

জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অনেক বিষয়ে আমি উদাসীন ছিলাম। তার মধ্যে ফরাসী জাতীয়তার বিষয়টিও ছিল। ভাই-বোনেরা আমাকে সবসময়ই বোঝাতো যে, দেশে থাকি সেখানকার জাতীয়তা যেন নেই। তাদের বলতাম পাসপোর্ট নিয়ে কী হবে? আমি তো অন্যদেশে যেতে চাই না। ফ্রান্সে আসার সময় দেখেছি পাসপোর্ট নিয়ে অনেকেই লন্ডন চলে যেত। যেহেতু আমি ফ্রান্স ছেড়ে কোথাও যাচ্ছি না তাই পাসপোর্টের বিষয়ে ছিলাম উদাসীন। অবশ্য এই উদাসহীনতার পেছনে যথেষ্ট কারণও ছিল।
প্রবাসে আমার কর্মজীবন শুরু হয় প্রাইভেট কোম্পানিতে। যেখানে পার্মানেন্ট হতে জাতীয়তার প্রয়োজন নেই। তবে বড় আপা লন্ডনে স্থায়ী হওয়ার পর একবার সব কাগজপত্র সংগ্রহ করে বারবার অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিতে চেষ্টা করেও পারিনি। তখন ফরাসী পাসপোর্ট পাওয়া অনেক সহজ ছিল কিন্তু অ্যাপয়েন্টমেন্ট পাওয়া ছিল খুবই কষ্টের। কয়েকবার চেষ্টা করেও না পেয়ে আবেদনপত্র কোথায় যে রেখেছি স্মরণ নেই। ঘটনাটি ২০১৭ সালের।
ওই সময় প্রাইভেট কোম্পানিতে চাকরির পাশাপাশি দেশটির নার্সারি-প্রাইমারি স্কুলগুলোতে (পৌরসভার অধীনে) চাকরি খুঁজতে লাগলাম। আপা তখন বললেন স্কুলে চাকরি করা সম্ভব তবে ফরাসী জাতীয়তা না হলে কখনোই স্থায়ী হবে না (সরকারি)। উপায় না পেয়ে ৬ মাসের চুক্তিভিত্তিক কাজ করতে থাকি।
কাজ স্থায়ী হবে না জেনেও সিভি (জীবন বৃত্তান্ত) আর মোটিভেশন লেটার লিখে পৌরসভায় সাবমিট করলাম। এর কিছুদিনের মধ্যেই আমাকে ডাকা হলো সাক্ষাৎকার দেয়ার জন্য। সব ঠিকঠাক হওয়ার পরই বলে দিল আমাকে নিয়োগ দেয়া। ৪-৫ দিন পর জয়েন করার ডেট জানিয়ে দেয়া হবে।
কিন্তু ‘বিধি বাম’ জয়েন করার আগের দিন হেড অফিস থেকে কল করে জানানো হলো ‘আপনি ওই তারিখে জয়েন করতে পারছেন না কারণ ফ্রান্সের শ্রম আইন অনুযায়ী দুইটি কাজ মিলিয়ে আপনার সপ্তাহে ৫০ ঘণ্টা হয়ে যায়। যেখানে সপ্তাহে ৪৪ ঘণ্টা করা যাবে। আপনি যদি পৌরসভার অধীনে চাকরি পেতে চান তাহলে অবশ্যই আপনার বর্তমান কর্মঘণ্টা থেকে সপ্তাহে ৬ ঘণ্টা কমিয়ে নেবেন। তার লিখিত প্রমাণ আমাদের দিতে হবে সাথে অবশ্যই দ্বিতীয় জব করার লিখিত পারমিশনও নিতে হবে। তারপরই আমরা আপনাকে নতুন করে নিয়োগ দেয়ার চেষ্টা করব’।
তখন আমার হেডের সঙ্গে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা করি। তিনি আমার বিষয়ে হেড অফিসে জানালেন। হেড অফিসের দায়িত্বে যিনি ছিলেন তিনি অনেক ভালো হওয়ায় আমার কর্মঘণ্টা কমিয়ে দেয়ার আশ্বাস দিলেন। তিনমাস পর প্রাইভেট জবের কর্মঘণ্টা কমিয়ে প্রমাণসহ সাথে দ্বিতীয় জব করার অনুমতিপত্রও পাই। এরপর আমার ডিরেক্টরের সহযোগিতায় ফাইলের কাজ শেষ করে পৌরসভায় জমা করলাম।