বিদ্যুৎ পৌঁছেছে প্রান্তিকে, ডিজেলের মূল্যবৃদ্ধিতে নিষ্পেষিত জীবন

লেখক: Shiuly
প্রকাশ: ৫ years ago

Manual1 Ad Code

নিউজ ডেস্কঃ 

ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানোর কার্যক্রমকে জোরদার করার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল ২০২ সাল। লক্ষ্য ছিল বিদ্যুতের সঙ্গে সঙ্গে জ্বালানিতে সফলতা অর্জন করা। কিন্তু বছরজুড়ে জ্বালানি খাতে তেমন কোনো সুখবর মেলেনি। বরং দিন দিন কমেছে প্রধান জ্বালানি গ্যাসের সরবরাহ। রান্নার গ্যাস এলপির দাম ছিল বছরজুড়ে ক্রেতার নাগালের বাইরে। সমুদ্রে বহুল প্রত্যাশিত অনুসন্ধান কার্যক্রম এখনো শুরুই হয়নি। সুখবরের মধ্যে রয়েছে শুধু স্থলভাগের একটি ছোটো গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কার। আর বছরের শেষ প্রান্তিকে ডিজেল-কেরোসিনের মূল্যবৃদ্ধি দেশের অর্থনীতি ও জনজীবনে চরম ভোগান্তি ডেকে আনে।

আন্তর্জাতিক বাজারেও তেল-গ্যাসের দাম ছিলো ঊর্ধ্বমুখী। অগ্রগতি কম এমন ১০টি কয়লাবিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল হয়েছে। রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মাতারবাড়ি ও রামপাল কয়লা বিদ্যুৎ প্রকল্প, একাধিক তেলপাইপ লাইনসহ চলমান বিভিন্ন উন্নয়নমূলক প্রকল্প করোনা মহামারির মধ্যে অল্পবিস্তর এগিয়েছে। সব মিলিয়ে বলা যায় শেষ হতে যাওয়া বছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে তেমন সফলতা আসেনি, শুধু ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ সংযোগ ছাড়া।

বিদ্যুৎ পৌঁছেছে প্রান্তিকে

দেশের বিভিন্ন চরাঞ্চল, দুর্গম পাহাড় বা বিচ্ছিন্ন দ্বীপাঞ্চলে বিদ্যুতের সংযোগ পৌঁছে গেছে। গ্রিড বিদ্যুৎ পৌঁছানো সম্ভব না হলে সৌর বিদ্যুতের আলোয় আলোকিত হয়েছে সুবিধাবঞ্চিত এলাকাগুলো। পাল্টে গেছে তাদের জীবন ও জীবিকা। শতভাগ বিদ্যুতায়নের সবথেকে বড় কাজটি করেছে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি)।

আরইবি বলছে গ্রিডের বাইরে থাকা ৭১১টি গ্রামের ১ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯ জন গ্রাহকের এলাকায় তারা এরমধ্যে বিদ্যুৎ পৌঁছে দিয়েছে। প্রথমে দেশের ২৪টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির দুর্গম এলাকাকে চিহ্নিত করা হয়। এরমধ্যে ১৬টি এলাকায় সাবমেরিন ক্যাবলের মাধ্যমে বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। গত কয়েক বছর আগে যা কল্পনাই করা সম্ভব ছিল না। সূত্র বলছে নতুন করে চিহ্নিত ৩৪৮ গ্রামের ৮০ হাজার ৩৭৮ বাসিন্দাকে বিদ্যুৎ সংযোগের আওতায় আনার কাজ করা হচ্ছে। আগামী জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি নাগাদ এই কাজ শেষ হলে সব মানুষের ঘরেই বিদ্যুৎ পৌঁছে যাবে, যা ৯৯ দশমিক ৯৯ ভাগ। আর দশমিক এক ভাগ মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ পৌঁছানো বাকি থাকবে, যার একটা বড় অংশ পার্বত্য চট্টগ্রাম। পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদ বিদ্যুৎ সুবিধাবঞ্চিত পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর মধ্যে এই সুবিধা পৌঁছে দিতে কাজ করছে।

২৮তম গ্যাসক্ষেত্র

Manual8 Ad Code

সিলেটের জকিগঞ্জে নতুন গ্যাসক্ষেত্র পাওয়া গেছে। এটি থেকে প্রতিদিন এক কোটি ঘনফুট গ্যাস তোলা যাবে বলে আশা করা হচ্ছে। দেশের ২৮তম গ্যাসক্ষেত্র এটি। এখানে মোট ৬ হাজার ৮০০ কোটি ঘনফুট (৬৮ বিসিএফ) গ্যাস আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। গত ৯ আগস্ট সরকার এই গ্যাসক্ষেত্র আবিস্কারের ঘোষণা দেয়।

Manual8 Ad Code

কমেছে গ্যাস সরবরাহ

বর্তমানে দৈনিক গ্যাসের মোট চাহিদা ৪৩০ কোটি ঘনফুট।  তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসসহ (এলএনজি) পেট্রোবাংলা বর্তমানে দিচ্ছে কম বেশি ২৮৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস। গত বছরও এর পরিমাণ ছিল ৩৩০ কোটি ঘনফুট। এলএনজির ঊর্ধ্বমূল্য, দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়ায় সরবরাহ কমে গেছে। বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত দু’টি এলএনজি টার্মিনালের সরবরাহ সক্ষমতা দিনে ১০০ কোটি ঘনফুট। ২৭ ডিসেম্বর সরবরাহ করা হয় ৫৪ কোটি ঘনফুট।

এলপিজিও নাগালের বাইরে

আদালতের নির্দেশনায় গত ১২ জানুয়ারি প্রথমবারের মতো তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস  (এলপিজি) নিয়ে গণশুনানি করে এনর্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। গত ১২ এপ্রিল প্রথমবারের মতো আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয় করে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে বিইআরসি। এরপর প্রতি মাসেই আমদানি মূল্য বিবেচনায় নিয়ে এলপিজির দাম সমন্বয় করে আসেছ বিইআরসি। কিন্তু বাজার নির্ধারিত দামে গ্যাস পান না গ্রাহকেরা।

লোকসানের অজুহাতে এলপিজি বিক্রেতারা নিজেদের মতো করেই এলপি গ্যাস বিক্রি করে যাচ্ছিল। পরবর্তীতে ব্যবসায়ীদের দাবির মুখে নতুন করে গত সেপ্টেম্বরে আবার গণশুনানি করে কমিশন। চলতি মাসের জন্য এলপিজির ১২ কেজি সিলিন্ডারের বিইআরসি নির্ধারিত দর ১২২৮ টাকা। কিন্তু বাজারে সেই দামে এলপি গ্যাস মিলছে না। গ্রাহককে কিনতে হচ্ছে ১২২০ টাকা থেকে ১৩৫০ টাকায়।

ডিজেলের দাম বৃদ্ধিতে নিষ্পেষিত জনজীবন

বিশ্ববাজারে দাম বৃদ্ধির যুক্তি দেখিয়ে গত ৩ নভেম্বর ডিজেল ও কেরোসিনের দাম প্রতি লিটারে এক লাফে ১৫ টাকা বাড়ানো হয়। হুট করে ডিজেলের দাম বৃদ্ধির বিরূপ প্রভাব পড়ে গোটা অর্থনীতি ও জনজীবনে। বাসের ভাড়া ২৭ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হয়। বেড়েছে পণ্য পরিবহন ভাড়া। দাম বেড়ে গেছে নিত্যপণ্যের। এখন বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমলেও বাংলাদেশে দাম কমানোর কোনো উদ্যোগ নেই।

১০ বিদ্যুৎকেন্দ্র বতিল

কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নিয়ে ১০টি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্প বাতিল ঘোষণা করে সরকার। গত ২৭ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ। পটুয়াখালীর ৬৬০x২ মেগাওয়াট ক্ষমতার কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, উত্তরবঙ্গ ১২০০ মেগাওয়াট সুপার থার্মাল পাওয়ার প্ল্যান্ট, মাওয়া ৫২২ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকার ২৮২ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, চট্টগ্রামের ২৮২ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, খুলনার ৫৬৫ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, মহেশখালীর দুটি ১৩২০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্প, বাংলাদেশ সিঙ্গাপুর ৭০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সিপিজিসিবিএল-সুমিতোমো ১২০০ মেগাওয়াট আল্ট্রা সুপার ক্রিটিক্যাল কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।

বেড়েছে ভর্তুকি

গত অর্থবছরে (২০২০-২১) বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি দিতে হয়েছে ১১ হাজার ৭০০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছরে (২০২১-২২) বিদ্যুতের জন্য ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু এটা বেড়ে যাবে। কারণ গ্যাস সঙ্কটে তরল জ্বালানিভিত্তিক কেন্দ্র থেকে অধিক পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। সূত্র জানিয়েছে চলতি অর্থবছরে ভর্তুকি বাবদ ১৬ হাজার ৪৩৭ কোটি টাকা প্রয়োজন হবে।

Manual8 Ad Code

এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বেড়ে যাওয়ায় তরল প্রাকৃতিক গ্যাসেও (এলএনজি) ভর্তুকি বেড়ে গেছে। চলতি বাজেটে জ্বালানি খাতে ভর্তুকি বাবদ বরাদ্দ রয়েছে এক হাজার কোটি টাকা। অথচ অর্থবছরের প্রথম ৫ মাসেই এলএনজি আমদানিতে সরকারের ভর্তুকি লেগেছে ১০ হাজার কোটি টাকা। এখনও এলএনজির আন্তর্জাতিক বাজার ঊর্ধ্বমুখী।

এগুচ্ছে রূপপুর প্রকল্পের কাজ

পাবনার রূপপুরে নির্মাণাধীন পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম রিয়্যাক্টর প্রেসার ভেসেল চুল্লি গত ১০ অক্টোবর উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। পরিকল্পনা অনুযায়ী, রূপপুরের প্রথম ইউনিট ২০২৩ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু করতে পারবে বলে আশা করছে কর্তৃপক্ষ। রূপপুর কেন্দ্রে দু’টি ইউনিটে ২৪০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হবে। এই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রাথমিকভাবে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকারও বেশি খরচ ধরা হয়েছে। বাংলাদেশে একক প্রকল্প হিসেবে এটি সবচেয়ে বড় কোনো অবকাঠামো প্রকল্প। মহামারির মধ্যেও এ প্রকল্প বাস্তবায়নে ২৫ হাজার শ্রমিক দিনরাত কাজ করছেন। বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরিতে সহযোগিতা দিচ্ছে রাশিয়ার আণবিক শক্তি কর্পোরেশন রোসাটম। তারাই প্রয়োজনীয় জ্বালানি সরবরাহ করবে এবং ইউরেনিয়াম জ্বালানি ব্যবহারের পর বর্জ্য ফেরত নিয়ে যাবে।

Manual3 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual4 Ad Code