

ডেস্ক রিপোর্ট: দেশে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে সিসা দূষণ। তাতে তীব্র হচ্ছে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি। বাংলাদেশের সিসা দূষণের অন্যতম বড় কারণ হচ্ছে অটোরিকশার লিড-অ্যাসিড ব্যাটারি। বর্তমানে সারা দেশে চলছে প্রায় ৮০ লাখের মতো ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা। আর একটি অটোরিকশায় ব্যবহার করা হয় কমপক্ষে চারটি করে সিসা-অ্যাসিড (লিড-অ্যাসিড) ব্যাটারি। ওসব ব্যাটারির গড় আয়ুষ্কাল এক বছর। ফলে বছরে প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ ব্যাটারি অকেজো হচ্ছে। ১২ ভোল্টের একটি ব্যাটারিতে সিসা থাকে সাধারণত ৮ থেকে ১২ কেজি। ফলে বছরে নষ্ট হওয়া ব্যাটারিতে থাকা সিসার পরিমাণ প্রায় ২ লাখ ৫৬ হাজার থেকে ৩ লাখ ৮৪ হাজার টন দাঁড়ায় বছরে। কিন্তু বিপুল পরিমাণ সিসা থাকা ওসব ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারের (রিসাইকেল) নামে যত্রতত্র ভাঙা ও সিসা গলানো হচ্ছে। আর তাতে আশঙ্কাজনকভাবে বাড়ছে সিসা দূষণ। পরিবেশবিদ এবং পরিবেশবাদী সংগঠন সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, সিসা একটি শক্তিশালী স্নায়ুবিষ। এমনকি অল্প মাত্রায় সিসার সংস্পর্শও শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। রক্তে সিসার মাত্রা ৫ মাইক্রোগ্রাম/ডেসিলিটার হলে আক্রান্ত শিশুর আইকিউ অন্য শিশুদের তুলনায় কমতে পারে। মোদ্দা কথা সিসা দূষণের ফলে শিশুর যুক্তি, সমস্যা সমাধান, স্মৃতি, চিন্তা ও শেখার ক্ষমতা কমে যাবে। আর তা দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষা, কর্মদক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ আয়ক্ষমতার ওপর ফেলে। এর সামষ্টিক প্রভাব শেষ পর্যন— জাতীয় অর্থনীতিতে গিয়ে পড়ে। বর্তমানে দেশজুড়ে অনিয়ন্ত্রিতভাবে ব্যাটারির পুনর্ব্যবহার ও খোলা জায়গায় সিসা গলানোয় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি বাড়ছে। গবেষণার তথ্যানুযায়ী সিসা দূষণের ফলে বাংলাদেশ প্রতি বছর প্রায় ১৫ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বা প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলারের সমপরিমাণ জিডিপি হারাচ্ছে।
সূত্র জানায়, সরকারের পক্ষ থেকে ১৯টি প্রতিষ্ঠানকে শিল্প পর্যায়ে ব্যাটারি রিসাইকেল করার অনুমোদন রয়েছে। কিন্তু দেশে যে পরিমাণ ব্যাটারি অকেজো হচ্ছে তার তুলনায় ওসব প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা খুবই কম। অথচ দেশে ব্যবহৃত সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি পুনর্ব্যবহারে ১ হাজার ১০০টি অনানুষ্ঠানিক ও অবৈধ ইউনিট রয়েছে। ক্রমান্বয়ে বেড়েই চলেছে ওই সংখ্যা। তবে ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতে ওই ধরনের ব্যাটারি কারখানার সংখ্যা বেশি। ওসব কারখানায় অকেজো ব্যাটারি খুলে সিসা বের করা হয়। অন্যান্য উপাদানও আলাদা করা হয়। সিসা মূল্যবান হওয়ায় সেগুলো ফেলে দেওয়া হয় না। একটি লিড-অ্যাসিড ব্যাটারিতে ৮ থেকে ১২ কেজি সিসা থাকে। পুরনো ব্যাটারির সিসা খোলা জায়গায় গলানোর কারণে মাটি, পানি এবং পরিবেশের অন্যান্য উপাদানের সঙ্গে মিশে ফসলে ছড়ায়। আর ফসল থেকে এই সিসা মানুষের শরীরে প্রবেশ করে। বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ই-রিকশার সংখ্যা। ওসব যানবাহনের বড় অংশেই সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারি ব্যবহার করা হয়। মূলত অটোরিকশার সংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহৃত সিসা-অ্যাসিড ব্যাটারির পরিমাণও বাড়ছে।
সূত্র আরো জানায়, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি দেশে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির বিকল্প হতে পারে। কিন্তু ওই ব্যাটারি ব্যবহার করতে গেলে খরচ অনেক বেড়ে যাবে। একটি অটোরিকশার এক সেট লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির দাম ৬০ হাজার থেকে ৯০ হাজারের মধ্যে হলেও লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির দাম দেড় লাখ থেকে আড়াই লাখ টাকা পড়বে। একটি লিড-অ্যাসিড ব্যাটারির আয়ুষ্কাল এক থেকে দুই বছর আর লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির আয়ুষ্কাল ৪ থেকে ৮ বছর। কিন্তু একটি সাধারণ অটোরিকশাই এক লাখ থেকে এক লাখ ২০ হাজার টাকার মধ্যে পাওয়া যায়। সেখানে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারির অটোরিকশার দাম দুই থেকে আড়াই লাখ টাকা পড়বে। বর্তমানে সারা দেশে কত অটোরিকশা আছে সরকারের কাছে তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই।
এদিকে পরিবেশ বিজ্ঞানী ও স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, স্থানীয় পর্যায়ে অটোরিকশার কোনো ডেটাবেজ নেই। কেউ সেগুলো নিয়ন্ত্রণও করে না। তবে ওসব অটোরিকশার কারণে পরিবেশের যাতে কোনো ক্ষতি না হয় সেদিকে খেয়াল রাখা জরুরি। ব্যাটারি প্রক্রিয়াকরণে পরিবেশের ক্ষতিকর দিকগুলো অনেকেই আমলে নিচ্ছে না। কিন্তু সিসার মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হ্রাসে সিসা সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে। আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় শিশুর গর্ভাবস্থায়। অনেক সময় শ্বাসের সঙ্গে সিসা প্রবেশ করে শিশুর শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা হয়। নিউমোনিয়া এবং রক্তশূন্যতার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। তাছাড়া সিসায় শিশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধি বিলম্বিত হয়। অন্যদিকে এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম জানিয়েছেন, অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে একটি নীতিমালা করা হচ্ছে। সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশার নিবন্ধন ও চালকের লাইসেন্স প্রদানের সুযোগ সৃষ্টি করতে ‘স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন, সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এ সংশ্লিষ্ট কিছু ধারা ও তফসিল ইতিমধ্যে সংশোধন করা হয়েছে।