মাত্র ১০ ফুট দূরত্বে মসজিদ-মন্দির, সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত বাহুবলে

লেখক: বাংলানিউজ ইউএস.কম
প্রকাশ: ৫১ minutes ago

Manual1 Ad Code

ডেস্ক রিপোর্ট: এক পাশে মসজিদ, অন্য পাশে মন্দির। মাঝখানে দূরত্ব মাত্র ১০ ফুট। একদিকে ভেসে আসে আজানের ধ্বনি, অন্যদিকে চলে পূজার্চনা। উপাসনালয় দুটি প্রায় মুখোমুখি হলেও নেই কোনো বিরোধ কিংবা বিভেদের দেয়াল। বরং পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহযোগিতা ও ভালোবাসায় প্রায় পাঁচ দশক ধরে পাশাপাশি চলছে দুই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় কার্যক্রম। দুর্গাপূজায় রং করা হয় মসজিদের সীমানাপ্রাচীর, আবার ঈদে রং করা হয় মন্দিরের প্রাচীর। ধর্মীয় সম্প্রীতির এমন অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলার কামাইছড়া বাজার এলাকার কামাইছড়া চা বাগান জামে মসজিদ ও দুর্গামন্দির।

ঢাকা-সিলেট পুরাতন মহাসড়কের পাশে অবস্থিত এই দুই উপাসনালয়ের মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৫৯ সালে, মসজিদ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৮ সালে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই স্থানীয় মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ নিজ নিজ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করে আসছেন। সময়ের পরিবর্তন হলেও তাঁদের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্প্রীতির বন্ধনে পড়েনি কোনো ছেদ। বরং ধর্মীয় সহনশীলতা ও সহযোগিতার মধ্য দিয়ে কামাইছড়া হয়ে উঠেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, দুর্গামন্দির প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৯ বছর পর স্থানীয় মুসল্লি, ব্যবসায়ী ও চা বাগানের মুসলমানদের উদ্যোগে এর পাশে নির্মাণ করা হয় মসজিদ। এরপর থেকে দুই উপাসনালয়ে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে। পূজা ও নামাজের সময়সূচি সমন্বয়ের মাধ্যমে দুই পক্ষই নিশ্চিত করেন, যেন কারও ধর্মীয় উপাসনায় বিঘ্ন না ঘটে। দুর্গাপূজার সময় নামাজ ও আজানের সময় হলে পূজা উদযাপন কমিটির সদস্যরা সাময়িকভাবে তাঁদের কার্যক্রম বন্ধ রাখেন। নামাজ শেষ হলে আবার শুরু হয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা।

সম্প্রীতির এই চর্চা শুধু ধর্মীয় কার্যক্রমের সমন্বয়েই সীমাবদ্ধ নয়। দুই উপাসনালয়ের সৌন্দর্য রক্ষায়ও রয়েছে পারস্পরিক সহযোগিতা। দুর্গাপূজা উপলক্ষে মসজিদের সীমানাপ্রাচীরে রং করে দেন মন্দিরসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। আবার ঈদ উপলক্ষে মন্দিরের সীমানাপ্রাচীর রং করে দেন মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকজন। দুই ধর্মের মানুষের এমন উদ্যোগে ফুটে উঠেছে সৌহার্দ্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার অনন্য ছবি।

কামাইছড়া চা বাগান জামে মসজিদের খতিব মাওলানা আব্দুর রহিম বলেন, ‘আমাদের মসজিদ ও দুর্গামন্দির একেবারে পাশাপাশি অবস্থিত। দুটির দরজাও প্রায় বরাবর। প্রায় ৫০ বছর ধরে আমরা পূজা কমিটির সঙ্গে মতবিনিময় ও সমন্বয়ের মাধ্যমে ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছি। পূজার সময় নামাজের সময় হলে তাঁরা তাঁদের অনুষ্ঠান সাময়িকভাবে বন্ধ রাখেন। নামাজ শেষ হলে আবার পূজা শুরু করেন। আমাদের মধ্যে কোনো দিন কোনো বিরোধ সৃষ্টি হয়নি। কামাইছড়ার মসজিদ ও মন্দিরের এই সম্প্রীতি সারাদেশের মানুষের কাছে তুলে ধরা উচিত।’

কামাইছড়া দুর্গামন্দিরের পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি গোপাল গোয়ালা বলেন, ‘আমরা হিন্দু-মুসলিম সব সময় মিলেমিশে থাকি। আমাদের এখানে কোনো দিন কোনো সমস্যা হয়নি। একে অপরের ধর্মীয় অনুষ্ঠানকে সম্মান করি এবং সহযোগিতা করি। আশা করি, ভবিষ্যতেও এই সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য অটুট থাকবে।’

Manual5 Ad Code

তিনি বলেন, পূজা উপলক্ষে মসজিদের সীমানাপ্রাচীর রং করে দেওয়া হয়। একইভাবে ঈদের সময় মন্দিরের সীমানাপ্রাচীরও রং করে দেওয়া হয়। পারস্পরিক সহযোগিতার এই চর্চা দুই সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে আন্তরিকতার সম্পর্ক আরও গভীর করেছে।

কামাইছড়া পুলিশ ক্যাম্পের দায়িত্বে থাকা সহকারী উপপরিদর্শক (এএসআই) মোহাম্মদ আনোয়ার হোসেন বলেন, ‘আমাদের পুলিশ ক্যাম্পের পাশেই মসজিদ ও মন্দির অবস্থিত। এখানকার মানুষের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি খুবই ভালো। দুই সম্প্রদায়ের মানুষ শান্তিপূর্ণভাবে নিজ নিজ ধর্মীয় কার্যক্রম পালন করেন। আমরাও এলাকার সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছি।’

Manual2 Ad Code

বাহুবল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) উজ্জ্বল রায় বলেন, ‘কামাইছড়ায় দীর্ঘ প্রায় ৫০ বছর ধরে মসজিদ ও মন্দির পাশাপাশি অবস্থান করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য নজির স্থাপন করেছে। একদিকে মুসলমানরা নামাজ আদায় করছেন, ঠিক উল্টো পাশে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা তাঁদের পূজা করছেন। আমার মনে হয়, এটি আবহমানকাল থেকে চলে আসা মুসলিম ও হিন্দু সম্প্রদায়ের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। আমি আশা করি, কামাইছড়ার এই দৃষ্টান্ত বাহুবল তথা সারাদেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আদর্শ হিসেবে গণ্য হবে।’

Manual5 Ad Code

স্থানীয়দের মতে, কামাইছড়ার এই সম্প্রীতি কেবল পাশাপাশি দুটি উপাসনালয়ের অবস্থানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি দীর্ঘদিনের পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা ও সহযোগিতার প্রতিফলন। ধর্মীয় উৎসবে একে অপরের সুবিধা-অসুবিধার প্রতি খেয়াল রাখা, উপাসনার সময় সমন্বয় করা এবং স্থাপনার সৌন্দর্য রক্ষায় সহযোগিতার মধ্য দিয়ে তাঁরা সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও দৃঢ় করেছেন।

Manual2 Ad Code

ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার মাধ্যমে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সম্ভব—কামাইছড়ার মসজিদ ও দুর্গামন্দির তারই বাস্তব উদাহরণ। মাত্র ১০ ফুট দূরত্বে থাকা এই দুই উপাসনালয় যেন নীরবে জানিয়ে দিচ্ছে, সম্প্রীতির জন্য দূরত্ব নয়, প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান ও মানবিকতা। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই সম্প্রীতির ধারা অব্যাহত থাকবে এবং কামাইছড়ার দৃষ্টান্ত দেশের অন্যান্য এলাকার মানুষের জন্যও অনুকরণীয় হয়ে উঠবে।

এস এম টিপু সুলতান
বাহুবল প্রতিনিধি
০১৭১২-৫৮০৭৭৪
১৮ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual3 Ad Code