

সম্পাদকীয়:
পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার আটক ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. নাজমুল
মৃধাকে প্যারোলে মুক্তি দিয়ে তার মৃত পিতার জানাজায় ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে হাজির
করানোর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন হাইকোর্ট। ১৫ জানুয়ারি বিচারপতি মোস্তফা
জামান ইসলাম ও বিচারপতি মো. আতাবুল্লাহকে নিয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ,
ডান্ডাবেড়ি পরানোর ধারাবাহিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বলেছেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে
আমরা হয়তো অসভ্য (Uncivilized) হিসাবে পরিচিত হব।’ আইনজীবী কায়সার কামাল
সম্প্রতি ঢাকার জাতীয় পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত ‘বাবার জানাজায় ডান্ডাবেড়ি পায়ে
ছাত্রদল নেতা’ শিরোনাম ও ছবিসংবলিত প্রতিবেদন নজরে আনলে হাইকোর্ট বেঞ্চ
উপরিউক্ত মন্তব্য করেন। পুলিশ ছাত্রদল নেতা মো. নাজমুল মৃধাকে ২০ ডিসেম্বর এক
বিস্ফোরক মামলায় গ্রেফতার করে। আটক থাকাকালীন নাজমুলের বাবা মারা গেলে
পুলিশ জানাজায় অংশগ্রহণের জন্য ১৩ জানুয়ারি প্যারোলে মুক্তিপ্রাপ্ত নাজমুলকে
ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে হাজির করে।
গ্রেফতার বিএনপি নেতাদের ডান্ডাবেড়ি পায়ে পিতা-মাতার মৃত্যুর পর জানাজা পড়ার
এমন নিষ্ঠুর ঘটনা এটাই প্রথম নয়। বেশ কয়েক বছর ধরেই বিরোধী দলের নেতাদের
সঙ্গে এ অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে। এমনকি হৃদরোগে আক্রান্ত যুবদল নেতাকেও
ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। ২৮ অক্টোবর ঢাকায়
বিএনপি মহাসমাবেশের পর যে অসংখ্য নেতাকর্মীকে গণহারে গ্রেফতার করা হয়েছে,
এর মধ্যে যশোর জেলা যুবদলের সহসভাপতি ও স্থানীয় কলেজশিক্ষক আমিনুর রহমান
অন্যতম। কারাগারে হৃদরোগে আক্রান্ত হলে তাকে ঢাকার জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে
স্থানান্তর করা হয়। কারাগার থেকে শুরু করে ঢাকায় চিকিৎসাধীন পুরো সময় তার পায়ে
ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে রাখা হয়। এমনকি খাওয়ার সময়ও হাতকড়া খুলে দেয়নি পুলিশ। এ
অবস্থায় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে তিনি ১৩ দিন চিকিৎসাধীন ছিলেন। একই ঘটনা ঘটেছে
মুগদা থানা শ্রমিক দল নেতা মো ফজলুর রহমান কাজলের সঙ্গে।
৩০ অক্টোবর তাকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে যায় পুলিশ। কারাগারে অসুস্থ হয়ে পড়লে
হাতকড়া ও ডান্ডাবেড়ি পরানো অবস্থায়েই হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে নিয়ে যাওয়া হয়।
ডান্ডাবেড়ি পরা অবস্থাতেই তার চিকিৎসা চলেছে। কাজলের ছেলে সজল অভিযোগ
করেন, চিকিৎসাকালীন বারংবার অনুরোধ করলেও তার বাবার হাতকড়া ও ডান্ডাবেড়ি
খুলে দেওয়া হয়নি। কাজলের দুর্ভাগ্য সরকারের পরানো ডান্ডাবেড়ি নিয়েই তিনি মারা
যান। মানুষ কত নিষ্ঠুর ও অসভ্য (আদালতের ভাষায়) হলে একজন অভিযুক্ত ব্যক্তির
মৃত্যুর পরও হাতকড়া ও ডান্ডাবেড়ি খুলে দেওয়া হয় না। সজলের অভিযোগ, শেষ পর্যন্ত
কাজলের মৃতদেহ হিমঘরে নেওয়ার পর হাতুড়ি দিয়ে পায়ের ডান্ডাবেড়ি ভাঙা হয়।
পৃথিবীর এমন কোনো সভ্যতা খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে আইনের বিকাশ হয়নি। সভ্যতা
বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে আইনেরও ব্যাপক পরিবর্তন ঘটেছে। আধুনিক সমাজব্যবস্থার
সঙ্গে সংগতি রেখে শাস্তি প্রদানের ক্ষেত্রেও আইন আধুনিক করা হয়েছে। পরিবর্তিত
সমাজব্যবস্থার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে না পারলে আইনের কার্যকারিতা কমে যায়।
এজন্য প্রয়োজনে সে আইনকে সময়োপযোগী করে তোলা হয়। কিন্তু দুঃখের সঙ্গে বলতে
হয়, আমাদের দেশে ক্ষমতায় যারা থাকেন, তাদের স্বার্থহানি হতে পারে, এমন আইনের
কোনো পরিবর্তন সহজেই হয় না। এমনকি উচ্চ আদালতের প্রচেষ্টা থাকলেও। প্রায় এক
বছর আগে বিচারপতি কেএম কামরুল কাদের ও বিচারপতি মোহাম্মদ আলীর হাইকোর্ট
বেঞ্চ ডান্ডাবেড়ি পরানোর বিষয়ে নীতিমালা করতে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠনের কেন
নির্দেশ দেওয়া হবে না, তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছিলেন। একই সঙ্গে ‘ডান্ডাবেড়ি
পরানো’ কেন অবৈধ হবে না, রুলে তাও জানতে চাওয়া হয়েছিল। সুপ্রিমকোর্টের দুই
আইনজীবীর করা একটি রিটের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বেঞ্চ, স্বরাষ্ট্র সচিব, আইন
সচিব, পুলিশের আইজি, আইজি প্রিজনসহ সংশ্লিষ্টদের বিবাদী করা হয়েছিল। এক বছর
পার হয়ে গেলেও এ ব্যাপারে এ লেখা যখন লিখছি, তখন পর্যন্ত কোনো অগ্রগতির খবর
আমরা পাইনি। অথচ বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ করেছি, ওই রুল জারির পরও ডান্ডাবেড়ি পরিয়ে
আরও বেশ কয়েকটি অমানবিক ঘটনার জন্ম দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনার পরও নীতিমালা
করতে রুলে উল্লিখিত কমিটি গঠনের কোনো তথ্য নেই। আমরা আশা করি, এ বিষয়ে
সরকার যথাশিগ্গির সিদ্ধান্ত নিয়ে, এমন অমানবিক অত্যাচার থেকে এ দেশের
নাগরিকদের সুরক্ষার ব্যবস্থা করবে।