

সম্পাদকীয়:বাস্তবিকই কি তাঁর মাতৃভূমি স্বাধীন দেশ হিসেবে দাঁড়াতে পারবে? সালামের শঙ্কা, বর্তমান আরবের রাজনীতিতে এটা কখনোই সহজ হবে না। স্বভাবতই ইরাক এই গণভোটকে অবৈধ বলে অভিহিত করে মেনে নেয়নি। বুধবার ইরাকি সংসদ তেলসমৃদ্ধ অঞ্চল কিরকুকে সেনা মোতায়েনের ঘোষণা দিয়েছে। একই সঙ্গে ইরাক কুর্দিস্তানের বিমানবন্দরগুলোতে সরাসরি ফ্লাইট পরিচালনা না করার জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে অনুরোধ করেছে। সেই অনুরোধে সাড়া দিয়ে ইরান কুর্দিস্তানের এবরিল ও সুলাইমানিয়া বিমানবন্দরে সরাসরি ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়েছে। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রেসেপ এরদোয়ান কুর্দিস্তানের ওপর অবরোধ আরোপের হুমকি দিয়েছেন। সিরিয়া, তুরস্ক ও ইরান কোনোভাবেই ওই অঞ্চলে একটি স্বাধীন কুর্দিস্তান মেনে নেবে না। প্রথমেই আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিরোধের মুখে পড়তে পারে ইরাকি কুর্দিদের স্বাধীনতার স্বপ্ন। কারণ, ইরান ও তুরস্ক মনে করছে, এই গণভোট টার্কি ও ইরানি কুর্দিদের স্বাধীনতার চেতনাকে উসকে দেবে। কুর্দিদের সংগ্রামের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ। গণহত্যার শিকার হয়েছে ইরাকে। জেল, জুলুম, গুম কুর্দিদের জন্য ছিল নিত্যঘটনা। সেটা ইরান, ইরাক, তুরস্ক ও সিরিয়া—সব দেশেই। ৭০-৮০ বছর ধরেই কুর্দিরা ওসব দেশে লড়াই করে আসছে। তবে ইরাকি কুর্দিস্তানের পৃথক হওয়ার প্রক্রিয়া ১৯৯১ সাল থেকেই শুরু হয়েছিল। ওই সময় পশ্চিমা শক্তি ইরাকের উত্তরাঞ্চলে নো ফ্লাই জোন ঘোষণা করলে কুর্দিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি (কেডিপি) ও প্যাট্রিয়টিক ইউনিয়ন অব কুর্দিস্তান (পিইউকে) মিলে কুর্দিস্তানে একধরনের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসিত রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলে।
গণভোটের পর ইরাকি কুর্দিস্তান কীভাবে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ইরাক থেকে পৃথক হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। ইরাক ইতিমধ্যেই এই নির্বাচনকে নাকচ করে দিয়েছে। যদিও রাজনৈতিকভাবে ইরাকের কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকার (কেআরজি) অনেকটা স্বাধীন জাতি রাষ্ট্র হিসেবেই কাজ করছে। তাদের নিজস্ব সংসদ ও সেনাবাহিনী রয়েছে। রয়েছে নিজস্ব পররাষ্ট্রনীতি। তবে অর্থনৈতিক কারণে কেআরজি ইরাকের কেন্দ্রীয় সরকারের ওপর নির্ভরশীল। বিশেষ করে তেল উত্তোলন ও মুনাফা ভাগভাগি করতে হয় বাগদাদের সঙ্গে। এ ছাড়া তুরস্ক ও ইরানের সঙ্গে রয়েছে আমদানি-রপ্তানিনির্ভর বাণিজ্যিক সম্পর্ক। সম্ভাব্য স্বাধীন কুর্দিস্তানকে ঘিরে রাজনৈতিক খেলাটা মূলত তুরস্ক, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হচ্ছে। পর্দার পেছনে আছে ইসরায়েল। প্রকাশ্যে গণভোটের বিরোধিতা করলেও ১৯৯০ সাল থেকেই ইরাকি কুর্দিদের সঙ্গে তুরস্কের যোগাযোগ রয়েছে। বিশেষ করে তুরস্কের কুর্দিস্তান ওয়ার্কাস পার্টিকে (পিকেকে) মোকাবিলার জন্যই আঙ্কারার সরকার কেআরজির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে তোলে। ইরাকি কুর্দিস্তানের প্রেসিডেন্ট বারজানি ও অপর নেতা তালাবানিকে পাসপোর্টও দিয়েছিল তুরস্কের সরকার। বরাবরই ইরাকি কুর্দিরা আঙ্কারার সঙ্গে হাত মিলিয়ে টার্কি কুর্দিদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছে। তুরস্ক চায় ইরান নিয়ন্ত্রিত ইরাকি সরকার ও নিজেদের সীমান্তের মাঝখানে একটি বাফার রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে, যা তাদের নিয়ন্ত্রণে থাকবে এবং শক্তির সাম্য প্রতিষ্ঠা করবে।