কানাডার চিঠি: অভিবাসন পরামর্শকের জীবন

লেখক:
প্রকাশ: ৬ years ago

Manual1 Ad Code

কানাডার ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট (আরসিআইসি) হিসেবে কাজ শুরু করেছি গত বছরের এমন সময়। আমার ব্যাকগ্রাউন্ড কিন্তু একেবারেই ভিন্ন। আমি মূলত একজন কাঠামো প্রকৌশলী বা স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার

 

বাংলাদেশ বুয়েট থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে দেশে কয়েক বছর চাকরি করার পর আরও কয়েকটি দেশ ঘুরে কানাডায় এসে সপরিবারে থিতু হয়েছি। এদেশে স্নাতকোত্তর পড়ালেখা করেছি টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপর টানা এক যুগ স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কয়েক কোম্পানিতে কাজ করার পর সিদ্ধান্ত নিলাম কানাডার ইমিগ্রেশন কনসাল্টেন্ট হবার।

বিভিন্ন সময়ে আমার জীবনে যে কয়েকটি কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়েছে এটি তার অন্যতম। তবে জীবনে কখনো ভুল সিদ্ধান্ত নেবার নজির আমার নেই। এর মূলে রয়েছে কোন সিদ্ধান্ত নেবার আগে বাস্তবসম্মত চিন্তা ভাবনা ও বিশ্লেষণ করা। বড়ো ধরণের কোন ভুলত্রুটি ছাড়াই আমি সচরাচর যে কোন বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারি, অনেক দুর্বলতার মাঝেও এটি আমার এক ভালো দিক।

Manual6 Ad Code

তাই দীর্ঘ পঁচিশ বছরের ইঞ্জিনিয়ারিং ক্যারিয়ার পেছনে ফেলে সম্পূর্ণ নতুন একটা প্রফেশনে পথ চলাও হয়তো ভুল সিদ্ধান্ত নয়। বাকিটা ভবিষ্যতই বলবে। আপনাদের অজানা নয়, কানাডার অনুমোদিত বাংলাদেশি ইমিগ্রেশন কনসালটেন্টের সংখ্যা একেবারেই হাতেগোনা, সম্ভবত জনাদশেক হবেন।

তার উপর সম্প্রতি এই প্রফেশনে আসা আগের চেয়ে অনেক কঠিন করে ফেলেছে কানাডা সরকার। কেবল ইমিগ্রেশন পলিসি ও আইন বিষয়ে পড়াশোনা নয়, একাডেমিক আইইএলটিএস-এ ‘সিএলবি নাইন’ পাবার একটি কঠিন শর্তও জুড়ে দেয়া হয়েছে এই লাইসেন্স পাবার পূর্বশর্ত হিসেবে। ফলে কানাডার অনুমোদিত ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা অনেকের পক্ষেই একপ্রকার অসম্ভব হয়ে পড়েছে।

নইলে আরও অনেক বাংলা ভাষাভাষী কনসালটেন্ট আমরা পেতাম। তারপরও ধীরে ধীরে আরো কিছু বাংলা ভাষাভাষী কানাডিয় ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট ভবিষ্যতে দেখতে পাবো এমন আশা করাই যেতে পারে। চেষ্টা থাকলে কোন কাজই অসম্ভব নয়।

লাইসেন্স পাবার পর থেকে এই একবছর দেশ-বিদেশের কিছু মানুষকে ইমিগ্রেশন পরামর্শ দেবার সুযোগ আমার হয়েছে। প্রথম নিজেকে ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট বা আরসিআইসি হিসেবে ফেইসবুকের মাধ্যমে পরিচয় করিয়ে দেয়ার পর বেশ কিছু বাংলাদেশি আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন।

এর মাঝে আমার দূরের-কাছের কিছু আত্মীয়-স্বজনও ছিলেন। দেখে ভয় পেয়েছিলাম এ ভেবে, আমি একা এতো ক্লাইয়েন্ট ম্যানেজ করবো কিভাবে? তখন স্ত্রীই ছিলেন আমার ভরসা। ও যথার্থই বলেছিলো, ‘ধীরে চলো হে, তুমি বড়ো আবেগী মানুষ! দেখো, এদের কয়জন তোমাকে বাস্তবে হায়ার করে।’

মাসখানেক যেতেই দেখলাম, না, আমার ধারণা ঠিক নয়। যাঁরা যোগাযোগ করেছেন তাঁদের বেশিরভাগই ‘জাস্ট চেক করে দেখার জন্য’ টোকা মেরেছেন, আসল ক্লাইয়েন্ট হাতেগোনা কয়েকজন। তারও কিছুদিন পর বাংলাদেশি আরেক কনসালটেন্ট (ভুয়া নয়, আসল আরসিআইসি) আমাকে কানাডার এক শহর থেকে ফোন করে জানালেন, আমি নাকি তাঁদের রেটের অর্ধেকও দাবি করছি না।

উদ্বেগের সঙ্গে তিনি জানতে চেয়েছেন, আমি কি আসলেই এতো কমে কাজ করতে পারবো? কেউ একজন নাকি আমার দেয়া প্রপোজাল বা অফার নিয়ে তাঁর সাথে দর কষাকষি করতেও গেছেন। দেখুন অবস্থা! কথাটা শুনে লজ্জা পেলাম। আফটার অল, উনি অনেক সিনিয়র কনসালটেন্ট; এই প্রফেশনে তাঁর অভিজ্ঞতা পঁচিশ বছরেরও বেশি।

Manual3 Ad Code

না, কোন বাঙালি নয়, আমার প্রথম ক্লাইয়েন্ট একজন ফিলিপিনো নাগরিক। নাম মিস্টার পেরেজ। লিংকডইন-এ তিনি আমাকে পেয়েছেন। তাঁর কেইসটা কিছুটা জটিলই বটে। সংক্ষেপে এরকম- ওয়ার্ক পারমিটে কানাডা এসে পরবর্তীতে কানাডার পিআর এর জন্য আবেদন করেছেন তিনি। সে বছর দশেক আগের কথা। এর মধ্যে ছোট ছেলেটির ধরা পড়লো জটিল রোগ, কানের মারাত্মক ইনফেশন। এই রোগের চিকিৎসা দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল।

এ বিবেচনায় কানাডার ইমিগ্রেশন অফিস আটকে দিলো তাঁর পিআর আবেদন। শেষতক, কানাডার ফেডারেল কোর্ট পর্যন্ত গড়ালো এই কেইস। বিস্তর টাকাপয়সা খরচ হলো ভদ্রলোকের। শেষে বিচারকের নির্দেশে পিআর অনুমোদিত হলো শর্তসাপেক্ষে। অন্যতম শর্ত হলো, মিস্টার পেরেজ কানাডা সরকারের আর্থিক সহায়তা না নিয়ে নিজ খরচে এ রোগের চিকিৎসা করাবেন। তাৎক্ষণিক মেনে নিলেও পরবর্তীতে শর্তগুলো তিনি নানা প্রতিকূল অবস্থায় ঠিকমতো মেনে চলতে পারেননি।

পিআর (পারমেনেন্ট রেসিডেন্ট) হিসেবে নির্দিষ্ট সময় কানাডায় বসবাসের পর এখন সময় এসেছে সিটিজেনশিপ বা নাগরিকত্বের আবেদন করার। স্বভাবতই, মিস্টার পেরেজ ভয় পাচ্ছেন তাঁর পরিবারের নাগরিকত্বের আবেদন আদৌ অনুমোদন পাবে কিনা। ইমিগ্রেশন প্রফেশনালের শরণাপন্ন হলেন এ কারণেই। এক ইমিগ্রেশন কনসালটেন্ট তাঁর কাছে দাবি করছেন ৬ হাজার ডলার।

Manual3 Ad Code

তারপর আমাকে ধরেছেন কিছু কমে কাজটি করা যাবে কিনা জানতে। প্রথম কেইস হিসেবে আমি ৪ হাজার ডলারে কাজটি নিয়ে নিলাম। আমি জানতাম এ কেইসে আমাকে বেশ সময় দিতে হবে। তারপরও, এটি মোকাবেলা করতে গিয়ে যে মূল্যবান অভিজ্ঞতাটুকু অর্জিত হবে তাও তো ফেলনা নয়!

ক্লাইয়েন্টের জায়গায় নিজেকে কল্পনা করে, অর্থাৎ তাঁদের সমস্যাকে নিজের সমস্যা মনে করে কানাডার ইমিগ্রেশন অফিসের সঙ্গে ক্লাইয়েন্টের হয়ে যোগাযোগ শুরু করলাম। আমি যখন কোন ক্লাইয়েন্টের কাজ নেই, তখন তার জায়গায় নিজেকে কল্পনা করি। এটাই আমার স্ট্রাটেজি। ক্লাইয়েন্টের সমস্যাকে নিজের মনে করলে কাজটির সঙ্গে যেভাবে একাত্ম হওয়া যায় অন্য কোনোভাবে তা সম্ভব বলে আমার মনে হয় না।

এটি শুধু ইমিগ্রেশন ব্যবসার ক্ষেত্রে নয়, সম্ভবত অন্যসব ব্যবসার ক্ষেত্রেও একইভাবে খাটে। এতে আরেকটি সুবিধা হলো, কোন কারণে কাজে বিফল হলেও নিজেকে অপরাধী মনে হয় না, মানসিক শান্তিটা পাওয়া যায়। আমার কাছে পিস অব মাইন্ড বা মনের শান্তি খুবই দরকারি জিনিস, যে কারণে দেশের সরকারি চাকরি পেছনে ফেলে প্রায় দুদশক আগে কানাডার অজানা জীবনে দুই শিশুসন্তান নিয়ে ঝাঁপ দিয়েছি। আমার স্ত্রীও ছিল দেশে ক্যাডার সার্ভিসের অফিসার! তিনিও সমমনা না হলে হয়তো অনিশ্চিত যাত্রায় এভাবে দেশ ছাড়া হতো না।

যাক, আগের কথায় ফিরে যাই। চার ছেলে-মেয়ে আর স্ত্রী মার্লিনকে সঙ্গে নিয়ে মিস্টার পেরেজ আমার অফিসে হঠাৎই এসেছিলেন গত সন্ধ্যায়। এতগুলো মানুষ একসঙ্গে এসেছেন দেখে কেমন যেন লাগছিলো প্রথমটায়। মুহূর্তেই মিস্টার পেরেজ আমাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘টুডে ইজ দ্য হেপিয়েস্ট ডে ইন মাই লাইফ, অ্যান্ড ইউ আর দ্য ওয়ান হু মেইড ইট! থেঙ্ক ইউ মিস্টার গনি!’। তার মানে বুঝলেন তো, তাঁদের কেইসটা সাকসেসফুল! কানাডার ইমিগ্রেশন অফিস হতে অভিনন্দন জানিয়ে তাঁকে নাকি ফোন করা হয়েছে গতকাল। সঙ্গত কারণেই, তাঁদের সফলতা নিজের সফলতাই মনে হলো। এ আনন্দ ভাষায় প্রকাশের নয়।

Manual8 Ad Code

সংবাদটি ভালো লাগলে শেয়ার করুন।
Manual1 Ad Code
Manual5 Ad Code