করোনাকালের বাজেট ভাবনা

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual6 Ad Code

ড. আতিউর রহমান: বিশ্বব্যাপী করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার পর বেশ কয়েক মাস কেটে গেছে। বাংলাদেশেও প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হওয়ার পর দুই মাসের বেশি কেটে গেছে। এখন স্পষ্টতই বোঝা যাচ্ছে, স্বল্পতম সময়ের মধ্যে ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়ে গেলেও করোনার স্বাস্থ্যঝুঁকি এবং এর আর্থ-সামাজিক প্রভাব কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লাগবে। এর মধ্যেই চলতি অর্থবছর শেষ হয়ে যাচ্ছে, আগামী মাসের (জুন ২০২০) শুরুতেই বসতে যাচ্ছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশন। ওই অধিবেশনে আসন্ন ২০২০-২১, এই একটি অর্থবছরের জাতীয় বাজেট প্রস্তাব করা হবে ঠিকই, কিন্তু করোনা দুর্যোগ মোকাবেলার মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় আর্থ-সামাজিক পরিকল্পনার একটি নির্দেশনাও এই বাজেট প্রস্তাবে থাকবে বলে বিশ্বাস করি। আশা থাকবে, এই বাজেট প্রস্তাবে স্বাস্থ্য খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। পাশাপাশি অন্য খাতের ওপর করোনা মহামারির যে প্রভাব পড়েছে, তা কাটিয়ে উঠার জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ করা এবং কর্মসূচির ঘোষণাও থাকা দরকার ২০২০-২১ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে।

করোনার ফলে সৃষ্ট স্বাস্থ্যগত হুমকি থেকে জনগণকে রক্ষা করার পাশাপাশি মহামারির ফলে একরকম অচল বিশ্ব অর্থনীতির প্রেক্ষাপটে আমাদের জাতীয় অর্থনীতি গতিশীল রাখা সত্যি একটি বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সর্বশেষ বিশ্ব অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলার অভিজ্ঞতা থেকে এ ক্ষেত্রে আমাদের কিছুটা আশাবাদী হওয়ার সুযোগ আছে। ২০০৮-০৯ সালের বিশ্বমন্দার মধ্যেও সরকারের সহযোগিতায় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্বে ব্যাপকভিত্তিক আর্থিক অন্তর্ভুক্তির কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভব হয়েছিল। আমার বিশ্বাস, এবারও একই কৌশল আমাদের রক্ষা করতে পারে। তবে অবশ্যই থাকতে হবে সচেতন এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিকল্পনা। আসন্ন ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট থেকেই এ পরিকল্পনা শুরু করতে হবে।

Manual3 Ad Code

এই প্রেক্ষাপটেই স্বল্প ও দীর্ঘতর মেয়াদে করোনা মহামারির স্বাস্থ্যগত ও অর্থনৈতিক প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে এবং জাতীয় সক্ষমতা ও আন্তর্জাতিক বাস্তবতার নিরিখে আসন্ন বছরের প্রস্তাবিত বাজেট বিষয়ে কিছু নীতি প্রস্তাবনা এখানে আলোচনা করছি।

Manual8 Ad Code

বাজেট বরাদ্দের ক্ষেত্রে আসন্ন অর্থবছরে বোধগম্য কারণেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে স্বাস্থ্য খাতকে। বাজেটের ৬ শতাংশের বেশি কখনোই এ খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। জিডিপির শতাংশ হিসাবে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ ১ শতাংশও নয়। এই অবহেলার ফলেই করোনা মহামারিকালে স্বাস্থ্য খাতকে দ্রুত প্রস্তুত করতে সক্ষম হইনি, জনগণকে পোহাতে হয়েছে ভোগান্তি। আসন্ন অর্থবছরে এই খাতে জাতীয় বাজেটের অন্তত ১০ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে এবং আগামী তিন অর্থবছর শেষে বাজেটের শতাংশ হিসাবে ২০ এবং জিডিপির শতাংশ হিসাবে ৪-এ উন্নীত করার সাহসী ঘোষণা করা দরকার। এই বাড়তি বরাদ্দ ব্যয় করতে হবে করোনা পরীক্ষা ও চিকিৎসার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো প্রস্তুতকরণের পাশাপাশি মহামারিকালে অন্য জরুরি স্বাস্থ্যসেবাও যাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে অব্যাহত রাখা যায়, তা নিশ্চিত করার জন্য। ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’কে শুধু স্লোগানে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এখনই সময়।

Manual7 Ad Code

স্বাস্থ্য খাতের পরে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বের দাবি রাখে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা খাত। এক দশক ধরে ধারাবাহিকভাবে এ ক্ষেত্রে জাতীয় বাজেটের ১০ শতাংশের বেশি বরাদ্দ হয়ে আসছে, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে বিদ্যমান বাস্তবতায় এ খাতে বরাদ্দ দ্বিগুণ করা দরকার। পাশাপাশি বরাদ্দের এই অনুপাত অন্তত আগামী তিন থেকে পাঁচটি অর্থবছরে ধরে রাখতে হবে। আমাদের দারিদ্র্যের হার সর্বশেষ হিসাব অনুসারে ২০ শতাংশের সামান্য বেশি হলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে আগে দারিদ্র্যরেখার ওপরে থাকা অনেক পরিবারই নতুন করে দারিদ্র্যে পড়বে বলে মনে হচ্ছে। ইউএনএফপিএ বলছে, বিশ্বব্যাপী করোনার ফলে দারিদ্র্য বাড়বে ৮ থেকে ১০ শতাংশ। বাংলাদেশের জন্য এ কথা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় প্রযোজ্য। কাজেই দারিদ্র্য নিরসনে বাংলাদেশের গত এক দশকের অর্জন ধরে রাখার জন্যই জাতীয় বাজেটের এক-পঞ্চমাংশ সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ দেওয়া দরকার। বরাদ্দ বৃদ্ধি করে কেবল বিদ্যমান কর্মসূচিগুলোর পরিসর বাড়ানোতে সীমাবদ্ধ থাকা যাবে না। বরং নতুন উদ্ভাবনী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে হবে। খাদ্য সহায়তা ও নগদ সহায়তার একটিকে অন্যটির বিকল্প হিসেবে না দেখে দুটিই চালু রাখতে হবে। মানুষের হাতে কেবল নগদ সহায়তা পৌঁছালে নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়তে পারে, তাই বাজার নিয়ন্ত্রণের জন্য হলেও চাই খাদ্য সহায়তা কার্যক্রম। আবার কেবল খাদ্য সহায়তা দিয়ে বিপুল জনগোষ্ঠীর চাহিদা যথাযথভাবে মেটানো সম্ভব নয়, তাই মানুষের হাতে টাকা পৌঁছাতে হবে, যাতে তারা চাহিদামতো কেনাকাটা করতে পারে। নগদ সহায়তা প্রদানে ডিজিটাল ফাইনান্সের কার্যকর ব্যবহারই কাম্য।

সীমিত সম্পদ সর্বোচ্চসংখ্যক নাগরিকের জীবন ও জীবিকা রক্ষার জন্য ব্যয় করতে হলে কৃষি খাতের দিকে মনোনিবেশ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০১২-১৩ থেকে ২০১৮-১৯ অর্থবছর পর্যন্ত কৃষি খাতে বরাদ্দ বাড়লেও বাজেটের শতাংশ হিসাবে এই খাতের অংশ ক্রমান্বয়ে কমে এসেছে (১১.৩ শতাংশ থেকে ৫.৭ শতাংশে নেমে এসেছে)। বিদ্যমান বাস্তবতায় আসন্ন ২০২০-২১ অর্থবছরে এ খাতে জাতীয় বাজেটের ১০ থেকে ১৫ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া দরকার বলে মনে হচ্ছে। কেবল ভর্তুকি কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধ না থেকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে কৃষিব্যবস্থা যাতে খাপ খাইয়ে নিতে পারে, সে জন্য নতুন উদ্ভাবনী কর্মসূচিতে অর্থায়ন দরকার। যেমন—সব অ্যাগ্রো-ইকোলজিক্যাল জোনে ফসল সংরক্ষণাগার তৈরির কর্মসূচি নিতে হবে, যাতে কৃষক ফসল সংরক্ষণ করে তার ন্যায্য মূল্য প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে পারে। খাদ্যশস্যের পাশাপাশি ফল ও সবজি বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রেও কৃষককে সহযোগিতা করতে হবে, ভেঙে পড়া সাপ্লাই চেইন নতুন করে টেকসইভাবে চালু করতে পারে। যেমন—আমের এই মৌসুমে সাতক্ষীরা, নওগাঁ, রংপুর, চাঁপাইনবাবগঞ্জের মতো এলাকায় খোলা মাঠে আম বিক্রির উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। সঙ্গে পাইকারদের ওই সব এলাকায় যাওয়া ও থাকা-খাওয়ার নিরাপদ ব্যবস্থার দায়িত্ব স্থানীয় প্রশাসন নিতে পারে। যে পরিবহনে আম বা লিচু আনা হবে তাদের জন্য প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ টোকেন দেওয়া যেতে পারে, যাতে পথে কোনো বাধার মুখোমুখি হতে না হয়। পাশাপাশি যেহেতু ফল আনতে যাওয়ার সময় তাদের খালি যেতে হবে, তাই ক্ষতি পুষিয়ে নিতে এদের জন্য স্টিমুলাস প্যাকেজ ঘোষণা করা যেতে পারে। রপ্তানি ও রেমিট্যান্স যেভাবে কমে যাচ্ছে, সে ক্ষেত্রে প্রসেসড অ্যাগ্রিকালচারাল প্রডাক্ট আমাদের নতুন রপ্তানি আয়ের ব্যবস্থা করতে পারে। সে জন্য উল্লিখিত এলাকাগুলোতে অ্যাগ্রো-প্রসেসিং প্লান্ট স্থাপন করা যেতে পারে। ঢাকার কাছে পূর্বাচলে এমন একটি প্লান্টের জন্য জমি বরাদ্দ দেওয়া আছে। বাজেটে এটিসহ অন্য এলাকাগুলোতেও এ রকম প্লান্ট স্থাপনের জন্য বরাদ্দ দেওয়া যেতে পারে। সংকটকালে আম, লিচু ইত্যাদি ফলের চাহিদা বাড়ানোর জন্য পুলিশ-বিজিবি-সেনা ব্যারাকগুলো, হাসপাতাল, জেলখানা ও এতিমখানায় এসব ফল সরকারের পক্ষ থেকে কিনে সরবরাহ করার উদ্যোগ নিলে ভালো হবে। একইভাবে স্থানীয় প্রশাসন এগুলো কিনে ত্রাণ হিসেবে বিতরণ করতে পারে। বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে ই-কমার্স প্ল্যাটফরমগুলো যাতে কাজ করতে পারে সে জন্য স্থানীয় প্রশাসনকে অগ্রণী ভূমিকা নিতে হবে। ঢাকার বাইরেও খুচরা ও পাইকারি কেনাকাটার ক্ষেত্রে অনলাইন কেনাবেচার সুযোগ তৈরি করলে কৃষকের পাশাপাশি তরুণ আইসিটি উদ্যোক্তারাও উৎসাহিত হবেন। বাজেটে কৃষির যান্ত্রিকীকরণে পিপিপির ভিত্তিতে ব্যক্তি খাত ও সরকারের যৌথ উদ্যোগের জন্য বরাদ্দ রাখতে হবে। করোনা পরিস্থিতিতে ধান কাটার ক্ষেত্রে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকিতে মেকানিক্যাল হারভেস্টার কেনার সুযোগ দেওয়ার সুফল আমরা দেখেছি। এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন এবং ব্যাপকতর পরিধির কর্মসূচি নিতে পারলে তা খুবই কার্যকর হবে।

প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত আমাদের শিক্ষা খাতের সব পর্যায়ে করোনার কারণে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। মহামারি পরিস্থিতিতে শিক্ষা খাতের চ্যালেঞ্জগুলো মাথায় রেখে এ খাতের বরাদ্দও বাড়াতে হবে। দীর্ঘদিন ধরেই শিক্ষা খাতে জিডিপির ২ শতাংশের আশপাশে যে বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছিল, তা দ্বিগুণ করার দাবি ছিল। উদ্ভূত বাস্তবতায় এ দাবি আরো জোরদার হয়েছে। শিক্ষার ডিজিটাল অবকাঠামো জোরদার করার মাধ্যমে দূরশিক্ষণ কর্মসূচি আরো বেগবান করা এখন সময়ের দাবি।

চীন থেকে বেরিয়ে যেতে ইচ্ছুক আন্তর্জাতিক বিনিয়োগকারীদের আকর্ষণ করতে চাইলে আগামী বাজেটে বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্পে, বিশেষ করে স্পেশাল ইকোনমিক জোনগুলো বাস্তবায়নে বাড়তি বরাদ্দ দরকার হবে। আর সার্বিকভাবে দেশের বিনিয়োগের পরিবেশ উন্নতকরণে বিশেষ মনোযোগ দিতে হবে। ভিয়েতনামও একই পথে হেঁটে সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধিতে সচেষ্ট হয়েছে।

আসন্ন বাজেটে ব্যয় বরাদ্দের প্রস্তাবগুলো থেকে এটা পরিষ্কার যে সরকারকে প্রত্যাশার চেয়ে বড় বাজেট ঘোষণা করতে হচ্ছে। কোনো অবস্থায় গতানুগতিক বাজেট দেওয়ার সুযোগ নেই। প্রকল্পসংখ্যা বেশি হলেই যথেষ্ট নয়। বরং প্রকল্পসংখ্যা কাটছাঁট করে স্বাস্থ্য, কৃষি ও সামাজিক সংরক্ষণে বেশি বরাদ্দ দিতে হবে। সংগত কারণেই ভাবতে হবে এই বাড়তি বাজেটের অর্থের উৎস নিয়ে। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের স্থবিরতার পরিপ্রেক্ষিতে বলাই যায় যে সরকারের কর থেকে আয় খুব বেশি বাড়ানোর সুযোগ নেই। ফলে বাড়তি ব্যয় মেটাতে ঋণই করতে হবে। আশার কথা হচ্ছে, এক দশকেরও বেশি সময় ধরে আমাদের বাজেট ঘাটতি ৫ শতাংশের আশপাশেই রাখা গেছে। ফলে আগের তুলনায় বেশি ঋণ নিয়ে আসন্ন অর্থবছরে বাজেট ঘাটতি একটু বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামও মনে করছে, আরো ১ শতাংশ বাজেট ঘাটতি বাড়ালে ঝুঁকি খুব বেশি বাড়বে না। আমি মনে করি, বাজেট ঘাটতি আরো বাড়ানো সম্ভব।

তবে সরকার কোন উৎস থেকে ঋণ নেবে সে বিষয়ে বাছবিচার দরকার আছে। ব্যক্তি খাতে চাহিদামতো ঋণের সরবরাহ বজায় রাখতে হলে দেশের ব্যাংকব্যবস্থার ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল না হওয়াই সমীচীন হবে। অন্যদিকে বিশ্বব্যাংক, এডিবি ও আইএমএফের মতো আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো করোনার প্রভাব কাটিয়ে উঠার জন্য সহজ শর্তে ঋণ দিতে শুরু করেছে। সামষ্টিক অর্থনৈতিক শক্তির বিচারে বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে স্বভাবতই অগ্রাধিকার পাবে (গার্ডিয়ান সাময়িকী করোনার অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবেলার সক্ষমতার বিচারে বাংলাদেশকে উদীয়মান দেশগুলোর তালিকায় প্রথম ১০টির মধ্যে রেখেছে)। আমরা এখন আর এলডিসি অর্থনীতি না হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগের তুলনায় বেশি সুদ দিতে হতে পারে। তবু ওই সুদের হার বাণিজ্যিক ব্যাংকের সুদের হারের চেয়ে কম হবে। তবে এসব সহজ শর্তের আন্তর্জাতিক ঋণ পেতে হলে সরকারিভাবে বিনিময় হার ও সুদের হার নির্ধারণ করার নীতি থেকে এক্ষুনি না হলেও ধীরে ধীরে সরে আসতে হবে। সেটাও দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করার এবং আর্থিক খাতের ভিত্তি মজবুত করার ক্ষেত্রে সহায়কই হবে। সরকার এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক আর্থিক সংস্থার কাছ থেকে ঋণের আবেদন করেছে। তবে অর্থনৈতিক কূটনীতি আরো জোরদার করে আবেদনকৃত ঋণের পরিমাণ আরো বাড়ানো সমীচীন হবে।

Manual7 Ad Code

এরই মধ্যে ব্যালান্স শিট সম্প্রসারণের মাধ্যমে দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে। যতক্ষণ আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠানের সহজ শর্তের ঋণ পাওয়া না যাচ্ছে, ততক্ষণ এ ধারা অব্যাহত রাখাই শ্রেয়। অনেকে বাজারে টাকার সরবরাহ বাড়াতে ‘প্রিন্টিং মানি’র প্রেসক্রিপশন দিলেও সেটা আদতে উন্নত অর্থনীতিগুলোর ক্ষেত্রেই বেশি কার্যকর হবে। আমাদের জন্য একটি মধ্যম নীতিই বেশি প্রযোজ্য। বাংলাদেশ ব্যাংক এর মধ্যে দেশের বাজারে ৭০ হাজার কোটি টাকার বেশি ঢোকানোর উদ্যোগ নিয়েছে রেগুলেটরি রিকোয়ারমেন্টস সহজীকরণ ও রিফাইনান্স স্কিম চালু করার মাধ্যমে। আগামী অর্থবছরে এসব কর্মসূচির পরিধি ব্যাপ্ত করতে হবে।

দেখা যাচ্ছে, করোনা ও পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবেলার জন্য বাড়তি অর্থের যেমন প্রয়োজন রয়েছে, তেমনি বাড়তি অর্থের ব্যবস্থা করার সক্ষমতাও বাংলাদেশের রয়েছে। প্রয়োজন শুধু সুচিন্তিত নীতি গ্রহণ ও তার দক্ষ বাস্তবায়ন। স্বল্পমেয়াদি চ্যালেঞ্জগুলোর পাশাপাশি মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জগুলোও বিবেচনায় রাখতে হবে। এই মুহূর্তে স্বাস্থ্য খাতে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ, ছোট-বড়, আনুষ্ঠানিক-অনানুষ্ঠানিক—সব খাতে প্রণোদনা, ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের জন্য নগদ ও খাদ্য সহায়তা, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণ ইত্যাদি উদ্যোগ জরুরি। তেমনি দীর্ঘতর মেয়াদে স্থিতিশীল ও সময়োপযোগী ফিসক্যাল ও মনিটারি পলিসি প্রণয়ন, অভ্যন্তরীণ চাহিদা বজায় রাখার মাধ্যমে অর্থনীতি সচল রাখা, স্বাস্থ্য খাতকে ঢেলে সাজানো এবং সব খাতের ডিজিটাল অবকাঠামো মজবুতকরণের মতো বিষয়গুলো বিবেচনায় নিয়ে নীতি প্রণয়ন করতে হবে।

বাজেট বরাদ্দ যতই বাড়ানো হোক, ‘লিকেজ ও স্পিলেজ’ নিয়ন্ত্রণে অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সফলতার স্বাক্ষর রাখতে হবে সরকারকে। ডিজিটাল সলিউশনের মাধ্যমে এনআইডিভিত্তিক উপকারভোগী শনাক্ত করা গেলে অপচয় অনেকটাই কমবে। গরিব অসহায় মানুষের তালিকা তৈরি নিয়ে যে অভিযোগগুলো উঠেছে তা তদন্ত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, বরাদ্দই যথেষ্ট নয়, বাজেট বাস্তবায়নে দক্ষতা ও স্বচ্ছতা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ।  স্টিমুলাসগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সব অংশীজনের সঙ্গে সর্বক্ষণ আলাপ-আলোচনা চালু রাখতে হবে। এ জন্য সরকারের সব বিভাগের পাশাপাশি ব্যক্তি খাত, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী এবং অ-সরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোকে সঙ্গে নিয়ে সুসমন্বিত উদ্যোগ একান্ত প্রয়োজনীয়। অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি মাত্রায় পারস্পরিক সহযোগিতা এবং উদ্ভাবনী কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমেই এ সংকট থেকে উত্তরণ সম্ভব। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতামত নিয়ে ধীরে ধীরে অর্থনীতি খুলে দেওয়ার বিষয়টি (এক্সিট পলিসি) সুসমন্বিতভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। আশপাশের দেশের অভিজ্ঞতাও মাথায় রাখতে হবে।

লেখক : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বঙ্গবন্ধু চেয়ার অধ্যাপক এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code