

সম্পাদকীয়: বরাদ্দ বৃদ্ধিসহ দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের অগ্রগতি; তদুপরি এ খাতে বেসরকারি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও রোগীদের বিদেশনির্ভরতা কমছে না কেন-এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। বিভিন্ন পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বছরে অন্তত ৮ লাখ মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশ ভ্রমণ করছেন। জানা যায়, এক দশক আগেও কেবল সমাজের বিত্তশালীরা উন্নত চিকিৎসার জন্য দেশের বাইরে যেতেন। তবে এখন মধ্যবিত্ত, নিম্ন-মধ্যবিত্তদের অনেকেই একই পথের যাত্রী হয়েছেন, যা ভাবনার বিষয় বৈকি! বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যমতে, বাংলাদেশিরা ২০১৯ অর্থবছরে ২ দশমিক ২ মিলিয়ন, ২০২০ অর্থবছরে ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন, ২০২১ অর্থবছরে ১ দশমিক ৬ মিলিয়ন এবং ২০২২ অর্থবছরের জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়কালে বিদেশে চিকিৎসার জন্য শূন্য দশমিক ৫ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করেছেন।
দেখা যায়, এক্ষেত্রে রোগীরা ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, চীন, জাপান, মালয়েশিয়া, কোরিয়া, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশে যাচ্ছেন। তবে রোগীদের সিংহভাগের গন্তব্যই হচ্ছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত। ভারতের পর্যটন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত দেশটিতে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পর্যটক গেছেন বাংলাদেশ থেকে। কেবল ২০২১ সালেই ২৪ লাখ বাংলাদেশি ভারতে গেছেন, যাদের মধ্যে ৭৭ দশমিক ৬ শতাংশ গেছেন চিকিৎসার উদ্দেশ্যে।
বলার অপেক্ষা রাখে না, ব্যাপক হারে রোগীদের বিদেশমুখী হওয়ার অন্যতম কারণ দেশীয় স্বাস্থ্যসেবার প্রতি অনাস্থা। রোগ নির্ণয়ে ত্রুটি, সময়মতো প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা সুবিধা না পাওয়া, চিকিৎসকের আন্তরিকতা ও সদ্ব্যবহারের ঘাটতি-সর্বোপরি দেশীয় চিকিৎসক ও সেবা ব্যবস্থাপনার প্রতি আস্থার সংকট থাকায় মানুষ বিদেশনির্ভর হচ্ছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই। এছাড়া আগে বিদেশে চিকিৎসা নেওয়ার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটি নীতিমালা ছিল, যেখানে উল্লেখ ছিল-কেউ দেশের বাইরে চিকিৎসা নিতে চাইলে আদৌ তার কোনো প্রয়োজন আছে কি না, কত ডলার খরচ হবে প্রভৃতি হিসাবনিকাশ করা হতো। উপরন্তু বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি খরচের পরিমাণ নির্ধারণ করে দিত।
তবে এ নীতিমালার পরিবর্তন হওয়ায় বর্তমানে রোগী যে কোনো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের প্রত্যয়নপত্র সংগ্রহ করে ব্যাংক থেকে ডলার নিতে পারছেন। বস্তুত নিয়মের শিথিলতায় সামান্য রোগব্যাধিতেও আজকাল মানুষের মধ্যে বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা বাড়ছে এবং এ কারণে প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের টাকা দেশের বাইরে চলে যাচ্ছে, যা মোটেই কাম্য নয়।