

নালিতাবাড়ী (শেরপুর) :
মাঠে সবুজ ফসল। আর কয়েকদিন পার হলেই আসবে থোর। আশায় বুক বেঁধেছে কৃষক। সেচের একমাত্র ভরসা পাহাড়ি ঝর্ণা। ভারত থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঝর্ণা শুকিয়ে গেছে। শুরু হয়েছে সেচ সমস্যা। এর মধ্যে যোগ হয়েছে হাতির তান্ডব। তবে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে হাতি। ফসল খেয়ে সাবাড় করে দেয়। পা দিয়ে মাড়িয়ে ধুমড়ে মুচরে শেষ করে দেয় সব। একটি দুটি নয় ৪০/৫০টি হাতি দলবদ্ধভাবে আক্রমণ চালায়। কেউ সামনে যেতে পারে না। শুঁড় দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে পায়ের সাথে পিষে মেরে ফেলে। আক্রমণ চালায় বাড়িঘরেও। ঘরবাড়ি ভেঙ্গে ফেলে।
ইতোমধ্যে বন্যহাতি নেমে এসেছে নালিতাবাড়ী উপজেলার রামচন্দ্রকুড়া ইউনিয়নের পানিহাটা এলাকায়। গারো ক্ষুদ্র নৃ-তাত্বিক জনগোষ্ঠির কয়েক একর জমির আবাদী বোরো ধান ক্ষেত নষ্ট করে জঙ্গলে অবস্থান করছে হাতির দল। সীমান্তবর্তী ভারতীয় চেরেংপাড়া জঙ্গলে আছে হাতির দল। সুযোগ বুঝে পানি ক্ষেতে নেমে আসছে বাংলাদেশের সীমানায় পাহাড়ের অভ্যন্তরে পানিহাটার বড় পুকুরে। কখনও ধেয়ে আসছে ফসলের মাঠে।
গত ৬ এপ্রিল রাত ১১টায় ভারতের চেরেংপাড়া থেকে হাতির দল নেমে আসে পানিহাটায়। চেষ্টা করে ফসলের ক্ষতি করতে। গারো জনগোষ্ঠির মানুষগুলো যার যা আছে তাই নিয়ে হাতির সাথে যুদ্ধ শুরু করে। মশাল জ¦ালিয়ে, টিন বাজিয়ে, চোখে চার্জার লাইট ধরে, হৈ হুল্লুর করে, কাঠখরি দিয়ে আগুন জ¦ালিয়ে হাতি তাড়ানোতে লিপ্ত হয়। এভাবে দীর্ঘ সময় যুদ্ধের পর অবশেষে হাতি এলাকাবাসীর তাড়া খেয়ে আবার চলে যায় গহীন জঙ্গলে।
হাতি আতংকে নির্ঘুম রাত কাটছে পানিহাটার গারো সম্প্রদায়ের মানুষগুলোর। সন্ধ্যায় নেমে আসে হাতি। বিকেল হলেই গারো সম্প্রদায়ের নারী পুরুষ দা বটি লাঠি শূঠা লাইট নিয়ে বসে থাকছে ক্ষেতের আইলে। বেশ কয়েকটি জায়গায় হাতি পাহাড়ার জন্য নিজস্ব উদ্যোগে তৈরি করেছে টং। সন্ধ্যার পর টংয়ের সন্মুখে জ¦ালিয়ে দিচ্ছে আগুন। হাতি আসলে সবাই হৈ হুল্লুর করে চার্জার লাইট, টিন বাজিয়ে, নিজের তৈরি বিশেষ মশাল জ¦ালিয়ে তারা যুদ্ধ করে হাতির সাথে। প্রায়ই সন্মুখ যুদ্ধ হয় হাতির সাথে তাদের।
গত ২৬ মার্চ থেকে হাতি আক্রমণ শুরু করে পানিহাটার ফসলের মাঠে। পা দিয়ে মাড়িয়ে দেয়- শ্রাবনী নেংওয়া(৪৫) এর ১০ কাঠা, পরবী ডিও(৪০) এর দেড় একর, নিবা ডিও(৩৫) এর এক একর জমির আবাদী বোরো ফসল। তাদের একমাত্র ভরসা এই জমিটুকুর ফসল। একদিকে সেচ সমস্যা। অপরদিকে হাতির আক্রমণ সব মিলিয়ে তারা কঠিন পরিস্থিতে রয়েছে বলে জানা গেছে।
পানিহাটা গ্রামের সং নকমা(গ্রাম প্রধান) প্রবীন মানকীন জানান, গত ২৬মার্চ থেকে হাতি আক্রমণ করেছে ফসলের মাঠে। পা দিয়ে পিষে আবাদী বোরো ফসল নষ্ট করে দিয়েছে। রাত জেগে ক্ষেত পাহাড়া দিচ্ছে তারা। প্রায় প্রতি বছরই হাতি আক্রমণ করে তাদের গ্রাম্।ে হাতির আক্রমণে অনেক বছর আগে প্রাণ গেছে অনেকের। পরে কারিতাস এনজিও ২৮টি ঘর করে দিয়েছে তাদের। বন বিভাগের উদ্যোগে জগ ও চার্জার লাইট দেওয়া হয়েছে। যা এখন নষ্ট হয়ে গেছে। একটি জেনারেটর দিয়েছে তাদের। সেটাও অকেজো হয়ে পড়ে আছে। এ অবস্থায় কঠিন দিনাতিপাত করছেন তারা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ভারতীয় চেরেংপাড়ার ওই সীমান্ত একেবারেই আলগা। সেখান দিয়ে হাতি সহজেই বাংলাদেশের সীমানায় প্রবেশ করতে পারে। সেখান দিয়েই নেমে এসেছে পাহাড়ি ঝর্ণা। আর ওই ঝর্ণার পানি দিয়েই আবাদ হয় ওইসব জমি। সেই ঝর্ণাও এখন শুকিয়ে গেছে। জমিগুলোতে শুরু হয়েছে সেচ সমস্যা। ভরসা প্রকৃতির উপর। বৃষ্টি আসলেই দূর হবে সেচ সমস্যা । তবে হাতি সমস্যার কোনো শেষ নেই। পাহাড়ি টিলা সংলগ্ন প্রায় শতাধিক একর জমিতে আবাদ হয়েছে বোরো ধান। এখন হাতির তান্ডবে ফসল নষ্ট হয়ে গেলে না খেয়ে থাকতে হবে বলে জানান, গারো পল্লীর- নিলা কুবি, শ্রাবনী নেংওয়া, পরবী ডিও, নিবা ডিও সহ অনেকেই।