উষ্ণতা রোধে গাছের সুরক্ষা

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual1 Ad Code

নিউজ ডেস্কঃ যখন থেকে গাছ রক্ষায় প্রাণপন চেষ্টা করি তখন অরণ্য বলতে যা বুঝায় তার কিছুটা অবশিষ্ট ছিল। খুঁজে পেয়েছি সেগুন, শাল, মেহগনি কিংবা ইউক্যালিপটাসের বন। পাখি আর পোকা-মাকড়ের খুঁজে এখানে-সেখানে ঘুরে বেড়িয়েছি। এখন মাঝে মাঝে শাল, মেহগনি কিংবা সেগুনের দেখা মিললেও ঘন অরণ্যের দেখা মেলা ভার। প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় ঋতুচক্রের এ রকম বদল ঘটে। বৃক্ষচ্ছেদন ও অরণ্যের উপর অত্যাচার প্রকৃতির ভারসাম্য হারানোর পেছনে দায়ী। ফলে প্রকৃতি আজ বিপন্ন।

কয়েকদিন আগেও সিলেটে শতবর্ষী গাছের গোড়ায় লাল কাপড়ের বেষ্টনী দিয়ে গাছ রক্ষার দাবি জানানো হয়। তাতে লেখা ছিল, “হে পথিক, আমাকে হত্যার প্রস্তুতি চলছে! অক্সিজেন দিয়ে, ছায়া দিয়ে তোমাদের বাঁচাই। আমাকে বাঁচানোর বুঝি কেউ নেই!” এ আহ্বান সাঁটানো হয়েছে সিলেট নগরীর চৌহাট্টার শতবর্ষী গাছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) ও পরিবেশবাদী সংগঠন ‘ভূমিসন্তান বাংলাদেশের’ সদস্যরা স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে গাছ বাঁচাতে লাল কাপড়ে এ আহ্বান গাছের গায়ে লাগিয়েছেন।

গাছ কেটে কৃত্রিম সৌন্দর্য্য বৃদ্ধি করে আমরা প্রাকৃতিক পরিবেশকে বিষিয়ে তুলছি। যার ফলে পরিবেশের সাথে খাপ খাওয়ানো আমাদের দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে স্কটল্যাণ্ডের গ্লাসগোতে অনুষ্ঠিত পরিবেশ বিষয়ক শীর্ষ সম্মেলন কপ ২৬-এ মাননীয় প্রধানমন্ত্রী পরিবেশের উষ্ণায়ন রোধে জোরালো পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। তার আগেও পরিবেশ বিষয়ক প্রশংসনীয় কাজের স্বীকৃতি স্বরুপ আমাদের প্রধানমন্ত্রী ২০১৫ সালে পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়নস অব দ্যা আর্থ’ অর্জন করেন। পরিবেশ সুরক্ষায় ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করার জন্যই আমাদের এ বিশাল অর্জন। এ অর্জন আমাদের দেশের, আমাদের সকলের। এ অনবদ্য স্বীকৃতি পরিবেশের প্রতি আমাদের সমর্থন আরো জোরালো করে তুলে। কিন্তু, প্রতিনিয়ত গাছ কাটার ফলে পরিবেশের প্রতি যে জোরালো সমর্থন ছিল তা ক্ষণিকের জন্য হলেও স্তিমিত হয়ে আসে। অথচ, সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষার দায়িত্ব আমাদের সকলের। আমাদের বাঁচার তাগিদেই গাছকে রক্ষা করা জরুরী। গাছ-পালাকে রক্ষা করার বদলে কেটে ফেললে পৃথিবী নামক গ্রহে বেঁচে থাকাই কঠিন হবে।

জলবায়ু পরিবর্তনজনিত কারণে প্রত্যেক দেশ কোন না কোনভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে। তবে উপকূলীয় দ্বীপ রাষ্ট্রগুলো সবচেয়ে বেশে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে। জলবায়ু বিপর্যয়ের কারণে যে সকল উপকূলীয় দেশ অস্তিত্ব সংকটে রয়েছে তাদের মধ্যে বাংলাদেশ প্রথম সারিতে রয়েছে। এর জন্য দায়ী দেশসমুহের মাত্রাতিরিক্ত কার্বন নি:সরন। আইপিসিসি’র এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাতাস থেকে কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাসকে টেনে বের করার জন্য যে প্রচুর ব্যয়সাপেক্ষ প্রযুক্তি চালু রয়েছে তা বছরে মাত্র ৪ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস বাতাস থেকে টেনে বের করে নিয়ে আসতে পারে। অথচ, পৃথিবীতে এখনো যত গাছ আছে সকলে মিলে বছরে ৭৬০ কোটি মেট্রিক টন কার্বন ডাই-অক্সাইড গ্যাস টেনে বের করে নিয়ে আসতে পারে। যা আমেরিকার সারা বছরে বাতাসে জমাকৃত কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণের চেয়ে বেশি। কাজেই, সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষায় গাছের ভূমিকা অতি গুরুত্বপূর্ণ।

Manual6 Ad Code

তা সত্ত্বেও দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে অরণ্য নিধনের খবর শুনতে পাই। সোহারাওয়ার্দীতে গাছ কেটে রেস্তোরা নির্মাণ, চট্টগ্রামে শতবর্ষী গাছ কেটে হাসপাতাল নির্মাণ কিংবা কক্সবাজারের বনভূমিতে প্রশিক্ষণ একাডেমি তৈরির পরিকল্পনা দিন দিন আমাদেরকে শঙ্কিত করে তুলে। পরিবেশ বিপর্যয়ে এ সকল ধ্বংসাত্মক কাজ পরিবেশের সাথে সম্পর্কিত ইতিবাচক সকল অর্জনকে ম্লান করে দেয়, যা গোটা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। গাছ নির্মুলে পরিবেশের উপর নেতিবাচক প্রভাব জীবন-যাত্রাকে দিন দিন শঙ্কিত করে তুলে।

Manual7 Ad Code

আমাদের প্রাণ বাঁচানো এ গাছগুলোর মাঝে শতবর্ষী গাছও রয়েছে। মাঝে মাঝে এ খবরগুলো আমাদের যেমন বেদনাহত করে তেমনি মর্মাহত হই। তাই গাছ না কাটার জন্য সচেতন নাগরিকেরা বার বার আর্তি জানিয়ে আসছে। তাতেও গাছ নিধন বন্ধ করা যাচ্ছে না। অনেকসময় গাছ কাটার পাঁয়তারা চললেও প্রতিবাদের কারণে সাময়িক থেমে থাকে।

Manual4 Ad Code

আবার, প্রতিবাদের ভাষা জোরালো না হলে গাছ কাটা প্রতিহত করা সম্ভব হয়ে উঠে না। যে গাছের জন্য আমরা প্রাণভরে নি:শ্বাস নিতে পারি সেই গাছকে বাঁচানোর জন্য আন্দোলন করতে হয়! অথচ, গাছগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব আমাদের সকলের। গাছ কেটে আমরা যদি নিজেদের বিপদ নিজেই ডেকে আনি তবে ভবিষ্যতের ক্ষতিকর প্রভাব আমাদের উপর বর্তাবে। যার ফলে, আমরা আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুন্দর একটি পরিবেশ তৈরি করে দেওয়ার বদলে বিষিয়ে যাওয়া পরিবেশ তুলে দিচ্ছি। গাছকে রক্ষা না করে কৃত্রিম প্রাণ জাগালে তা আমাদের পরিবেশের জন্য অশনি সংকেত। তাই, ভবিষ্যত প্রজন্মকে সুন্দরভাবে বাঁচার বদলে অস্তিত্ব সঙ্কটে ফেলে দিবে! এ সঙ্কট ভবিষ্যত প্রজন্মের অস্তিত্ব রক্ষার সঙ্কট।

Manual5 Ad Code

বহুকাল আগে থেকেই মানুষের সাথে প্রকৃতির মেলবন্ধন রচিত হয়। তখন থেকেই গাছের সাথে মানুষের সখ্যতা তৈরি হয়। কিন্তু, মানুষ নিজের প্রয়োজনে প্রকৃতির উপর বিভিন্নভাবে আঘাত হানতে শিখে। তা থেকে বাদ যায়নি বন-জঙ্গল, গাছ-পালা। ফলে, প্রতিনিয়ত পরিবেশের উপর বিরুপ প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। পৃথিবীর উষ্ণতা বেড়ে যাওয়া এর অন্যতম কারণ। অন্যদিকে, উন্নয়নের নামে গাছ কর্তন করে আমরা নিজেদেরকে অস্তিত্ব সঙ্কটে ঠেলে দিচ্ছি। সে দায়ভার একান্তই আমাদের। অথচ গাছ রক্ষার নামে আন্দোলন গড়ে তুললেই কি গাছ কাটা বন্ধ হবে? একদিকে গাছকে বাঁচানোর আর্তি অন্যদিকে পরিবেশের উষ্ণায়ন রোধের প্রচেষ্টা! সবই যেন আমাদের আকুল আর্তি। তা যেন শেষ হবার নয়। তারপরও, উষ্ণায়নের প্রভাব থেকে মুক্ত করতে অরণ্য রক্ষার আবেদন আমরা করে আসছি। সেজন্যই হয়তো প্রকৃতি প্রেমিকরা বহুকাল আগে থেকেই নগরের বিনিময়ে অরণ্য ফেরানোর আর্তি করে আসছে। এমনকি প্রকৃতির গুরুত্ব উপলব্ধি করতে পেরে বিভিন্ন কবি বৃক্ষের বন্দনা তুলে ধরেন।

তবে, অরণ্যকে রক্ষা করার দায়িত্ব শুধু পরিবেশবাদীদের নয়। এ ব্যাপারে সাধারণ জনগনকে আরো সচেতন হতে হবে। একদিকে আমরা নির্বিচারে গাছ নিধন করছি অন্যদিকে গাছকে রক্ষার কথা মুখে বলে যাচ্ছি। কিন্তু, কতটুকু রক্ষা করতে পারছি। অথচ, আমাদের অস্তিত্বের প্রয়োজনে গাছকে রক্ষা করা প্রয়োজন।

প্রকৃতির স্বাভাবিকত্ব ফিরিয়ে আনা না হলে আস্তে আস্তে পরিবেশের অস্তিত্ব বিপন্ন হবে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া কয়েকটি প্রাকৃতিক দুর্যোগ যেন আমাদের আরও বেশি করে উপলব্ধি করতে শিখায়। বাঁচতে হলে পরিবেশকে বাঁচাতে হবে মর্মে মর্মে উপলব্ধি করতে হচ্ছে। তবে আশার কথা হলো, পৃথিবী ব্যাপি উষ্ণতা রোধে সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা চলছে। সে উদ্দেশ্যে প্রতি বছরই পরিবেশ বিষয়ক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মুলত: পরিবেশের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য গাছকে রক্ষা করাই হবে প্রথম শর্ত। তবেই প্রকৃতিতে ফিরে আসবে প্রাণের স্পন্দন।

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code