গুগল ও ফেসবুকে চাকরি পেলেন শাবিপ্রবির একই বিভাগের তিন শিক্ষার্থী

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual8 Ad Code

বিশ্বসেরা পাঁচটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে একসঙ্গে বলা হয় বিগ ফাইভ। এতে রয়েছে অ্যাপল, মাইক্রোসফ্ট, জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক, গুগল ও ই-কমার্স জায়ান্ট অ্যামাজন। বেশ কয়েকবছর ধরে বাংলাদেশের তরুণরাও যোগ দিচ্ছেন এসব প্রতিষ্ঠানে। সম্প্রতি এই পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের তিনটিতেই চাকরির সুযোগ পেয়েছেন বাংলাদেশের আরও তিন তরুণ। সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের শিক্ষার্থী তারা।

 

 

এদের মধ্যে ফেসবুকের সফটওয়্যার প্রকৌশলী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন শাবিপ্রবির কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের ২০১৩-১৪ সেশনের ছাত্র মওদুদ আহমেদ শাহরিয়ার ও এম. নাজিম উদ্দিন। তবে শুধু ফেসবুক নয়, মওদুদ অ্যামাজন এবং নাজিম উদ্দিন গুগল থেকেও ডাক পেয়েছিলেন। এছাড়া একই বিভাগের ২০১৫-১৬ সেশনের ছাত্র তন্ময় কৃষ্ণ দাস চাকরি পেয়েছেন গুগলে।

 

বৃহস্পতিবার বিশ্বখ্যাত এই প্রতিষ্ঠানগুলোতে তাদের চাকরি পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত হয়। এরপর তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। বিভাগের শিক্ষক, সহপাঠী, সতীর্থদের অভিনন্দনের বন্যায় ভাসছেন এই তিন মেধাবী তরুণ।

 

ইত্তেফাকের সঙ্গে এক আড্ডায় তিন তরুণ মেধাবী তাদের স্বপ্ন জয়ের গল্প জানিয়েছেন। মওদুদ আহমেদ শাহরিয়ার বলেন, ‘ফেসবুকের ইউরোপের প্রধান অফিস লন্ডন থেকে গতকাল নিয়োগপত্র পাঠিয়েছে। তারা জানতে চেয়েছে, লন্ডন ছাড়া ইউরোপের অন্য কোন অফিস জয়েন করতে চাই কী না। আমি লন্ডন অফিসে থাকার কথাই বলেছি।’

 

তিনি বলেন, ‘মোট তিনটা ধাপে আমার ভাইবা নিয়েছে ফেসবুক কর্তৃপক্ষ। তিন নম্বর ধাপে ৪টা ভাইবা ছিল। প্রতিটি ভাইবার জন্য সময় দিয়েছে ৪৫ মিনিট করে। শাবিতে পড়াকালীন প্রোগ্রামিংসহ বিভিন্ন প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতাম। এই প্রতিযোগিতাগুলোর অভিজ্ঞতা ফেসবুকের ভাইবায় খুব কাজে দিয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘ফেসবুকের মতো জনপ্রিয় একটা সাইটে সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে নিয়োগ পেয়ে সত্যিই খুব ভালো লাগছে।

Manual6 Ad Code

 

এম. নাজিম উদ্দীন বলেন, ‘২০১৪ সালে যখন প্রোগ্রামিং শুরু করি, তখন থেকেই স্বপ্ন ছিলো পৃথিবীর টপক্লাস ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে টেক জায়ান্টে জব করার। ভার্সিটি শেষ হওয়ার পর থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করি গুগল, ফেসবুকের জন্য। প্রথম কয়েকবার এপ্লাই করে ব্যর্থও হই। কিন্তু সবসময়ই নিজের ওপর বিশ্বাস ছিলো। মনোবল হারাইনি। অবশেষে এই বছর জুন মাসে ফেসবুক এবং গুগল থেকে যোগাযোগ করে ইন্টারভিউ দেওয়ার জন্য। প্রায় দুই মাসব্যাপী ৬টা করে ইন্টারভিউ নেয় গুগল এবং ফেসবুক। সবগুলো ইন্টারভিউ ভালো হওয়ার পর দুই কোম্পানি থেকেই অফার করে। সবকিছু বিবেচনায় আমি ফেসবুকের লন্ডন অফিসের অফার গ্রহণ করি। কোনো জটিলতা না থাকলে আগামী ফেব্রুয়ারিতে সেখানে যোগ দিব।’

 

গুগলে চাকরি পাওয়া তন্ময় কৃষ্ণ দাস খানিকটা পেছনে ফিরে তাকাতে চাইলেন। তন্ময় বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে জাফর ইকবাল স্যারের বই পড়ে বড় হয়েছি, কাজেই আমার শাবিতে আসা ও কম্পিউটার সায়েন্সে পড়ার পেছনে জাফর ইকবাল স্যার একজন অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছেন। আর সত্যি বলতে, আগে প্রচুর গেম খেলতাম ও ভাবতাম, যদি সিএসসিতে ভর্তি হয়ে যেতে পারি, তাহলে কাজের নাম দিয়েই ইচ্ছেমতো গেমিং করা যাবে। ভর্তির পর শাহরিয়ার ভাইকে আমাদের বিভাগে প্রোগ্রামিংয়ে আমার মেন্টর হিসেবে পাই। তিনি সবসময় সহযোগিতা করেছেন।’ নাজিম উদ্দিনও যুক্ত করলেন, ‘শাহরিয়ার আর আমি আসলে মোটামুটি পুরোটা সময় প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় একই টিমে ছিলাম।’

 

টিমের কথা বলতেই মওদুদ আহমেদ শাহরিয়ার বললেন, ‘আমরা দুই বন্ধু ২০১৪ থেকে ২০১৮ পর্যন্ত একইসাথে একই টিমে থেকে নিজেদের মধ্যে একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতাম। ২০১৮ সালে একই টিমে থেকে প্রোগ্রামিংয়ে বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ প্রতিযোগিতা আইসিপিসির ওয়ার্ল্ড ফাইনালে অংশগ্রহণ করি। আর পরের বছর নাজিম না থাকায় আমি অন্য দল নিয়ে ঢাকা রিজিওনালে চ্যাম্পিয়ন হয়ে আবারও আইসিপিসির ওয়ার্ল্ড ফাইনালে অংশগ্রহণ করি।’

 

Manual1 Ad Code

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পুরো সময়টায় প্রোগ্রামিংয়ে অনুপ্রেরণা আর দিকনির্দেশক হিসেবে শিক্ষক মোঃ সাইফুল ইসলাম তাদের সঙ্গে ছিলেন বলে জানালেন তারা। তবে এই দুই বন্ধুর চেয়ে কিছুটা ভিন্ন গল্প তন্ময় কৃষ্ণ দাসের। বাকি দু’জনের মত একটানা প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা করেননি তিনি। ‘মাত্রই দ্বিতীয় বর্ষ পর্যন্ত প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতা করেছি, এরপর কিছুটা হতাশ হয়েই ছেড়ে দেই। এরপরের দুই বছর ডেভেলপমেন্ট, রিসার্চ আর ব্লকচেইনের কাজ করেছি। এইভাবে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষদিকে এসে চতুর্থবর্ষে আইট্রিপলি আয়োজিত একটি প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় আমাদের দল ঢাকা রিজিওনে চ্যাম্পিয়ন ও বিশ্বব্যাপী ৩৬তম হয়েছিল। এটিই আমার প্রোগ্রামিং যাত্রায় বড় একটি মাইলফলক ছিল’— বলছিলেন তন্ময়।

 

 

 

বিশ্বের শীর্ষ এই টেক জায়ান্টগুলোতে সাক্ষাৎকার দিয়ে সদ্য চাকরির সুযোগ পাওয়া এই তিন মেধাবীর কাছে গুগল, অ্যামাজান আর ফেসবুকের সাক্ষাৎকারের খুঁটিনাটি জানতে চাওয়া হয়। তিনটি ধাপের কথা উল্লেখ করে তারা বলেন, প্রথমত, সিভি দেখে সাক্ষাৎকারে ডাক পাওয়া, দ্বিতীয়ত, প্রোগ্রামিং দক্ষতা যাচাই। এই ধাপও পেরোতে পারলে অনসাইট সাক্ষাৎকারের সুযোগ দেওয়া হয়, যেটিতে মূলত ৪টি ধাপ থাকে। এতে দু’টি কোডিং, একটি সিস্টেম ডিজাইন আর অন্যটি আচরণগত কিংবা লিডারশিপ দক্ষতা যাচাই। এই সব ধাপ পেরোতে পারলেই বহুজাতিক এই কোম্পানিগুলো চাকরির সুযোগ প্রদান করে থাকে।

 

এসব প্রতিষ্ঠানে চাকরির জন্য কি প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা অত্যাবশ্যকীয় কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে নাজিম উদ্দিন তখন তন্ময়ের উদাহরণ দিয়ে বলেন, ‘তন্ময় অনেক কম প্রোগ্রামিং প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছে। কাজেই প্রতিযোগিতায় অংশ না নিলেও প্রবলেম সলভিং আর বিভিন্ন প্রজেক্টের মাধ্যমে নিজের সিভি গোছাতে হবে। গুগলের আয়ারল্যান্ডের ডাব্লিন সদর দপ্তরে ইতোমধ্যে চাকরি করা বুয়েটের অনিক সরকারের কাছে সিভি আর রেফারেন্স নিয়ে সহায়তা পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন তার কলেজের জুনিয়র তন্ময় কৃষ্ণ দাস।

 

নিজের প্রাপ্তির গল্প বলতে কিছুটা ইতস্তত বোধ করলেও জানা গেল, মওদুদ আহমেদ শাহরিয়ার ফেসবুকের সাথে অ্যামাজন ও অ্যাগোডা থেকেও অফার পেয়েছিলেন। আর নাজিম উদ্দিন একইসাথে ফেসবুক ও গুগল থেকে অফার পেয়েছিলেন। কিন্তু পরবর্তীতে তারা অ্যামাজান ও গুগলের অফারও প্রত্যাখ্যান করেন। আর ২০১৪ সালে শাবিপ্রবির প্রাঙ্গনে শুরু হওয়া সেই বন্ধুত্বের একসাথে পথচলার সময়টা ফেসবুকের ইউরোপীয়ান সদরদপ্তরে একইসাথে চাকরির সুবাদে আরো দীর্ঘায়িত হলো।

 

 

Manual5 Ad Code

 

Manual7 Ad Code

দেশের হাজারো শিক্ষার্থীর স্বপ্নের জায়গায় পৌঁছানো এই মানুষগুলোর কাছে তরুণ প্রজন্মের জন্য পরামর্শ চাওয়া হলে, মওদুদ আহমেদ শাহরিয়ার বলেন, ‘সত্যি বলতে বড় জায়গায় পৌঁছানোর জন্য নিজেদের আত্মবিশ্বাসটা খুবই জরুরি। সবার উচিত নিজের উপর ভরসা রেখে স্বপ্ন পূরণের জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা।’ তন্ময় কৃষ্ণ দাসও বললেন একই কথা। তিনি বলেন, ‘বিশ্বের যেকোনো জায়গা থেকেই এইসব টেক জায়ান্ট এ পৌঁছনো সম্ভব। নিজেদের উপর আত্মবিশ্বাস না হারিয়ে পরিশ্রম করে গেলে আমাদের দেশ থেকে আরও অনেক অনেক বেশি ছেলেমেয়ে বিশ্বের সবচেয়ে বড় এই বহুজাতিক কোম্পানি গুলোতে যেতে পারবে। আমাদের দেশের অনেক তরুণ আছেন যাদের ফেসবুক গুগলে চাকরি করার মতো যোগ্যতা রয়েছে। তবে সঠিক গাইডলাইন না থাকার কারণে তারা সেখানে যেতে পারছেন না। আমরা এক হয়ে এভবিষ্যতে কাজ করবো যাতে তারা সঠিক গাইডলাইন পান।’

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual7 Ad Code