

নিউজ ডেস্কঃ
শ্যালিকাকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করেছিলেন দুলাভাই। কক্সবাজারের চকরিয়ায় ১৯৯৫ সালে সংঘটিত ঐ ঘটনায় বিচার শেষ হয়েছে চলতি বছর। মামলা দায়ের, তদন্তের পর নিম্ন আদালত থেকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ পর্যন্ত বিচার শেষ হতে এই মামলায় সময় লেগেছে ২৬ বছর। একইভাবে কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে সাবিনা খাতুন নামে এক কিশোরীকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করেছিল পাষণ্ডরা। ২০০৪ সালের সেই ঘটনার বিচারের তিনটি ধাপ সম্পন্ন হতে লেগেছে ১৭ বছর। ল্যাব এইডের চিকিত্সক ডা. নাজনীন হত্যা মামলার বিচার সম্পন্ন হতে লেগেছে ১৬ বছর। শুধু নাজনীন বা সাবিনাই নয়, এ ধরনের খুনের মামলা চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে লাগছে গড়ে ১৮ বছর। চলতি বছর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে এক ডজন খুনের মামলায় ফাঁসির আসামিদের আপিল নিষ্পত্তির তথ্য পর্যালোচনা করে এমন তথ্য পাওয়া যায়। তদন্ত ও বিচারের এই দীর্ঘসূত্রিতা থেকে বেরিয়ে আসতে বিপুলসংখ্যক বিচারক নিয়োগের পাশাপাশি মামলার তদন্ত দ্রুত সম্পন্নে পুলিশের ঊর্ধ্বতন প্রশাসনকে কঠোরভাবে মনিটরিং করতে হবে বলে জানিয়েছেন আইন কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক।
সংবাদ মাধ্যমকে তিনি বলেন, দেশে প্রচণ্ড রকমের বিচারকস্বল্পতা রয়েছে। এই মুহূর্তে ৪-৫ হাজার বিচারক দরকার। কিন্তু সেখানে আছেন দেড় হাজারের মতো বিচারক। একজন বিচারকের কোর্টে হাজার হাজার মামলা। এ কারণে মামলার বিচার শেষ হতে দীর্ঘ সময় লাগছে। এছাড়া তদন্েতর দীর্ঘসূত্রিতা, প্রসিকিউশনের অদক্ষতা, পুলিশের সময়মতো সাক্ষী হাজিরের ব্যর্থতা তো রয়েছেই। তিনি বলেন, সত্তরের দশকে সেশন কোর্টগুলোতে (দায়রা আদালত) খুনের মামলার বিচার হতো একনাগাড়ে। এক মামলার বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত অন্য মামলার বিচার শুরু করত না। এমনকি বিচারকও বদলি হতো না। কিন্তু এখন প্রায়শই দেখা যায়, বিচার শেষের আগেই সংশ্লিষ্ট কোর্টের বিচারক বদলি হয়েছেন একাধিকবার। এটাও বিচারের দীর্ঘসূত্রতার অন্যতম কারণ। বিচারপতি খায়রুল হক বলেন, শুধু বিচারক নিয়োগ করলেই হবে না, দক্ষ ও যোগ্য বিচারক নিয়োগ দিতে হবে। রায় লেখার মতো ক্ষমতাবান বিচারক লাগবে। উচ্চ আদালতে ফাঁসির মামলা নিষ্পত্তিতে ডেথ রেফারেন্স বেঞ্চ বাড়াতে হবে। তিনি বলেন, অধস্তন আদালতের অনেক বিচারক অবসরে গেছেন। কিন্তু তাদের মধ্যে অনেক বিচারক আছেন, যারা এখনো বিচার করার জন্য শারীরিক ও মানসিকভাবে উপযুক্ত। এদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে সরকার পাইলট প্রজেক্ট নিতে পারে। যদি সুফল মেলে, তাহলে খুনের মামলার বিচারে আর দীর্ঘসূত্রিতা থাকবে না। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিচারের এই দীর্ঘসূত্রিতায় অপরাধীর সর্বোচ্চ সাজা কার্যকর হলেও তা সমাজে অপরাধ দমনে কেমন প্রভাব ফেলে এ নিয়ে গবেষণা প্রয়োজন।
আপিল বিভাগে আপিল নিষ্পত্তি হওয়া এক ডজন খুনের মামলা পর্যালোচনা
এক ডজন খুনের মামলায় মুত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ফাঁসির আসামিদের আপিলের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির তথ্য পর্যালোচনা করা হয়। সেখানে দেখা যাচ্ছে, কোনো খুনের মামলা নিষ্পত্তিতে লাগছে ২৭ বছর। আবার কোনোটি নিষ্পত্তি হয়েছে ১৯ বছরে। সেই রকম একটি মামলা নওগাঁর টগর হত্যা। নওগাঁর কেসাই গ্রামে পুকুরে মাছের পোনা ছাড়াকে কেন্দ্র করে ১৯৯৪ সালে হত্যা করা হয় টগর নামের এক ব্যক্তিকে। ২০০৫ সালের ১০ জুলাই নওগাঁর অতিরিক্ত দায়রা জজ আদালত মামলার প্রধান আসামি ডা. নুরুল ইসলামকে মুত্যুদণ্ড এবং ১৮ আসামিকে যাবজ্জীবন সাজা দেয়। ২০১১ সালে হাইকোর্ট নুরুল ইসলামের সাজা হ্রাস করে যাবজ্জীবন এবং অপর আসামিদের সাজা বহাল রাখে। গত ৯ জুন আপিল বিভাগ ১৬ আসামিকে খালাস দেয়। ডা. নুরুল রাষ্ট্রপতির ক্ষমায় সাজা থেকে মুক্তি পান। চুয়াডাঙ্গায় ফিঙ্গে ও কমলা খাতুনকে ধর্ষণ শেষে হত্যা করা হয় ২০০৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর। এই হত্যা মামলায় আজিজুল ও মিন্টু ওরফে কালুকে মুত্যুদণ্ড দেয় চুয়াডাঙ্গার নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইবু্যনাল। ২০১৩ সালে সেই রায় বহাল রাখে হাইকোর্ট। চলতি বছরের ২৪ ফেব্র‚য়ারি দুই আসামির আপিল খারিজ করে ফাঁসি বহাল রাখে আপিল বিভাগ। গত ৫ অক্টোবর যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে দুজনের ফাঁসি কার্যকর হয়। এই মামলা নিষ্পত্তিতে লেগেছে ১৮ বছর। শ্যালিকাকে নিজ বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার কথা বলে ১৯৯৫ সালের ২০ আগস্ট পথিমধ্যে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ শেষে হত্যা করেন রিকশাচালক দুলাভাই ও তার বন্ধুরা। এ মামলায় আসামি আনোয়ারকে মুত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইবু্যনাল। ২০০২ সালের ২ নভেম্বর আসামির মুত্যুদণ্ড বহাল রাখে হাইকোর্ট। হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে ২০১৫ সালে আপিল করেন আসামি। চলতি বছরের ২২ জুন তার আপিল খারিজ করে মুত্যুদণ্ড হ্রাস করে তাকে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হয়। ইতিমধ্যে ঐ আসামি ২২ বছর ছিল কনডেম সেলে। ২০০০ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অন্তঃসত্ত্বা গার্মেন্টস কর্মী নাসিমাকে হত্যা করা হয়। সেই খুনের মামলায় ২০০৭ সালের ৩ এপ্রিল নাসিমার স্বামী টিপু ও তার দুই বন্ধুকে ফাঁসি দেয় নিম্ন আদালত। ২০১২ সালে সেই রায় বহাল রাখে। গত বছরের ১৭ নভেম্বর আসামিদের আপিল খারিজ করে ফাঁসি বহাল রাখে আপিল বিভাগ। এই মামলা নিষ্পত্তিতে লেগেছে ২০ বছর। ২০০৫ সালের ২৫ এপ্রিল ঢাকা থেকে যাত্রীবেশে মাইক্রোবাস ছিনতাই করে চালককে হত্যা করেন খোকন আকন্দ ও আল আমিন। ছয় বছর পর ২০১১ সালে তাদেরকে মুত্যুদণ্ড দেয় সিরাজগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ। ২০১৭ সালে হাইকোর্ট সেই রায় বহাল রাখে। চলতি বছরের ৯ আগস্ট আপিল বিভাগ আসামিদের আপিল খারিজ করে ফাঁসি বহাল রাখে। বিচারের তিনটি ধাপ শেষ হতে লাগল ১৭ বছর।
এছাড়া ১৯৯৭ সালে বাগেরহাটের নিজ বাড়িতে স্ত্রী ও শিশুসন্তান খুনের মামলায় মুত্যুদণ্ড হয় জাহিদ শেখের। সেই মামলায় ২০০০ সালের ২৫ জুন তাকে মুত্যুদণ্ড দেয় নিম্ন আদালত। ২০০৪ সালে হাইকোর্ট ফাঁসি বহাল রাখে। গত বছরের ২৫ আগস্ট আপিল বিভাগ তাকে খালাস দেয়। খালাস দেওয়ার আগ পর্যন্ত ২২ বছর ছিলেন কনডেম সেলে। এই মামলাটি নিষ্পত্তি হতে লেগেছে ২৪ বছর। ল্যাব এইডের চিকিত্সক ডা. নাজনীন হত্যা মামলা নিষ্পত্তিতে লেগেছে ১৭ বছর। ২০০৫ সালের ৭ মার্চ ল্যাব এইড হাসপাতাল থেকে বাসায় ফেরার পর গৃহকর্মীসহ তাকে কুপিয়ে হত্যা করেন তার স্বামীর আপন ভাগ্নে আমিনুল। এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নাজনীনকে ২০টি এবং গৃহকর্মীকে ২৪টি কোপ দেওয়া হয়। ধানমন্ডি থানায় করা মামলায় ২০০৮ সালে ঢাকার দ্রুত বিচার ট্রাইবু্যনাল আসামি আমিনুলকে মুত্যুদণ্ড দেয়। ২০১৩ সালে হাইকোর্ট সেই রায় বহাল রাখে। চলতি বছরের ১২ জুলাই আসামির আপিল খারিজ করে ফাঁসির রায় বহাল রাখার সিদ্ধান্ত দেয় আপিল বিভাগ। পটুয়াখালীর দশমিনার শিশু তানিয়া ধর্ষণ ও হত্যার বিচার শেষ হতে লেগেছে ১৬ বছর। ২০০৫ সালের ২০ সেপ্টেম্বর পটুয়াখালীর দশমিনার শিশু তানিয়াকে ধর্ষণ ও ধর্ষণ শেষে হত্যা করেন তিন পাষণ্ড। ২০০৬ সালের ২৭ এপ্রিল বরিশালের দ্রুত বিচার ট্রাইবু্যনাল আসামি মিরাজ খলিফা, নূর আলম হাওলাদার ও জাফর গাজীকে মুত্যুদণ্ড দেয়। হাইকোর্টের পর গত ২১ সেপ্টেম্বর দুই আসামির আপিল খারিজ করে মুত্যুদণ্ড বহাল রাখে আপিল বিভাগ। ২০০৩ সালে নারায়ণগঞ্জের সানারপাড়ে খুন হন কফিলউদ্দিন নামের এক ব্যক্তি। ঐ খুনের মামলা নিম্ন আদালত থেকে আপিল বিভাগ পর্যন্ত নিষ্পত্তি হতে লেগেছে ১৮ বছর। চলতি বছরের ২১ জুন আপিল বিভাগ তিন আসামির ফাঁসি হ্রাস করে যাবজ্জীবন দণ্ড দেয় সর্বোচ্চ আদালত। সিরাজগঞ্জে ২০০৪ সালের ১৮ ফেব্র‚য়ারি স্ত্রীকে অ্যাসিড দিয়ে তার মুখমণ্ডল ঝলসে দেওয়ার মামলায় স্বামী আকবর আলীর ফাঁসি গত পহেলা সেপ্টেম্বর বহাল রেখেছে আপিল বিভাগ। নিষ্পত্তিতে লেগেছে ১৭ বছর। ঢাকার শ্যামপুরে ব্যবসায়ী ফরিদউদ্দিন হত্যা মামলায় আসামি জসিমের মুত্যুদণ্ড বহাল রাখে আপিল বিভাগ। ২০০৮ সালে এই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় করা মামলা নিষ্পত্তি হতে লেগেছে ১৪ বছর। দ্রুত বিচার ট্রাইবু্যনালে মামলার বিচারের প্রথম ধাপ শেষ করায় নিষ্পত্তি হতে চার বছর কম লেগেছে। কুমিল্লার তানিম হত্যা মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হতে লেগেছে ১৫ বছর। এই মামলার আসামি মাহবুবের মুত্যুদণ্ড বহাল রেখেছে আপিল বিভাগ।
রিভিউ পিটিশন নিষ্পত্তিতে লাগে এক থেকে দুই বছর
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দেশের সর্বোচ্চ আদালত যখন কোনো আসামির ফাঁসি বহাল রাখে তখন ঐ রায়ের বিরুদ্ধে সাধারণত তিনি রিভিউ পিটিশন দায়ের করেন। সেই রিভিউর শুনানি ও নিষ্পত্তি হতে ছয় মাস থেকে অনেক সময় দেড় থেকে দুই বছর লেগে যায়।
যা বলছেন আইন বিশেষজ্ঞরা
ফৌজদারি আইন বিশেষজ্ঞ অ্যাডভোকেট সারওয়ার আহমেদ সংবাদ মাধ্যমকে বলেন, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা নিরসনে যে কোনো খুনের মামলার বিচার একনাগাড়ে পরিচালনা করতে হবে; কিন্তু কোনো বিচারক এটা অনুসরণ করেন না। যার কারণে বিচার বিলম্বিত হয়। বিচারকের সংখ্যা বৃদ্ধি, হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স বেঞ্চের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সালের ক্রম অনুযায়ী আপিল নিষ্পত্তির সঙ্গে সঙ্গে দ্রুত রিভিউর শুনানির উদ্যোগ নিতে হবে। তিনি বলেন, খুনের মামলার সাক্ষী আনার দায়িত্ব তদন্ত কর্মকর্তার। সেই সাক্ষীকে প্রসেস করে যথাসময়ে আদালতে উপস্হাপনের দায়িত্ব পিপির। এই দায়িত্ব কি সব মামলায় সঠিকভাবে পালিত হচ্ছে? তাই মামলার তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করার পাশাপাশি ট্রায়াল কোর্টে সাক্ষীকে যথাসময়ে আদালতে হাজির করতে হবে। কারণ সাক্ষী গড়হাজিরার কারণে মামলার বিচার বিলম্বিত হয়। জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, বিচারের দীর্ঘসূত্রিতা প্রকারান্তরে বিচারহীনতারই নামান্তর। এই দীর্ঘসূত্রিতায় আসামি ও ভিকটিম দুই জনই হয়রানির শিকার হতে পারেন। নিম্ন আদালতে কোনো আসামির ফাঁসি হলে ভিকটিমের স্বজনরা চায় দ্রুত ফাঁসি কার্যকর হোক; কিন্তু সব বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সেই দণ্ড কার্যকরে যদি ১৫/২০ বছর চলে যায় তাহলে বিচারের প্রতি বিচারপ্রার্থীর এক ধরনের আস্হাহীনতার সৃষ্টি হয়। তিনি বলেন, হাইকোর্টে ফাঁসির মামলা শুনানির জন্য পেপারবুক দরকার হয়। এই পেপারবুক ছাপানোর কাজটি করে বিজি প্রেস। যেখানে বাংলাদেশ নিজ অর্থায়নে পদ্মা সেতু নির্মাণ করছে সেখানে সুপ্রিম কোর্টের জন্য ৪৮ বছরেও একটি নিজস্ব প্রেস স্থাপন করা কি কষ্টসাধ্য ব্যাপার। এজন্য দরকার সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা।