

সম্পাদকীয়: রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলো জীবনধারণের মৌলিক উপকরণাদি ন্যায্যমূল্যে জনগণের কাছে সহজলভ্য করা। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, এ দেশে ন্যায্যমূল্যে জীবনধারণের মৌলিক উপকরণাদি প্রাপ্তি একটি দুরূহ ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মৌলিক উপকরণাদির আকাশচুম্বী দাম যখন এক দিকে সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে, তখন অন্য দিকে তাদের আয় হ্রাস, মূল্যস্ফীতি দারিদ্র্যহারকে ঊর্ধ্বমুখী করেছে। কেন এমন হচ্ছে তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের উদ্দেশ্য।
মৌলিক উপকরণগুলোর মধ্যে প্রধান হচ্ছে অন্ন। অন্ন বলতে সাধারণত ভাতকে বোঝায়। চাল থেকে রূপান্তরিত ভাত দেশের ৮০ শতাংশের বেশি মানুষের প্রধান খাদ্য। ভাত আমাদের ক্যালরির প্রধান উৎস। গত দেড় যুগে এ খাদ্যপণ্যটির দাম বেড়েছে ৪০০ থেকে ৫০০ গুণ। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে আমি খাদ্য মন্ত্রণালয়ে সচিব ছিলাম। ২০০১-০২ অর্থবছরে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎপাদন থেকে মোটা আমন চাল কেজিপ্রতি ১২ টাকা ৫০ পয়সা এবং বোরো চাল কেজিপ্রতি ১৩ টাকায় কিনেছিল। উল্লেখ্য, ধান কাটা-মাড়ার মৌসুমে সরকারের সংগ্রহ অভিযান শেষে খোলা বাজারে পণ্যটির দাম সাধারণত সরকারের সংগ্রহমূল্যের চেয়ে কিছুটা বেশি থাকে। চলতি আমন মৌসুমে সরকার প্রতি কেজি মোটা চাল ৪২ টাকায় কেনার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, বিশ্বব্যাপী বৈরী আবহাওয়ায় চাল উৎপাদনকারী দেশগুলোতে পণ্যটির উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে চালের দাম কিছুটা বেড়ে যাওয়া এবং দেশে উৎপাদিত ধান-চালের ব্যবস্থাপনায় সরকারি দুর্বলতার কারণে বাজারে প্রতি কেজি মোটা আমন চাল কমবেশি ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। প্রশ্ন হলো, গত দেড় যুগে সাধারণ মানুষের আয় কি ৪০০ গুণ বেড়েছে?
একাধিক কারণে চালের উচ্চমূল্য সাধারণ মানুষের জীবনে ভীতিকর হয়ে দাঁড়ায়। এক. বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) হিসাবে জাতীয় পর্যায়ে একটি পরিবারের মাসিক মোট ব্যয়ের ৫৪ দশমিক ৮১ শতাংশ খরচ হয় খাদ্যে। আবার মাসিক মোট খরচের ৩৫ দশমিক ৯৬ শতাংশ ব্যয় হয় চাল কেনায়। তাই চালের দাম বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জনগণের দুর্ভোগ বাড়ছে। দুই. চালের, বিশেষ করে মোটা চালের দাম বৃদ্ধির ক্ষতিকর প্রভাব ওই চালের সব শ্রেণির ভোক্তার ওপর পড়লেও সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে দরিদ্র ও হতদরিদ্র পরিবারগুলো। তিন. শুধু দরিদ্র ও হতদরিদ্ররা নয়, চালের দাম বৃদ্ধিতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তরাও, বিশেষ করে যাদের আয় নির্দিষ্ট। চালের দামে ঊর্ধ্বগতির কারণে মধ্যবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে দিতে হচ্ছে। প্রধান খাদ্যশস্য চাল ছাড়াও খাদ্যের অন্যান্য উপাদান যেমন-আটা, ময়দা, ডিম, ভোজ্যতেল, মাছ-মাংস, দুধ, মসলা, ফল ইত্যাদির উচ্চহারে মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে। এতে মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তের পক্ষে আমিষজাতীয় খাদ্য কেনা কষ্টকর হয়ে পড়েছে। ফলে তাদের পরিবারে, বিশেষ করে শিশু ও মহিলাদের পুষ্টির অভাব ঘটছে।