

ডেস্ক রিপোর্ট:বিশ্বের দুই প্রধান পরাশক্তি চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যকার উত্তেজনা প্রশমন এবং বৈশ্বিক অর্থনীতির অস্থিরতা দূর করার লক্ষ্যে বেইজিংয়ে এক ঐতিহাসিক বৈঠকে বসেন চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। দীর্ঘ ৯ বছর পর ট্রাম্পের এই চীন সফরকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে। গতকাল বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ আয়োজিত এই শীর্ষ সম্মেলনে দুই নেতা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ভবিষ্যৎ, বাণিজ্য যুদ্ধ, তাইওয়ান ইস্যু এবং মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিতিশীলতা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করেন।
শি জিনপিং ও ট্রাম্পের এই একান্ত বৈঠকে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং বৈশ্বিক নানা সংকট নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। বৈঠকের শুরুতে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং বিশ্ব পরিস্থিতির দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘বর্তমান পৃথিবী এক টালমাটাল সময় অতিক্রম করছে। এ অবস্থায় চীন ও আমেরিকার মধ্যকার স্থিতিশীল সম্পর্ক কেবল দুই দেশের জন্যই নয়, বরং সারা বিশ্বের শান্তির জন্য অপরিহার্য।’ অন্যদিকে, নিজের স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প চীনের আতিথেয়তার প্রশংসা করে শি জিনপিংকে একজন ‘দুর্দান্ত নেতা’ হিসেবে অভিহিত করেন। ট্রাম্প বলেন, ‘আমরা এখানে কেবল করমর্দন করতে আসিনি, বরং বড় ধরনের অর্থনৈতিক সুযোগ এবং বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাস্তবসম্মত সমাধান খুঁজতে এসেছি।’
সূত্রমতে, বৈঠকে ইরান যুদ্ধ ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে দুই নেতার মধ্যে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। এছাড়া তাইওয়ান ইস্যুতে বেইজিংয়ের রেড লাইন এবং আমেরিকার অস্ত্র বিক্রয় নিয়ে স্নায়ুযুদ্ধ নিরসনের পথ খুঁজছেন তারা। আলোচনায় উঠে এসেছে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) এবং সেমিকন্ডাক্টর চিপের মতো সংবেদনশীল প্রযুক্তি বাণিজ্যের বিষয়টিও। বিশ্লেষকদের মতে, ২০২৫ সালে ট্রাম্প পুনরায় ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বেইজিংয়ের সঙ্গে ওয়াশিংটনের সম্পর্ক নতুন মোড় নিয়েছে। এই সফরের মাধ্যমে উভয় দেশই তাদের মধ্যকার ‘ট্রেড ওয়ার’ বা বাণিজ্য যুদ্ধ কমিয়ে একটি স্থিতিশীল অবস্থায় পৌঁছাতে চায়। যদিও তাইওয়ান এবং মানবাধিকার ইস্যুতে দুই দেশের দীর্ঘদিনের মতভেদ এখনো বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ আয়োজিত এই শীর্ষ বৈঠকটি শেষ হওয়ার পর বিশ্ব শেয়ার বাজারে কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব লক্ষ্য করা গেছে। তবে এই আলোচনার সুদূরপ্রসারী ফলাফল কী হবে, তা জানতে বিশ্ববাসীকে আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
এই সফরে ট্রাম্পের সঙ্গে ছিলেন টেসলা প্রধান ইলন মাস্ক এবং এনভিডিয়ার সিইও জেনসেন হুয়াংসহ একটি উচ্চপর্যায়ের ব্যবসায়ী প্রতিনিধি দল। বিশ্লেষকদের মতে, এই শীর্ষ সম্মেলনের মাধ্যমে দুই পরাশক্তির মধ্যে গত কয়েক বছরের শীতল সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করেছে। দিনের শেষভাগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সম্মানে এক রাজকীয় নৈশভোজের (স্টেট ব্যাংকুয়েট) আয়োজন করেন শি জিনপিং। নৈশভোজের মেনুতে ছিল আভিজাত্য ও ঐতিহ্যের ছোঁয়া। অতিথিদের আপ্যায়িত করা হয় টমেটো স্যুপে লবস্টার এবং মুচমুচে গরুর পাঁজরের মাংসের (ক্রিস্পি বিফ রিবস) মতো সুস্বাদু পদ দিয়ে। আজসফরের দ্বিতীয় দিনেও দুই নেতার মধ্যে বাণিজ্য ও দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের নানা দিক নিয়ে আরও আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
‘অত্যন্ত গঠনমূলক’ আলোচনা হয়েছে : এই বৈঠককে ‘অত্যন্ত গঠনমূলক’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। বেইজিংয়ের গ্রেট হল অব দ্য পিপল-এ অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান বাণিজ্য যুদ্ধ, তাইওয়ান ইস্যু এবং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান ইরান যুদ্ধসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও এক বিবৃতিতে জানান, ‘প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং প্রেসিডেন্ট শি-র মধ্যকার আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে। আমরা কিছু জটিল ইস্যুতে অভিন্ন অবস্থানে পৌঁছানোর চেষ্টা করছি, যা বিশ্ব শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য জরুরি।’ বিশেষ করে ইরান সংকটে চীনকে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছে ওয়াশিংটন। রুবিও উল্লেখ করেন, বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার এবং নিরাপত্তার স্বার্থে বেইজিংকে ইরানের ওপর প্রভাব খাটিয়ে উত্তেজনা প্রশমনে এগিয়ে আসতে হবে।
ইরান ইস্যুতে আলোচনা হলেও সাহায্য চায়নি যুক্তরাষ্ট্র : মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের মধ্যে এক দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে ইরান প্রসঙ্গ উঠে এসেছে। তবে ইরান ইস্যুতে বেইজিংয়ের কাছে কোনো ধরনের সহায়তা চাননি ট্রাম্প। গতকাল বেইজিংয়ে এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। তিনি বলেন, ‘আমরা চীনের কাছে কোনো সাহায্য চাইছি না। আমাদের সাহায্যের প্রয়োজন নেই। আমরা কেবল আমাদের অবস্থান স্পষ্ট করার জন্য বিষয়টি উত্থাপন করেছি যাতে তারা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বুঝতে পারে।’ তিনি আরও জানান, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ইরান ইস্যুটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় এটি নিয়ে আলোচনা করাটাই ছিল যৌক্তিক। পররাষ্ট্রমন্ত্রী রুবিও আমেরিকার অনড় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে বলেন, ইরানকে কোনোভাবেই পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে দেওয়া হবে না। চীনের অবস্থান সম্পর্কে জানতে চাওয়া হলে তিনি বলেন, চীন তাদের পুরোনো অবস্থানের কথা আবারও জানিয়েছে। চীন মনে করে ইরান যেহেতু পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (এনপিটি) স্বাক্ষর করেছে, তাই তাদের পারমাণবিক অস্ত্র থাকা উচিত নয়। সূত্র : এসসিএমপি, সিএনএন।