আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রিতে রেকর্ড গড়লো যুক্তরাষ্ট্র

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual1 Ad Code

গত সপ্তাহেই যুক্তরাষ্ট্রে ভয়াবহ গুলির ঘটনা ঘটেছে। অস্ত্র বিক্রি বৃদ্ধির সঙ্গে গুলি করে মানুষ হত্যার ঘটনাও হু হু করে বাড়ছে। এ নিয়ে ডেমোক্র্যাট ও রিপাবলিকানরা এক পক্ষ অন্য পক্ষকে দুষছেন।

নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রে আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রির হার গত বছর থেকে অনেক বেড়ে গেছে। অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি মার্কিন এখন আগ্নেয়াস্ত্র কিনছেন। এর আগে এত বেশি আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রির হার লক্ষ করা যায়নি।

প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রে কয়েক দশক ধরেই আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রি বেড়েছে। কিন্তু গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় থেকে তা আরও বহুগুণে বেড়ে গেছে। ১৯৯৮ সাল থেকে মার্কিন সরকার প্রথমবারের মতো অস্ত্র কেনার ক্ষেত্রে ‘ব্যাকগ্রাউন্ড চেক’ করার শর্ত আরোপ করে। ক্রেতাকে যাচাই করা শুরু করে। সে সময় প্রথম এক সপ্তাহেই ১০ লাখ আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রির রেকর্ড করা হয়। এখনো যাচাই-বাছাইয়ের মধ্য দিয়েই মার্কিনদের অস্ত্র কিনতে হচ্ছে। অস্ত্র বিক্রিতে আগের সেই রেকর্ড এবার পেরিয়ে গেছে। এবার চলতি বসন্তের এক সপ্তাহে ১২ লাখ অস্ত্র বিক্রি হয়েছে।

Manual8 Ad Code

ডেভিসে ইউনিভার্সিটি অব ক্যালফোর্নিয়ার অস্ত্র বিশেষজ্ঞ গ্যারেন জে. উইনটেমিউট বলেন, ‘বর্তমান আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রির এ প্রবাহ আমরা আগে কখনোই লক্ষ করিনি। সাধারণত আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রি ধীরগতিতে চলে। তবে গত বছর থেকে তা দ্রুত চলছে।’

Manual4 Ad Code

প্রতিবেদনে বলা হয়, যাঁদের অস্ত্র আছে, তাঁরাই যে কেবল নতুন মডেলের অস্ত্র কিনছেন, তা নয়। বরং যাঁরা কোনো দিন অস্ত্র ব্যবহার করেননি, এবার তাঁরাও আগ্নেয়াস্ত্র কিনছেন। নর্থ-ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও হার্ভার্ড ইনজুরি কন্ট্রোল রিসার্চ সেন্টারের তথ্য বলছে, গত বছর প্রায় এক-পঞ্চমাংশ মার্কিন প্রথমবারের মতো অস্ত্র কিনেছেন। তাঁদের মধ্যে অর্ধেক নারী, এক-পঞ্চমাংশ কৃষ্ণাঙ্গ এবং বাকি এক-পঞ্চমাংশ হিসপানিক জাতিগোষ্ঠীর।

এ নিয়ে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগোর রিসার্চ সেন্টার একটি জেনারেল সোশ্যাল সার্ভে পরিচালনা করেছে। সেই জরিপের তথ্য বলছে, যুক্তরাষ্ট্রের ৩৯ শতাংশ পরিবারে আগ্নেয়াস্ত্র রয়েছে। ২০১৬ সালে ৩২ শতাংশ পরিবারে আগ্নেয়াস্ত্র ছিল।

সাউথ লস অ্যাঞ্জেলস সিটিতে সবচেয়ে বেশি বন্দুক হামলার ঘটনা ঘটে। সেই সিটি কাউন্সিলের প্রতিনিধি মারকুয়েস হ্যারিস-ডাউসন বলেন, মার্কিনরা এখন একে অন্যের সঙ্গে বন্দুক দৌড়ে পাল্লা দিয়ে চলছে। করোনা মহামারি শুরুর সময় টয়লেট পেপার কেনার যেমন হিড়িক পড়ে গিয়েছিল, ঠিক একইভাবে সেই সময় থেকে বন্দুক কেনারও হিড়িক পড়ে গেছে।

আগ্নেয়াস্ত্র বিক্রির দোকানে কাজ করেন, এমন অনেক কর্মী জানান, গত বছর অস্ত্র বিক্রিতে তাঁরা রেকর্ড করেছেন। নানা ধরনের মানুষ এসব অস্ত্র কিনছেন।

টমাস হ্যারিস নামের এক কর্মী বলেন, অস্ত্র কিনতে আসা ক্রেতার অনেকেই রক্ষণশীল নন। এমনকি তাঁদের অধিকাংশই কখনো বন্দুক চালাননি এবং চালানো জানেনও না। তাঁরাই ৪০০ ডলারের বেশি বা সবচেয়ে দামি অস্ত্র কিনেছেন। তাঁরা জানিয়েছেন, এ অস্ত্র তাঁরা সঙ্গে রাখবেন না, বাসায় রাখবেন। কারণ, মহামারি শুরুর সময় লকডাউনে তাঁরা নিজেদের নিরাপদ রাখতেই অস্ত্র কিনেছেন।

নর্থ-ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটি ও হার্ভার্ড ইনজুরি কন্ট্রোল রিসার্চ সেন্টারের তথ্য বলছে, ২০২০ সালে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ বা ১ কোটি ৭০ লাখ মার্কিন আগ্নেয়াস্ত্র কিনেছেন।

এ গবেষণা দলের গবেষক ও নর্থ-ইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির মহামারি তত্ত্বের অধ্যাপক ম্যাথিউ মিলার বলেন, চলতি বছর অস্ত্রের ক্রেতাদের মধ্যে ৬৩ শতাংশ পুরুষ, ৭৩ শতাংশ নারী, ১০ শতাংশ কৃষ্ণাঙ্গ ও ১২ শতাংশ হিসপানিক জাতিগোষ্ঠীর। গত বছরের জুন ছিল সবচেয়ে বেশি অস্ত্র বিক্রির মাস।

যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক বিক্রির তথ্য রাখে এমন একটি নতুন প্রতিষ্ঠানের নাম দ্য ট্রেস। এ প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছর জানুয়ারিতে ২৩ লাখ মার্কিন অস্ত্র কিনেছেন। গত জুলাই থেকে এটিই ছিল সবচেয়ে বেশি অস্ত্র বিক্রির মাস। গত বছরের প্রথম তিন মাসের তুলনায় চলতি বছর প্রথম তিন মাসে অস্ত্র বিক্রির হার ১৮ শতাংশ বেড়েছে।

দ্য ট্রেসের ডেটা ও গ্রাফিকস এডিটর ড্যানিয়েল নাস বলেন, যুক্তরাষ্ট্রে সরকার অস্ত্র বিক্রির তালিকা রাখে না। এ ছাড়া ফেডারেল ‘ব্যাকগ্রাউন্ড চেক’ ও অস্ত্র বিক্রির পূর্ণ চিত্র দিতে পারে না। কারণ, অনেকেই গোপনে অস্ত্র বিক্রি করে থাকে। সারা দেশে মোট অস্ত্র বিক্রির পরিমাণ ৪০ কোটির কাছাকাছি হতে পারে।

এদিকে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বন্দুক হামলার ঘটনায় নিহত ব্যক্তির সংখ্যাও দিন দিন বাড়ছে। লস অ্যাঞ্জেলসে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত গত বছরের একই সময়ের তুলনায় বন্দুক হামলা ও মৃতের ঘটনা ৩৬ শতাংশ বেড়েছে। এ সময়ে বন্দুক হামলার শিকার ব্যক্তির সংখ্যা ৬৮ শতাংশ ও বন্দুক হামলার ঘটনা ৫৬ শতাংশ বেড়েছে।

Manual4 Ad Code

লস অ্যাঞ্জেলস পুলিশ বিভাগের প্রধান মাইকেল মুর বলেন, নানা হামলার ঘটনায় জানুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত চার মাসে তিন হাজারের বেশি বন্দুক জব্দ করা হয়েছে। দিনে গড়ে অন্তত ২৫টি বন্দুক জব্দ করা হচ্ছে। এসব ঘটনায় চলতি বছর গ্রেপ্তারের হার ৬০ শতাংশ বেড়েছে।

Manual8 Ad Code

গত বছর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে বন্দুক হামলার ঘটনাও অনেক বেড়ে গেছে। এসব হামলার ঘটনায় অসংখ্য মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। এ কারণে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন যুক্তরাষ্ট্রের আগ্নেয়াস্ত্র সহিংসতাকে আন্তর্জাতিকভাবে বিব্রতকর একটি বিষয় বলে উল্লেখ করেছেন। গত এপ্রিলে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণে তিনি কয়েকটি আলাদা নির্বাহী আদেশ জারি করে বলেছেন, সংবিধানের কোনো সংশোধনীই চূড়ান্ত নয়।

আগ্নেয়াস্ত্র সহিংসতার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানে প্রদত্ত অধিকারকে সম্পর্কিত করে বিতর্ক তোলা সম্পূর্ণ অমূলক বলে তিনি উল্লেখ করেন। মার্কিন সংবিধানের দ্বিতীয় সংশোধনীতে নাগরিকদের অস্ত্র রাখার অধিকার নিশ্চিত করা আছে। এ অধিকার নিয়ে মার্কিন সমাজ ব্যাপকভাবে বিভক্ত।

প্রেসিডেন্ট বাইডেন বলেন, সংবিধানের শুরু থেকেই দ্বিতীয় সংশোধনী ছিল। সব সময়ই সব ধরনের অস্ত্র সবার সংগ্রহে নেওয়ার সুযোগ ছিল না বলে তিনি উল্লেখ করেন। আগ্নেয়াস্ত্র সহিংসতাকে মহামারির সঙ্গে তুলনা করে বাইডেন বলেন, বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য আন্তর্জাতিকভাবে বিব্রতকর হয়ে উঠেছে।

সে সময় ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিস ও অ্যাটর্নি জেনারেল মেরিক গারল্যান্ডকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রেসিডেন্ট বাইডেন ছয়টি পদক্ষেপের কথা ঘোষণা করেন। তার মধ্যে তিনি বিচার বিভাগকে ‘ঘোস্ট গান’ (ঘরে তৈরি করা যায় এমন আগ্নেয়াস্ত্র) নিয়ন্ত্রণে ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দিয়েছেন।

অনলাইন থেকে সহজেই খুচরা যন্ত্রাংশ কিনে এ ধরনের হালকা আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি করা হয়। এসব আগ্নেয়াস্ত্রের কোনো রেজিস্ট্রেশন বা ক্রমিক নম্বর থাকে না। ঘরে তৈরি এসব অস্ত্র সহিংসতায় ব্যাপকভাবে ব্যবহার হয়ে থাকে। প্রেসিডেন্ট বাইডেন তাঁর নির্দেশনায় অনলাইন থেকে কেনার আগেও ‘ব্যাকগ্রাউন্ড চেক’ করার শর্ত আরোপের কথা বলেছেন। অঙ্গরাজ্য পর্যায়ে ‘রেড ফ্ল্যাগ’ আইন প্রণয়ন করে ঝুঁকিপূর্ণ মনে হওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে বন্দুক সংগ্রহ কঠিন করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি

হালকা পিস্তলকে রূপান্তর করা হলে সেটিকে ন্যাশনাল ফায়ার আর্মস অ্যাক্টের আওতায় বিবেচনার কথা বলা আছে বাইডেনের নির্দেশনায়। বিচার বিভাগকে বন্দুক পাচার বা বন্দুক চোরাচালানের ওপর প্রতিবেদন প্রকাশ করার নির্দেশ দিয়েছেন তিনি।

সে সময় রিপাবলিকানরা এ নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকান দলের নেতা কেভিন ম্যাকার্থি বলেন, বাইডেন অপরাধীদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান গ্রহণ করছেন না। উল্টো তিনি আইন মেনে চলা নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকারে হস্তক্ষেপ করছেন। সংবিধান অনুসরণ করে যেকোনো সমস্যার সমাধানের কথা বলেছেন তিনি।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code