধ।প্রতিষ্ঠার পর থেকে কেজি স্কুলের শিক্ষকরা নিষ্ঠার সাথে শিক্ষার্থীদের লেখাপড়া শেখাচ্ছেন। কেজি স্কুলে লেখাপড়া শিখে অনেক ছাত্রছাত্রী বর্তমানে সরকারি বেসরকারি সংস্থায় বিভিন্ন উচ্চপদে কর্মরত আছেন। যাঁদের হাত ধরে ছাত্রছাত্রীরা লেখাপড়া শিখে আজ মানুষের মতো মানুষ হয়েছেন, জীবনে সচ্ছলতা পেয়েছে সেই স্কুলের শিক্ষকরা বর্তমানে মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন। আর্থিক সঙ্কটের কারণে শিক্ষকরা দিনের পর দিন কষ্টে জীবন যাপন করছেন। দেখার কেউ নেই।
এর মধ্যে অনেক ছাত্রছাত্রী অত্যন্ত গরীব পরিবারের। রিকশা ও অটোরিকশা চালান। এরকম পরিবারের সন্তানরাই অনেকেই কেজি স্কুলে লেখাপড়া করছে। মানুষেরমতো মানুষ হওয়ার জন্য। গরিব হবার কারণে এসব শিক্ষার্থীরা মাসিক বেতনও দিতেও বিলম্ব করছে। অন্যান্য শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে বেতন হিসেবে যে অর্থ আদায় করা হয় সেটাই শিক্ষকরা মাসিক বেতন হিসেবে গ্রহণ করছেন। তাছাড়া লকডাউন হওয়ায় বাইরে যাওয়া বন্ধ হওয়ায় অনেক শিক্ষকের টিউশনি করারও সুযোগ নেই। ফলে কোনোদিক থেকেই তারা উপার্জন করতে পারছেন না। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের অর্থবিত্ত না থাকলেও সমাজে তারা শিক্ষক হিসেবেই সম্মানীয়। ফলে তারা না পারছে লাইনে দাঁড়িয়ে ত্রাণ নিতে, না পারছেন মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলতে। ফলে মানুষ গড়ার কারিগররা এখন তাদের সংসারের ব্যয়ভার বহন করতে হিমশিম খাচ্ছেন। লজ্জ্বায় কারো কাছে হাত পারতেও পারছেন না। হলিচাইল্ড মাল্টিমিডিয়া অ্যান্ড সেমি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলের অধ্যক্ষ মোঃ মিজানুর রহমান পিপুল দেশ সংবাদকে জানান, অর্থ না থাকলেও শিক্ষক ও পরিচিতির কারণে আমরা অন্যের কাছে সাহায্য চাইতে পারছি না। এখন আমাদের অনেকের চলা কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক শিক্ষক আছে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপর চলে তাদের সংসার। আমরাও শিক্ষার্থীদের বেতন ও টিউশন ফি আদায় করতে পারছি না শিক্ষকদেরকেও বেতন দিতে পারছি না। তাই সরকারের কাছে সকল স্কুলসমূহের শিক্ষক-কর্মচারীদের সরকারি সহায়তার জন্য আমরা আবেদন জানাচ্ছি। সরকারের কাছে রেশন কার্ড ও নগদ অর্থ প্রণোদনা প্রদানের দাবি জানাচ্ছি। দেশ সংবাদকে আরোও জানান, শিক্ষক ছাড়াও আরও কর্মচারীরা এসব স্কুলে নিয়োজিত আছেন। কিছুটা বাড়তি সহায়ক হিসাবে সরকারি বই দিয়ে সরকারি বিধি মেনে সরকারি শিক্ষা কারিকুলাম মেনে ও সরকারি সকল জরিপে অংশগ্রহণ করে কিন্ডার গার্টেন স্কুলগুলোতে পাঠদান করা হয়। শিক্ষার মান ও প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষার ফলাফল ভালো অর্জন করায় অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের কেজি স্কুলে ভর্তি করান। বর্তমান চলমান দূর্যোগে সরকার আমাদের মাঝে এগিয়ে আসলে এবং রেশন কার্ড ও নগদ অর্থ প্রনোদনা প্রদানে এই দূর্যোগে আমাদেরকে সহায়তা দিলে আমরা শিক্ষকও কর্মচারীরা উপকৃত হবো । উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির এক নেতা দেশ সংবাদকে বলেন, শিক্ষা ক্ষেত্রে সাদুল্লাপুরে কেজি স্কুলগুলো অনেকে ভালো করছে। এই বিপদে উপজেলার কেজি স্কুলের শিক্ষক ও কর্মচারীদের প্রনোদনা দিলে কিছুটা হলে কষ্টের হাত থেকে রক্ষা পাবে। সরকারের আপাতত কেজি স্কুলের এসব শিক্ষকদের মাঝে সরকারি উপহার প্রদান করা উচিত।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েক জন শিক্ষক বলেন, কেজি স্কুলে শিক্ষকতা ও প্রাইভেট পড়িয়ে কোনো রকম পরিবারের খরচ সামাল দিচ্ছি। এমনিতেই কেজি স্কুল থেকে ঠিকভাবে বেতন পাই না তার উপর করোনায় লকডাউন। ফলে আর্থিক অস্বচ্ছল শিক্ষকদের পরিবারে নীরব দুর্ভীক্ষ চলছে। শিক্ষিত মানুষ চক্ষু লজ্জার ভয়ে কাউকে বলতেও পারছি না আবার সইতেও পারছি না। তাই সরকার ও সমাজের বিত্তবান মানুষেরা যেন আমাদের কষ্টটা একটু বুঝার চেষ্টা করেন। আরেকজন স্কুলের শিক্ষক বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে বেসরকারি হাইস্কুল কলেজের শিক্ষকরা ১৫ হাজার টাকা ৩৫ হাজার টাকার কম বেতন পাননা। কিন্তু কেজি স্কুলের শিক্ষকরা কতো বেতন পান তা সবারে জানা আছে। আমাদের কিছুটা নির্ভর করে টিউশনির উপর। বর্তমান চলমান দূর্যোগে তারমধ্যে আবার শিক্ষকদের কয়েক মাসের বেতন বাকী পড়ে থাকে । এ অবস্থায় জীবন আর চলছে না।আপেক্ষায় ও আশায় আছি আমরা দিনের পর দিন গুনছি আমাদের কষ্টের অবসান কবে ঘটবে। আমরাও বাঁচতে চাই সবার সাথে।শিক্ষকদের দুর্দশা লাঘব করার জন্য অনতিবিলম্বে প্রনোদনার জন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও সংস্থার প্রতি সবিনয় অনুরোধ জানিয়েছেন মানুষ গড়ার হাতিয়াররা (শিক্ষক)।