

ছবিমেলা উপলক্ষে সম্প্রতি ঢাকা এসেছিলেন খ্যাতিমান ভারতীয় ঔপন্যাসিক অরুন্ধতী রায়। ৪ মার্চ সকালে ঢাকার একটি পান্থশালায় বসে কথাসাহিত্যিক আনিসুল হকের সঙ্গে দীর্ঘ অন্তরঙ্গ আলাপচারিতায় তিনি উন্মোচন করলেন তাঁর লেখার জগৎ। কীভাবে লেখক হয়ে উঠলেন তিনি, সেই গল্পের পাশাপাশি জানালেন নিজের আরও সব বিচিত্র গল্প।
আনিসুল হক: আজকের দিনটা বর্ষামেদুর। আপনার দ্য গড অব স্মল থিংস-এর শুরুর বিবরণের মতো, ভেজা আর শেওলাময়। আমরা সরাসরি আপনার সাহিত্য নিয়ে কথা বলি! আপনি পড়তে গেলেন স্থাপত্যবিদ্যা। ছাত্রজীবনে আপনার কি স্বপ্ন ছিল যে লেখক হবেন?
অরুন্ধতী রায়: না। ঠিক তা নয়। তবে আমি যখন খুব ছোট ছিলাম, পাঁচ বা ছয় বছর, তখন আমার অবস্থা এমন ছিল যে কেবল লেখা ছাড়া আমি আর কিছু করতাম না। এমন না যে আমি ঔপন্যাসিক হতে চেয়েছিলাম বলে লিখতাম। সেটাই ছিল আমার নিজেকে প্রকাশ করার একমাত্র উপায়। ষোলো বছর বয়সে কেরালা থেকে দিল্লিতে এলাম। কেরালায় খুব বদ্ধ সমাজ ছিল। এটা কমিউনিস্ট-অধ্যুষিত, কিন্তু খুব সনাতনপন্থী। একজন মেয়ের জন্য পরিস্থিতিটা কঠিন ছিল। আমি গৃহত্যাগ করলাম। বাড়ি যাওয়া বন্ধ করে দিলাম।
সতেরো বছর বয়স থেকে নিজে নিজে চলতে শুরু করলাম। স্থাপত্যে পড়ার সেই দীর্ঘ বছরগুলোয় আমার কোনো উচ্চাভিলাষ ছিল না। জীবন নিয়ে আমি ভাবিনি, ভেবেছি শুধু কীভাবে বাসা ভাড়া জোগাড় করতে পারব! কীভাবে টিকে থাকব, সেটাই ছিল ভাবনা। আমি লেখক হব—এটা ভাবা তো অসম্ভব ছিল।
আনিস: স্থপতি হবেন, সেই আকাঙ্ক্ষা তো ছিল?
অরুন্ধতী: আমার কখনোই কোনো আকাঙ্ক্ষা ছিল না। এখনো নেই। আমি যখন কোনো একটা কাজ করি, তখন ওই কাজটা শেষ করার একটা শৈল্পিক উচ্চাশা থাকে; কিন্তু আমার কোনো দিনও এই আকাঙ্ক্ষা ছিল না যে আমি এটা হব, ওটা হব। স্থাপত্যের ছবি আঁকা, নগর-পরিকল্পনা—এসব আমার পছন্দের ছিল। তারপর আমার কোনো টাকা ছিল না। আমার জীবন ছিল তিলোত্তমার মতো (দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস-এর চরিত্র।) নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগার পাশে একটা রুমে কোনোরকমে থাকতাম আমি। তখন একজনের সঙ্গে আমার দেখা হলো, যাঁর স্ত্রী আমার অফিসে কাজ করতেন। তিনি ছিলেন চিত্রনির্মাতা। তিনি আমাকে তাঁর ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব দিলেন। অভিনয়ে আমি আগ্রহী ছিলাম না, আমার আগ্রহ ছিল চলচ্চিত্র নির্মাণে। তো, আমি ছবিতে অভিনয় করলাম; এবং ছবির চিত্রনাট্য লিখলাম। স্থাপত্যের ছেলেমেয়েদের নিয়ে…
আনিস: তারপর ওই ছবির জন্য জাতীয় পুরস্কার পেলেন। দুটো পুরস্কার পেয়েছিলেন আপনারা। এরও অনেক বছর পর ভারতের মুক্তচিন্তার লেখকদের ওপরে হামলার প্রতিবাদে যে পুরস্কার আপনি ফিরিয়েও দেবেন!
অরুন্ধতী: ও হ্যাঁ। তখন কিন্তু আমি পুরস্কার গ্রহণ করেছিলাম। এখন আমি সেই পুরস্কার ফেরত পাঠিয়ে দিয়েছি।
আনিস: আপনি বলেছিলেন, ফেরত পাঠানোর মতো পুরস্কার দুটোর বেশি আপনার নেই। আপনার কৌতুকবোধ ভীষণ তীব্র। আপনি কি দু-একটি বাংলা শব্দ বোঝেন?
অরুন্ধতী: একটি-দুটি বুঝি। বেশি না। আমার বাবা বাংলাদেশের। বরিশালের। তবে আমার এক বছর বয়স থেকেই বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়ি হয়। কেরালাতে মায়ের কাছে আমি বড় হই। সুতরাং আমার ভাষা কেরালার। মালয়লি। এখন হিন্দি।
আনিস: এবারে আমাদের বইমেলায় বৃষ্টি হচ্ছিল। তাকিয়ে দেখি, ছাদের নিচে বৃষ্টির ফোঁটা জমেছে, অ্যাবাকাসের মতো। আপনি এই উপমাটা লিখেছিলেন দ্য গড অব স্মল থিংস-এ। আপনার লেখায় এই রকম সৌন্দর্য থাকে। সর্বতোভাবে আপনি একজন শিল্পী। আপনার কি কোনো আনুষ্ঠানিক শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ আছে লেখালেখির বিষয়ে? ক্রিয়েটিভ রাইটিংয়ের কোনো কোর্স করেছেন?
অরুন্ধতী: ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্সে আমি বিশ্বাস করি না। আমার মনে হয়, ক্রিয়েটিভ রাইটিং কোর্সগুলো পণ্য উৎপাদন করতে শেখায়। হয়তো তারা নিম্নমানের লেখককে মাঝারি লেখকে উন্নীত করে। তবে তারা ভালো লেখককেও মাঝারি বানিয়ে ছাড়ে।
আনিস: আপনি কি জেমস জয়েসের পোর্ট্রেট অব দ্য আর্টিস্ট এজ আ ইয়াংম্যান
অরুন্ধতী: আমি এমন কাউকে সচরাচর দেখি না, যিনি ইউলিসিস গোটাটা পড়েছেন। ছোট্ট গ্রাম আয়েমেনেমে শৈশব কাটিয়েছি আমি। আমার জন্য এটা একটা সুবিধা ছিল যে সেখানে কোনো দোকান ছিল না, সিনেমা হল ছিল না, টেলিফোন, টেলিভিশন, রেস্তোরাঁও ছিল না। সেখানে ছিল নদী, পোকামাকড়, মাছ, গাছপালা। তারাই ছিল আমার খেলনা। কিন্তু প্রতি তিন মাস পরপর আমাদের কাছে মাদ্রাজের ব্রিটিশ কাউন্সিল থেকে আসত এক শ বই। সেসব পড়ে আমরা আবার ফেরত দিতাম। কাজেই প্রচুর পড়েছি। কেরালা ভারতের অন্য অঞ্চলগুলোর চেয়ে আলাদা। অনন্য। ভারতের অন্যান্য অঞ্চলে গ্রাম, ছোট শহর, বড় শহর—এগুলো আলাদা আলাদা; গ্রামগুলো শহরের সাংস্কৃতিক গতি থেকে বিচ্ছিন্ন। কেরালা সে রকম নয়। এখানেও শহর আছে, গ্রাম আছে। কিন্তু তাদের সংযোগটা প্রাকৃতিক। গ্রামে থেকে আপনি দেখতে পাচ্ছেন বর্ণপ্রথা; কিন্তু আপনার সঙ্গে দেখা হয়ে যাচ্ছে রোডস স্কলারের। চোখের সামনেই বহু কিছু ঘটতে দেখছেন। শহরের আইডিয়াগুলো, বইপড়া—সবই আপনি পাচ্ছেন। আবার গ্রামের জীবনকে কাছে থেকে দেখছেন। আমি যদিও ওই সমাজের অংশ ছিলাম না, তবে সব দেখছি।পড়েছেন?
আনিস: আপনি কি পোর্ট্রেট অব দ্য আর্টিস্ট এজ আ ইয়াংম্যান পড়েছিলেন?
অরুন্ধতী: হ্যাঁ। পড়েছিলাম। আমি পড়েছিলাম কিপলিং, শেকস্পিয়ার…
আনিস: হ্যাঁ। আমি আপনার ইউটিউব সাক্ষাৎকার দেখেছি, সেখানে আপনি বলেছেন আপনি শেক্সপিয়ার মুখস্থ বলতে পারতেন, জেন অস্টিন পড়েছেন।
অরুন্ধতী: কিন্তু এমন না যে আমি খুব বেশি পড়ুয়া মানুষ।
আনিস: তাহলে আপনি কী করে এত সুন্দর একটা উপন্যাস লিখে ফেললেন? আপনার দ্য গড অব স্মল থিংস নিয়ে একটামাত্র সমালোচনা আছে, বইটা অতিলিখিত। বেশি ঘষামাজা করা! তাই তো? কত দিন লাগল ওই উপন্যাসটা লিখতে?
অরুন্ধতী: চার-সাড়ে চার বছর?
আনিস: আপনি তো রোজ লিখতেন, না? সব মিলিয়ে উপন্যাসটির শব্দ কত, আশি হাজার?
অরুন্ধতী: এক লাখ।
আনিস: তাহলে তো রোজ লেখার দরকার পড়েনি!
অরুন্ধতী: না। আমি রোজ লিখতাম। এমন না যে আমি লিখতাম, আর পছন্দ হতো না বলে ছুড়ে ফেলে দিতাম। আমি যখন লিখি না, তখনো আমি লিখি। মনে মনে লিখি।আমার কাছে লেখালেখি ব্যাপারটা সংগীতের মতো। আমি এটা শুনি, দেখি না।
আনিস: দ্য মিনিস্ট্রি অব আটমোস্ট হ্যাপিনেস-এ আপনি বলেছেন কীভাবে একটা লন্ডভন্ড গল্প বলতে হয়। একটা গুবরে পোকার কথাও লিখেছিলেন উপন্যাসের শেষ অনুচ্ছেদে। একটা গোবরের পোকা চিত হয়ে পা উঁচু করে আছে। যদি আকাশ ভেঙে পড়ে, সে তার পা দিয়ে আকাশের পতন রোধ করবে।
অরুন্ধতী: হ্যাঁ। গোবরের পোকা। গুই কিয়োম।
আনিস: গুই ইজ শিট, রাইট?
অরুন্ধতী: হ্যাঁ। কাশ্মীরি শব্দ।
আনিস: বাংলাও অনেকটা তাই। আচ্ছা, এবার বলুন, আপনার এই বইয়ের শেষ বাক্যটা হলো, ‘মিস উদয়া জেবিন ওয়াজ কাম।’ এই ‘ওয়াজ’ (was) টি কেন?
অরুন্ধতী: এটা বিবলিকাল। ‘হ্যাড কাম’ (had come) দিলে সেটা স্বাভাবিক হয়ে যেত। বাইবেলে লেখা হয়, ধরা যাক, ক্রাইস্ট ওয়াজ কাম। আপনি আমার বইয়ে উদয়া জেবিনের জন্মের বর্ণনাটা খেয়াল করেছেন? এটা এই বইয়ের গোপন রহস্য, যা উন্মোচন করার জন্য আপনাকে বারবার পড়তে হবে। ‘দ্য ন্যাটিভিটি’ অধ্যায়ে আছে, ‘সে আবির্ভূত হলো আকস্মিকভাবে, মধ্যরাতের পর। কোনো দেবদূত গাইল না, কোনো ওয়াইজমেন গিফট আনল না। কিন্তু পুবের আকাশে তার আগমনকে স্বাগত জানাল নিযুত তারা।’ ক্রাইস্টের যা ঘটেছে, এখানে ঘটল তার উল্টো। সে একটা মেয়েবাচ্চা, সে কালো। জেসাসকে স্বাগত জানাল সব সুন্দর সৃষ্টিরা—ঘোড়া, গরু, মেষ। আর এখানে সব প্লাস্টিক ব্যাগ, পথের কুকুর। কংক্রিট রঙের টিকটিকি।