নাইক্ষ্যংছড়ি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের অদুরে গড়ে উঠেছে ইটভাট : পরিবেশের সর্বনাশ

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual5 Ad Code
শামীম ইকবাল চৌধুরী,নাইক্ষ্যংছড়ি (বান্দরবান)থেকে :
নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নের এক প্রাথমিক বিদ্যালয়ের  অদুরে গড়ে তোলা হয়েছে ইটভাটা।
 ইতোমধ্যে ভাটায় নতুন ইটকাটা শুরু হয়েছে।
প্রধান সড়কের পাশে মজুদ করে  স্তুুপ করা হয়েছে কয়লা পাথর আর কাঠের কয়লা মিশ্রন।  এ ভাটায় এক যুগ ধরে  ইট পোড়ানোর কাজ চলছে নাইক্ষ্যংছড়ি প্রধান সড়ক ও পাহাড় গা-ঘেঁষে ধানি জমিতে।  সংগ্রহ করছে ফসলিয় জমির টপসয়েল ও পাহাড়ের মাটি।  এম,এ কালাম কলেজ,ছালেহ আহাম্মেদ সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ,মাধ্যমিক  বালিকা বিদ্যালয় ও তাংরা বিছামারা সরকারি  প্রাথমিক  বিদ্যালয়। এই সবই মিলে সহস্রাধিক  শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত যাতায়ত করতে হচ্ছে ইটভাটার এ প্রধানসড়ক দিয়ে।  এতে প্রতি বছরের ন্যায় এবারও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে পারে  বিদ্যালয়ের ৫ শতাধিক শিক্ষার্থী। এই নিয়ে  শংঙ্খায় পড়েছে অভিভাবকেরা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই বিভিন্ন ঠিকাদারী টেন্ডারে কাগজপত্র জোগার করে ফিক্সট চিমনির সাহায্যে দীর্ঘ এক যুগ ধরে এ ভাটায় ইট পোড়ানো হলেও কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যবস্থা গ্রহন করেননি। পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা অভিযান করতে এসে মূখ ফিরিয়ে চলে যাওয়াতে এলাকার লোকজনের মধ্যে আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠে।   প্রধান সড়ক এবং পাহাড়ের খাঁজে ইটভাটা স্থাপন নিয়ে  উপজেলা আইন-শৃঙ্খলা সভায় অনেকবার ভাটাটি বন্ধের দাবি করে আসলেও বন্ধ করা যাচ্ছেনা।
সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, নাইক্ষ্যংছড়ি  উপজেলা-সদর ইউনিয়নের তাংরা বিছামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যায়ের অদূরে  চাকঢালার প্রধান সড়ক।  পাহাড়ের গা-ঘেষেঁ এবং চাক সম্প্রদায়ের বৃহত্তর গনবসতি পাড়ার  চাক হেডম্যান পাড়া নামক  এলাকায়  ভাটাটি স্থাপন করেছেন সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান তোফায়েল আহাম্মেদের ছোট ভাই যুবলীগ নেতা জহির আহাম্মেদ  প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে বেশ পরিচিত। এই  ভাটাটির নাম দেয়া হয়েছে ” জেট,এ,সি ” ব্রিকস। এ ভাটার মাত্র ২শত গজের দুরে রয়েছে তাংরা বিছামার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি। দেড় কিলোমিটার দুরে রয়েছে হাজী এম,এ কালাম সরকারী কলেজ ও ২কিলোমিটার দুরে রয়েছে ছালে আহাম্মদ সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় এবং মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়। রয়েছে বেশ কয়েকটি  চাক-মার্মা ও বাঙালী সম্প্রদায়ের বসত গ্রাম ও ফলজ-বনজ বাগান।  ভাটায় ইট পোড়ানো শুরু হওয়ায় হলেই এ  প্রতিষ্ঠান গুলোর শিক্ষার্থীরা প্রতি বছর ন্যায়  অসুস্থ হওয়ার আশংন্ক রয়েছে।  এবারও স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে রয়েছে শিক্ষার্থীরা।
তাংরা বিছামারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম জানায়, ‘গত বছর ইটভাটা চালু হওয়ার পর হঠাৎ একদিন আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি। পরে ডাক্তারের নিকট গিয়ে চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে উঠি।’
একই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমন ও মোস্তাকিম জানায়, ইটপোড়ানো শুরু হলে শ্বাসকষ্টের সমস্যায় ভুগতে থাকে শিক্ষার্থীরা। এ সময় আমাদের ক্লাস করতে সমস্যা হয়। এছাড়া স্কুল মাঠের আম গাছগুলোর ফল নষ্ট হয়ে যায়। পরিপক্ক হওয়ার আগেই পচন ধরে গাছ থেকে ঝরে পড়ে আম।
ইট প্রস্তুত ও পোড়ানো পরিবেশ অধিদপ্তর আইনে (২০১৩ এর সংশোধনী) উল্লেখ রয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বাগান ও আবাসিক এলাকার ১ কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা স্থাপন করা যাবে না। এ আইনের তোয়াক্কা না করেই দুটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাত্র ২৫০ মিটার দুরে ভাটাটি স্থাপন ও দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে ইটপোড়ানোর কাজ করে আসছেন যুবলীগ নেতা জহির আহাম্মেদ। কোন খুঁটির জোরে ভাটা মালিক আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলী দেখিয়ে ইটপোড়ানোর কাজ করে আসছেন। এনিয়ে স্থানীয়দের মাঝে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
উপজেলা চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো,শফি উল্লাহ  জানান, ‘শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছে ইটপোড়ানো বন্ধ রাখার জন্য ভাটামালিক জহির আহাম্মেদকে  বারবার নিষেধ করার পরও তা মানছেন না। চেয়ারম্যান অভিযোগ করে বলেন, ভাটার মালিক জহির আহাম্মেদ এক যুগ ধরে পরিবেশ অধিদপ্তরসহ প্রশাসনের কর্তাব্যক্তিদের কিনে পকেটে রেখেছেন তিনি। এবিষয়ে প্রশাসনের কোথাও অভিযোগ দিয়েও কাজ হবে না।’ তবে এবারে ইউএনও ম্যাডাম অবৈধ ইটভাটা গুলোতে বান্দবানের পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাসহ অভিযান চালিয়ে ঘুমধুমে বেশ কয়েকটি ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে জরিমান করেছেন।
ভাটামালিক জহির আহাম্মেদ জানান, ‘পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েই ভাটার কার্যক্রম পরিচালনা করছি। কয়লার পরিবর্তে ভাটায় খড়ির মজুদ কেন জানতে চাইলে এ প্রসঙ্গ এড়িয়ে যান তিনি।’
নাম প্রকাশ না করা শর্তে
তাংরা বিছামারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের   শিক্ষক  জানান, ‘ আমি এ প্রতিষ্ঠানে যোগদান করার  অনেক আগে থেকেই বিদ্যালয়ের পাশে ইটভাটাটি রয়েছে। ইটভাটা থেকে যে কালো ধোঁয়া নির্গত হয় তা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকারক। এতে বিদ্যালয়ের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা মাঝে মধ্যেই শ্বাসকষ্টসহ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়।’ এই ভাটা কার্যক্রমের মুসৌম আসলে বেশীর ভাগ  শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে বার্ষীক পরীক্ষায় অনুপস্থিত থাকে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাদিয়া আফরিন কচি জানান,
গত ৩ ডিসেম্বার  উপজেলার ঘুমধুমে অবৈধ ইট ভাটায় ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান চালানো হয়েছে নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট ও পরিবেশ অধিদপ্তর যৌথভাবে।  পৃথক দুটি অভিযানে আজুখাইয়া এলাকায় ৭০হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে । তিনি আরও
জানান, সদরের জেট,এ,সি  ব্রিকসের মালিক জহির আহাম্মেদ ইটপ্রস্তুত ও পোড়ানোসহ পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে কি না সেটি আমার জানা নেই। এবিষয়ে কোন কাগজপত্র আছে কিনা দেখতে হবে।  তদন্ত করে আইনী ব্যবস্থা গ্রহন করা হবে। এছাড়া লাইসেন্সবিহীন প্রত্যেকটি ইটভাটার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া অব্যাহত রয়েছে।
বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের সিনিয়র কেমিস্ট একে,এম ছামিউল আলম  জানান, ‘বিদ্যালয়, বাগান ও আবাসিক এলাকার  ১ কিলোমিটারের মধ্যে এবং প্রধান সড়কের পাশে ভাটা স্থাপন করে ইট প্রস্তুত ও পোড়ানো আইন সম্মত নয়। জেট,এ,সি  ব্রিকস এ নীতিমালা লঙ্ঘন করে ভাটার কার্যক্রম পরিচালনা করলে তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’
—————–
সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual2 Ad Code