

নিউজ ডেস্কঃ চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) বায়েজিদ বোস্তামী থানার সাবেক কনস্টেবল মোহাম্মদ ফজলুল করিম। বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন রূপসী পাহাড়ের একটি অংশ কেটে গড়ে তুলছেন বহুতল ভবন। সিডিএ-এর অনুমোদন ছাড়াই নির্মাণাধীন এ ভবনের প্রথমতলার কাজ শেষ হয়েছে, এখন চলছে দ্বিতীয়তলার ও অন্যান্য কাজ।
পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণের বিষয়টি পরিবেশ অধিদপ্তরের নজরে এলে সম্প্রতি অধিদপ্তরের একটি দল ঘটনাস্থলে যায়। অভিযোগের প্রমাণ পেলে ১৭ অক্টোবর চট্টগ্রাম পরিবেশ অধিদপ্তর কার্যালয়ে শুনানিতে অংশ নিতে চিঠি পাঠান চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের পরিচালক মোহাম্মদ নূরুল্লাহ নুরী। অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘ফজলুল করিম নির্ধারিত তারিখে শুনানিতে অংশ নেননি।’ এ বিষয়ে জানতে কনস্টেবল মোহাম্মদ ফজলুল করিমের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি কথা বলতে রাজি হননি।
শুধু কনস্টেবল ফজলুল করিমই নন, রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের পাশাপাশি পুলিশের দুই ডজনেরও বেশি সদস্যের হাতে প্রতিনিয়ত ধ্বংস হচ্ছে বায়েজিদের পাহাড়। রাজনৈতিক নেতা ও প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগসাজশে তারা পাহাড়ের একরের পর একর জমি দখলে নিচ্ছে। মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা পাহাড়গুলো পরিণত হচ্ছে সমতলে, বসতিতে।
স্থানীয়রা জানান, বায়েজিদ বোস্তামী থানায় কর্মরত ছিল এমন পুলিশ সদস্যই পাহাড় কাটা ও দখলের সঙ্গে জড়িত। দখলি জমি প্লট হিসাবে বা ভবন বানিয়ে ভাড়া দিয়ে থাকেন তারা। কখনো নিজেদের নামে, কখনো স্ত্রী-সন্তানদের নামে এ বেচাবিক্রি চলে। এমনকি কিছু প্লট (দখল) বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে স্ট্যাম্পের মাধ্যমেও। তবে খাস এসব জমি নিবন্ধন করার সুযোগ নেই।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, চৌধুরীনগর হাসান সাহেবের খামারবাড়ি এলাকায় পাহাড় কেটে টিনশেডের (সেমিপাকা) ঘর করেছেন বায়েজিদ থানার সাবেক এসআই ওয়াদুদ চৌধুরী ও এএসআই রেজাউলসহ কয়েকজন। গত কয়েক বছরে তারা পাহাড় দখল করে তা কেটে সমতল বা বসবাসের উপযোগী করেছে। চৌধুরীনগর রূপসী পাহাড়ে পাহাড় কেটে প্লট করে বিক্রি করেছেন বায়েজিদ বোস্তামী থানার সাবেক এসআই আফসার উদ্দিন রুবেল, এএসআই ইব্রাহিম, এএসআই মঞ্জু ও এএসআই সাঈদ। চন্দ্রনগর নাগিন পাহাড় ফুলকলি কারখানার পেছনে এসআই রিতেন শাহ পাহাড় কেটে তৈরি করেছেন প্লট। নাগিন পাহাড় এলাকায় রয়েছেন আরও কয়েকজন পুলিশ সদস্য। বায়েজিদ-ফৌজদারহাট রিং রোড এলাকায় পাহাড় কেটে বায়েজিদ থানার সাবেক এএসআই মিটু, এস আই দীপংকর প্লট করেছেন। এর বাইরে ডজনেরও বেশি পুলিশ সদস্য নামে-বেনামে পাহাড় কেটে ভবন নির্মাণ ও প্লট তৈরি করে বিক্রিতে যুক্ত। তারা ছাড়াও বেশ কয়েকজন পরোক্ষভাবে এ বাণিজ্যে যুক্ত। তবে এ অপকর্মে জড়িত নন বলে দাবি করেছেন তারা।
পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, গত বছর চন্দ্রনগর কিষোয়ান ফ্যাক্টরির পেছনের গ্রিনভিউ আবাসিক সংলগ্ন নাগিনী পাহাড় এলাকায় পাহাড় কাটেন বায়েজিদ বোস্তামী থানার সাবেক এসআই রিতেন শাহ। পরে পরিবেশ অধিদপ্তরের তদন্তেও এর সত্যতা মেলে। ওই বছরই শুনানি শেষে তাকে ৬ লাখ টাকা জরিমানা করে পরিবেশ অধিদপ্তর।
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের পরিচালক মোহাম্মদ নুরুল্লাহ নুরী বলেন, ‘এসআই রিতেন শাহের পাহাড় কাটার বিষয়টি আমাদের তদন্তেও উঠে আসে। তাকে ৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। পরে তিনি উচ্চ আদালতে রিট করেন। এখনো উচ্চ আদালতের কাগজ আমরা হাতে পাইনি। পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘শুনানিতে কেউ অংশ না নিলে আমরা তার বিরুদ্ধে থানায় মামলা করি। যদি করিম শুনানিতে অংশ না নেন তাহলে আমরা তার বিরুদ্ধেও মামলা করব।’
পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম মেট্রো অঞ্চলের উপ-পরিচালক মিয়া মাহমুদুল হক বলেন, ‘সম্প্রতি বায়েজিদ বোস্তামী থানাধীন নাগিন পাহাড় ভিজিট করেছি। সেখানে ৬০ থেকে ৭০ জন দখলদার পেয়েছি। তাদের পেশাগত পরিচয় আমরা নিইনি। তাদেরকে আমরা অবৈধ দখলদার হিসাবে নোটিশ করেছি, জরিমানা করছি। পর্যায়ক্রমে বায়েজিদ এলাকার সব অবৈধ দখলদারের তালিকা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
নগর পুলিশের উপপুলিশ কমিশনার (উত্তর) মোখলেসুর রহমান বলেন, ‘ইতঃপূর্বে বায়েজিদ এলাকায় কার কার জমি-বাড়ি আছে, এ সম্পর্কে একটি তথ্য নিয়েছি। যাদের জমি-বাড়ি আছে, তারা সবাই বায়েজিদ থানার সাবেক পুলিশ সদস্য। বর্তমানে কর্মরত আছেন এমন কারও নেই। যাদের আছে, তারা সেগুলো কিনে নিয়েছেন বলে জানিয়েছেন।’
বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ কামরুজ্জামান বলেন, ‘বায়েজিদ এলাকায় অনেক পুলিশ সদস্যের জমি-বাড়ি আছে বলে শুনেছি। তবে তারা কে কীভাবে এসব জমি-বাড়ির মালিক হয়েছেন তা আমার জানা নেই। এ বিষয়ে আমার কাছে কেউ অভিযোগ নিয়ে আসেনি।’