

চাটমোহর (পাবনা) :
চলনবিলকে বলা হয় শস্যভান্ডার। আত্রাই ও গুমানী নদীর পানিতে তলিয়ে গেছে দেশের সবচেয়ে বড় এ বিল। ডুবে গেছে বোরো ধান, আলু, বাদাম, ভুট্টা, পাট, তরমুজ, করলাসহ অন্যান্য ফসল। ধান কাটার জন্য মাইকিং করে শ্রমিক ডাকা হচ্ছে। বাড়তি মজুরি দিয়েও শ্রমিক মিলছে না।
চলনবিলাঞ্চলের চাটমোহর, ভাঙ্গুড়া, ফরিদপুর, সিংড়া, গুরুদাসপুর, বড়াইগ্রাম, নলডাঙ্গা, নিয়ামতপুর, চন্দননগর, ভাবিচা, শ্রীমন্তপুর, বাহাদুরপুরে কয়েক হাজার হেক্টর জমি থেকে কোনো ফসল তোলা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে এসব এলাকার ছোটবড় সব চাষি বড় ধরনের ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
অতিরিক্ত খরা, আম্পান, কালবৈশাখী ঝড়, উজানের ঢলের পানি এই তিন দুর্যোগে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন চলনবিল অঞ্চলের বোরো চাষিরা। প্রথমে অতিরিক্ত খরার কারণে অনেক জমির ধানের শীষে দেখা দিয়েছে চিটা। কালবৈশাখী ঝড়ে ধানগাছ শুয়ে পড়ে শীষ থেকে ঝরেছে ধান। আবার উজানের ঢলের পানিতেও ডুবেছে বোরো ধান। এ নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে কৃষকরা।
কৃষি বিভাগ বলছে, অসময়ে এই প্রাকৃতিক দুর্যোগ নেমে এসেছে। অনেক স্থানে আধাপাকা ধান কেটে ঘরে তুলছেন চাষীরা। স্থানীয়রা জানান, সিংড়া এলাকায় আত্রাই নদীর কাছে বিলদহর-কৃষ্ণনগর এলাকায় বাঁধ আছে। নিজেদের সুবিধার জন্য স্থানীয় মৎস্যজীবীরা ২০১১ সালে বাঁধের একটি অংশ কেটে দেন। বাঁধের এ কাটা অংশ দিয়ে আত্রাই নদী থেকে প্রচন্ড ¯্রােতে চলনবিলে পানি ঢুকছে।
পানিতে ডুবে যাওয়া অন্যান্য ফসল ঘরে তুলতে না পারলেও জরুরিভাবে ধান কাটতে কয়েক দিন ধরেই স্থানীয়ভাবে মাইকিং করে দিনমজুর ডাকা হচ্ছে। অন্যান্য মৌসুমে ৫০০ টাকা চুক্তিতে শ্রমিক পাওয়া গেলেও এবার ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা দিয়েও পাওয়া যাচ্ছে না।
স্থানীয়রা জানান, পানিতে ডুব দিয়ে ধান কাটা খুব কষ্টের। শ্রমিকরা সারা দিন পানিতে ডুবে ধান কাটতে চাচ্ছেন না। ফলে বেশি মজুরি দিয়েও শ্রমিক মিলছে না। হান্ডিয়াল গ্রামের শুকুর আলীসহ একাধিক কৃষক জানান, চলনবিলের অধিকাংশ কৃষক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে চাষাবাদ করেন। হঠাৎ বন্যার ও ঢলের পানিতে ফসল ডুবে যাওয়ায় এখন কীভাবে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধ করবেন, সেই চিন্তায় তাদের ঘুম চলে গেছে।
চাটমোহর উপজেলার ডিকসির বিল, হরিপুরে বিলকুড়ালিয়া, বড়াইগ্রাম উপজেলায় জালোরা বিল, চিনিডাঙ্গা বিল, ভিটাকাজীপুর বিল ও কচুগাড়ি বিল, মাড়িয়া, বাজিতপুর, শ্রীরামপুরসহ বিভিন্ন নিম্নাঞ্চলে বৃষ্টির পানিতে ফসল ডুবে গেছে।
কৃষকরা জানান, ধানের পাশাপাশি পাট, তরমুজ, করলা, ভুট্টার জমি বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। করলা এবং পাটক্ষেত প্রায় সবটাই পানিতে তলিয়ে গেছে। অনেক জায়গায় কাঁচা-পাকা তরমুজ পানিতে ভাসতে দেখা গেছে। চাটমোহর উপজেলার নি¤œাঞ্চলেও উজান থেকে পানি এসে ডুবে যাচ্ছে উঠতি বোরো ধান। ইতোপূর্বে ঢলের পানিতে তলিয়ে যায় ডিকশি বিলসহ বিভিন্ন বিলের ধান। এ অবস্থায় কাঁচা-পাকা ধান কেটে নিচ্ছেন কৃষকরা। কাটা ধান নিয়ে যেতে হচ্ছে নৌকায়। বাড়তি মজুরি এমনকি উৎপাদিত ধানের অর্ধেক দিয়েও মিলছে না শ্রমিক।
শ্রমিক সঙ্কটে অনেক কৃষক বিলের ধান কাটতে পারছেন না। এতে অনেকেরই ধান পানির নিচে নষ্ট হচ্ছে। এতে কৃষকরা মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এব্যাপারে চাটমোহর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এএ মাসুম বিল্লাহ জানান, ভারী বর্ষণ ও অকাল বন্যায় বোরো ধানসহ অন্যান্য ফসলের ক্ষতি হয়েছে। আবহাওয়া প্রতিকুলে আসলে কৃষকের ক্ষতিগ্রস্ত হাত থেকে রক্ষা পাবে। সম্প্রতি ঘূর্ণিঝড় আম্ফানের কারণে চাটমোহর উপজেলায় ১৪৬ হেক্টর জমির ফসল ও আম-লিচুর ক্ষতি হয়েছে। তিনি বললেন, উপজেলার কিনু সরকারের জোলা দিয়ে নদী থেকে বিলে পানি ঢুকছে। এখানকার স্লুই গেট বন্ধ করার জন্য উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে বলেছি।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরকার মোহাম্মদ রায়হান জানান,ফসলের ক্ষতিরোধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কিনু সরকারের জোলার স্লুইস গেটটি বন্ধ করার জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডকে বলা হয়েছে।