গোয়ালন্দে ড্রেজিংয়ে বিলিন হচ্ছে ফসলী জমি

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual5 Ad Code

কুদ্দুস আলম, গোয়ালন্দ (রাজবাড়ী) :
মরা পদ্মার বুকে জেগে ওঠা ৫ বিঘা জমিতে বোরো ধান চাষ করে সারা বছর চলতো বাকপ্রতিবন্ধী দুই ভাই দরিদ্র নুরুল ইসলাম ও আ. মজিদের সংসার। কিন্তু অবৈধ বালু ব্যবসায়ীদের থাবায় সেই জমিতে এখন গভীর জল। হাউমাউ করে বহুবার ড্রেজিং বন্ধের আকুতি জানালেও কোন কাজ হয়নি। উপরোন্তু শুনতে হয়েছে নানা হুমকি ধামকি।
রবিবার সরেজমিনে রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের রবিউল্লাহ ব্যাপারী পাড়ায় পরিদর্শনে গেলে বোবা দুই ভাইয়ের মতো আরো অনেক কৃষক তাদের জমি হারানোর অভিযোগ করেন। স্থানীয় ওয়ার্ড আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ছোহরাব শেখ ও কুদ্দুস মাঝি নামের দুই ব্যক্তি ড্রেজার মালিকদের সাথে যোগসাজস করে এই মাটির ব্যবসায় সহায়তা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে তারা নিজেদের জমি হতে বিক্রি ছাড়া অন্য কারো বিষয়ে জানেন না বলে দাবী করেন।
ক্ষতিগ্রস্থ জমির মালিকরা জানান, গোয়ালন্দ পৌর এলাকার বাসিন্দা ড্রেজার মালিক আব্দুস সালাম, সুমন, গিয়াস উদ্দিন মোল্লাসহ কয়েকজন বিগত ৩ বছর ধরে ওই এলাকায় দুইটি ড্রেজার দিয়ে বালু তুলে বিভিন্ন জায়গায় বিক্রি করে মোটা টাকা হাতিয়ে নেন। জমির ২/১জন মালিককে তিনি চুক্তি মাফিক টাকা দিলেও আশপাশের ক্ষতিগ্রস্থরা কোন টাকা পাননি। উপরোন্তু তারা মাটি কাটা বন্ধ করার কথা বলতে গিয়ে বার বার অপদস্থ হয়েছেন। এ সব বিষয় নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। উত্তেজিত এলাকাবাসী গত বুধবার পাশ্ববর্তী মনির হোসেন নামের এক ব্যক্তির একটি ড্রেজার বন্ধ করে দিয়েছে। উপজেলার মরাপদ্মা নদীর দৌলতদিয়া ক্যানাল ঘাট থেকে উজানচর জামতলার হাট এলাকা পর্যন্ত এ ধরণের অন্তত ১৮ থেকে ২০টি অবৈধ ড্রেজার চলছে।
বাকপ্রতিবন্ধী নুরুল ইসলামের স্ত্রী রোকেয়া বেগম বলেন, এখানকার ৫ বিঘা জমিতে বোরোধান আবাদ করে আমরা দুটি পরিবার সারা বছর চলতাম। কিন্তু সেই জমি ওই ড্রেজার মালিকরা কেটে গভীর খালে পরিণত করেছে। আমার স্বামী-ছেলে ও দেবর বাঁধা দিতে আসলে ড্রেজারের মালিকরা ভয় দেখিয়ে তাড়িয়ে দেয়। এখন আমাদের খুবই দুর্দিনে পড়তে হবে।
স্থানীয় আ. রহিম মোল্লা, সুলতানউদ্দিন, মাছেম শেখ, আওয়াল, কাদের মোল্লা, আজাদ শেখসহ অনেকেই বলেন, এখানকার ড্রেজিংয়ের কারণে আমাদের প্রত্যেকেরই কম-বেশী ফসলী জমি নদীতে বিলিন হয়েছে। ড্রেজার মালিককে আমরা কিছু বলতে আসলে আমাদের নানাধরণের হুমকি দেয় এবং তারা প্রশাসনকে ম্যানেজ করেই মাটি কাটছে বলে আমাদেরকে জানায়। এভাবে মাটি কাটতে থাকলে আমাদের অপরিসীম ক্ষতি হয়ে যাবে। আমরা বারবার প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোন প্রতিকার পাইনি। এছাড়া এলাকাবাসীর চোখ এড়াতে এ সকল ড্রেজার মেশিন দিনে না চালিয়ে সারারাত চালানো হয় বলে তারা অভিযোগ করেন।
ক্ষতিগ্রস্থ অনেকেই জানান, দেখা যায় আমাদের জমি থেকে বেশ দুরে ড্রেজিং করছে। কিন্তু মুহুর্তের মধ্যে অনেক জায়গা নিয়ে ড্রেজিংয়ের গর্তে ফসলী জমি বিলীন হয়ে যায়। তখন আর কিছুই করার থাকে না। আর যেহেতু যারা অবৈধ ড্রেজিং ব্যবসার সাথে যুক্ত, তারা অত্যন্ত প্রভাবশালী তাই কিছু বলারও থাকে না। বড় ধরনের ক্ষতি হওয়ার পর ওই প্রভাবশালীরা ৫শ থেকে ১হাজার ধরিয়ে দিয়ে ধমকিয়ে দেয়। এরপর ওই টাকা নিয়ে চোখের পানি ফেলা ছাড়া আর কিছুই করার থাকে না।
এ বিষয়ে ড্রেজার মালিক আ. সালাম জানান, তিনি ওখানকার জমির মালিকদের কাছ থেকে জমি কিনে মাটি কাটেন। এর বাইরে কারো জমি ধ্বসে গেলেও বিষয়টি তার জানা নেই। আমরা কাউকে হুমকিও দেইনি। মাটি কাটার বিষয়ে তিনি প্রশাসনিক কোন অনুমতি নেননি বলে স্বীকার করেন। ওই ড্রেজার মেশিনটি তিনি ৩ মাস আগে সুমন নামের আরেকজনের কাছে বিক্রি করে দিয়েছেন বলে দাবী করেন। বর্তমানকার বিষয়ে সুমন বলতে পারবে। তবে সুমন জানান, আমি কেনার পর লকডাউন জনিত কারণে কোন মাটি কাটতে পারিনি।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু এখানেই না, উপজেলার দেবগ্রাম ইউনিয়নে মিনু মেম্বারের ২টি (আতর চেয়ারম্যান বাজারের পূর্বে ব্রিজ সংলগ্ন একটি ও আরেকটি বাঁধের উত্তরে নুরাল মেম্বরের জমিতে), কাদের ফকিরে ২টি (দৌলতদিয়া ক্যানাল ঘাট পান্নু মোল্লার বাঁশের সাকুর পশ্চিমে), উজানচরের যুবলীগ নেতা রবিউল ও জিন্দার, ব্যবসায়ী এলাহীম, মফি, হিরা, ইসমাইল, শহীদ, দৌলতদিয়া মরা পদ্মায় হাবিব, মজিবর, সালাম, মনির, লোকমান, আফজালের ড্রেজার দৌলতদিয়া ক্যানালঘাট প্রামানিক পাড়া এলাকায় এবং দেবগ্রাম এলাকায় সাহীন, কাদের ফকির , মুন্নাফ, সাইদ, মিনু মেম্বর , রফিক অবৈধ ভাবে মরা পদ্মা, ক্যানালঘাট ও এর আশপাশের এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ ভাবে নির্বিচারে ড্রেজিং কার্যক্রম চালিয়ে আসছে। এলাকাবাসীর অভিযোগ, বিভিন্ন সময় প্রশাসনের কাছে অভিযোগ দিয়েও বন্ধ করতে পারেনি অবৈধ ড্রেজিং কর্যাক্রম। প্রশাসনকে ম্যানেজ করে এ সকল ড্রেজিং মেশিন চলছে বলে অভিযোগ করেন তারা ।
এ প্রসঙ্গে দৌলতদিয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান মন্ডল জানান, অবৈধ ড্রেজিংয়ের কারণে ফসলী জমি হারানো মানুষের কান্না আর অভিশাপ সইতে পারছি না। কিন্তু আমাদের কিছুই করার নেই। প্রশাসন থেকে অবৈধ ড্রেজিং বন্ধের আশ্বাস দিয়েছে। এখন সেই অপেক্ষায় আছি।
গোয়ালন্দ উপজেলা নির্বাহী অফিসার রুবায়েত হায়াত শিপলু জানান, বর্তমানে গোয়ালন্দ উপজেলার কোথাও কোন ড্রেজিং মেশিন চলছে না। এ বিষয়ে উপজেলার সকল চেয়ারম্যানকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে যে, কোথাও ড্রেজিং মেশিন চললে প্রশাসনকে জানানোর জন্য। প্রশাসনকে ম্যানেজ করার বিষয়টি সম্পূর্ণ বানোয়াট। তারপরও যদি প্রশাসনের কেউ এর সাথে জড়িত থাকার অভিযোগ পাই কঠোর ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। তিনি আরো বলেন, ‘বর্তমানে আমি হোম কোয়ারেন্টাইনে আছি। এ পরিস্থিতিতে যদি কোন অবৈধ ড্রেজিং মেশিন চলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে সহকারী কমিশনার (ভুমি)কে নির্দেশ দিয়েছি।’

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code